করণ জোহর: এক অনপযুক্ত বালকের বলিউডে জয়ের গল্প

বলিউডে নব্বইয়ের দশক। একের পর এক দারুণ সব সিনেমা বানিয়ে দর্শকদের মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন পরিচালকরা। সেই ধারায় আসলেন এক নবীন পরিচালক। ১৯৯৮ সালে নির্মান করলেন এমন এক সিনেমা যেটা বন্ধুত্ব, ভালোবাসায় এনে দিয়েছিল এক নতুন মাত্রা। শাহরুখ, কাজল, রানী, সালমানকে নিয়ে বানালেন তারকাবহুল সিনেমা ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’।

প্রথম ছবিই সফল। নাম লেখালো দশকের অন্যতম সেরা ব্যবসাসফল সিনেমা। বলিউডে শত বছরের ইতিহাসে ছবিটি ঠাঁই করে দিল, সেরা রোমান্টিক সিনেমার তালিকায়। জাতীয় পুরস্কারে অর্জন করলো বছরের সেরা বিনোদনধর্মী ছবি, গায়িকা শাখায় ও পেয়েছিল জাতীয় পুরস্কার। ফিল্মফেয়ারে আটটি পুরস্কারের মধ্যে পরিচালক নিজেই পেলেন তিনটি পুরস্কার। এই ছবির পরিচালক আর কেউ নন, বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় পরিচালক করণ জোহর।

বাবা যশ জোহর, নামকরা প্রযোজক, রয়েছে বিখ্যাত প্রযোজক সংস্থা ‘ধর্ম প্রোডাকশন’। মা হিরো জহর ও চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত। তাই ছোটবেলা থেকেই চলচ্চিত্র জগতের সাথে পরিচিতি। অভিনয় করেন বিখ্যাত সিনেমা ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’তে।

পরিচালক হিসেবে প্রথম সিনেমার ব্যাপক সাফল্যের পর ২০০১ সালে নির্মান করেন ‘কাভি খুশি কাভি গাম’ সিনেমা। এই ছবি আরো তারকাবহুল। এক পর্দায় ১৯ বছর পর দেখা মিলল তারকা দম্পতি অমিতাভ বচ্চন ও জয়া বচ্চনের। সাথে ছিলেন শাহরুখ, কাজল, হৃতিক, রানী, কারিনাদের মত মহাতারকারা। রোমান্টিক সিনেমা থেকে বেরিয়ে এসে নির্মিত হল এক নির্মল বিনোদনধর্মী পারিবারিক সিনেমা, এখানেও বেশ সফল তিনি। এই ছবিটিও বলিউডের ইতিহাসে অন্যতম সেরা পারিবারিক সিনেমার তালিকায় যুক্ত হল। পেয়েছিল পাঁচটি ফিল্মফেয়ার, পরিচালক করন নিজেও পান পুরস্কার।

নিজের চিরাচরিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে ২০১০ সালে নির্মান করলেন ‘মাই নেম ইজ খান’। শাহরুখ-কাজল কে এই ভিন্নধর্মী সিনেমা বানিয়েও সফল। এখন পর্যন্ত এটাই তাঁর সেরা সিনেমা বলে স্বীকৃত। ফিল্মফেয়ারে প্রথম সিনেমার পর আবার অর্জন করলেন সেরা পরিচালকের পুরস্কার, অন্যান্য শাখায় ও জয়জয়কার ছিল ছবিটির।

এছাড়া নির্মান করেন কাভি আলবিদা না ক্যাহনা, স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার, অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল। ব্যবসাসফল হলেও ছবিগুলো নিয়ে দর্শকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তাঁর সব ছবিতেই অন্যতম আকর্ষণ হল সংগীত। সেই ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ থেকে ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল’ সব সিনেমার মিউজিক অ্যালব্যাম দর্শকদের মন ছুঁয়ে গেছে।

শুধু পরিচালনায় নয়, প্রযোজক হিসেবেও তিনি বেশ সফল। বাবার প্রযোজনা সংস্থাকে নিজে দায়িত্ব নিয়ে আরো বর্ণিল করেছেন। ২০০৩ সালে শাহরুখ, সাইফ আলী খান ও প্রীতি জিনতাকে নিয়ে বানান ‘কাল হো না হো’ মত দারুণ জনপ্রিয় সিনেমা।

এছাড়া প্রযোজক রুপে দেখা গেছে দোস্তানা, আই হেইট লাভ স্টোরিস, উই আর ফ্যামিলি, অগ্নিপথ, বোম্বে টকিজ, কাপুর অ্যান্ড সন্স, গিপ্পি, বদ্রিনাথ কি দুলহানিয়ার মত সিনেমা। গত বছর মুক্তি পাওয়া বিখ্যাত তেলেগু সিনেমা ‘বাহুবলি সিরিজ’ কে বিশ্বের দরবারে বলিউডি রুপে সহজবোধ্য ভাবে তুলে ধরেছেন প্রযোজক হয়ে। অবশ্য প্রযোজক হিসেবে বানিয়েছেন শানদার, ওকে জানুর মত ব্যর্থ সিনেমাও।

উপস্থাপক হিসেবে প্রতিভা ছড়িয়েছেন ‘কফি উইথ করণ’-এর মত দারুণ জনপ্রিয় সেলিব্রেটি শোতে। অভিনয়েও দেখা মিলেছে বেশ কিছু সিনেমায়। কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবেও রয়েছে সুপরিচিতি। ২০০৬ সালে বিশ্ব সুন্দরীর আসরে ছিলেন বিচারকের আসনে। তাঁর প্রযোজনায় স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার ২, সিম্বা, কলঙ্ক’র মত সিনেমাও এসেছে।

জীবনকে তিনি আর দশ জনের মত দেখেন না। বিয়ে করেননি, করতেও চান না। মনে করেন, বিয়ে করার চেয়ে তাঁর ক্যারিয়ার বেশি ‍গুরুত্বপূর্ণ। যদিও তিনি রুহি ও ইয়াশ নামের জমজ সন্তানের গর্বিত বাবা।

কেন বিয়ে করেননি করণ? অনেকেই বলে তিনি আসলে সমকামী। সেটা খুব একটা ভুলও নয়। নিজের আত্মজীবনী  ‘অ্যান আনসুটেবল বয়’-এর মোড়ক উন্মোচনে এসে এই ব্যাপারে কোনো রাখঢাক না রেখেই তিনি বলেছিলেন, ‘সবাই জানে, যৌনতা নিয়ে আমি কি ভাবি। সেটা নিয়ে আমার চিৎকার করার কিছু নেই। আমি কিছু বলবোও না, কারণ জনসম্মুখে সে নিয়ে কথা বললে হয়তো আমাকে জেলেও যেতে হতে পারে!’

অভিনয়ের খাতাতেও নাম লিখিয়েছেন তিনি। কিংবদন্তিতুল্য ছবি ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’-তে বাস্তবের বন্ধু শাহরুখ খানের বন্ধুর চরিত্র করেছেন অল্প কিছু সময়ের জন্য। তবে পুরোদস্তর অভিনেতা বনে যান ‘বোম্বে ভেলভেট’ ছবিতে। মজার ব্যাপার হল, সিনেমাটির জন্য পারিশ্রমিক হিসেবে মাত্র ১১ রুপি নিয়েছিলেন তিনি।

বাবা ইয়াশ যোহর তাঁকে অভিনেতা হিসেবে লঞ্চ করার জন্য মনস্থ করেছিলেন। সেই স্বপ্নে পানি ঢেলে তিনি এখন বলিউডের সেরা নির্মাতাদের একজন। নির্মাতা হিসেবেই তিনি লম্বা সময় থাকতে চান রুপালি জগতে। লক্ষ্যটাও খুব মোক্ষম। ভারতকে এনে দিতে চান খ্যাতনামা অস্কার পুরস্কার। করণের স্বপ্ন, অস্কারের পুরস্কার হাতে নিয়ে বলবেন, ‘ভারত, এটা তোমার জন্য!’

 

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।