দু’রুমের ছোট্ট ফ্ল্যাটেই এক টুকরো বলিউড!

যদি বলি দুই রুমের একটা ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টেই হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় ছবির সংগ্রহশালা – তাহলে ভুল বল হবে না!

হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। লক্ষাধিক ছবি আর নেগেটিভ সংগৃহীত আছে মুম্বাইয়ের ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে। আপনি যদি সেখানে ঢুকেন তাহলে মনে হবে কোনো অগোছালো পাগলাটে লোকের ঘর। কিন্তু এটাই হচ্ছে কামাত ফটো ফ্ল্যাশ স্টুডিও। এর সাথে আর কোনো কিছুরই তুলনা চলে না।

এই স্টুডিওর পেছনের ইতিহাস নিয়ে একটু বলি। দামোদর বিষ্ণুপথ কামাত নামের এক ব্যক্তি যুবক বয়সে ঘর ছাড়েন বম্বে টকিজে কাজ করবেন বলে। সেটা ত্রিশের দশকের ঘটনা। তিনিই ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন এই বিখ্যাত ফটো স্টুডিও।

এই দামোদর কামাত লোকটা দারুণ প্রতিভাবান ছিলেন। তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল ঠিক সময়টাকে উপলব্ধি করে সেই মোমেন্টকে ফ্রেমে বন্দী করতে পারতেন। ১৯৬০ সালে রাজ কাপুরের ‘জিস দেশ মে গাঙ্গা ব্যাহতি হ্যায়’-সিনেমার শ্যুটিংয়ের সময় দামোদরকে স্টিল ফটোগ্রাফার হিসেবে নিযুক্ত করেন।

রাজ কাপুর দামোদার কে বলেছিলেন যে শট শেষ হবার পরে উনি স্টিল ফটোগ্রাফ তুলবেন। কিন্তু দামোদার শ্যুটিংয়ের সময় দেওয়ালের উপর উঠে কয়েকটা ফটো তুলে চলে যায়। পরবর্তী দিন তিনি ফটো গুলো প্রিন্ট করে আনেন যা দেখে রাজ কাপুর মুগ্ধ হয়ে যান। এরপর তাঁর পরবর্তী সকল সিনেমায় স্টিল ফটোগ্রাফার হিসাবে দামোদরকে নিয়োগ দেন।

দামোদর কামাতের সেসময়কার প্রায় সব প্রযোজক ও অভিনেতার সাথে সুসম্পর্ক ছিল। অশোক কুমার সবসময় বাজে পোজ দিতেন কিন্তু তিনি জানতেন দামোদার ঠিকঠাক ছবিই তুলবেন। মীনা কুমারির চোয়াল চওড়া হবার কারণে দামোদর সবসময় মীনা কুমারীর চোখকে ফোকাস করে ছবি তুলতেন।

কিন্তু, একজনের ছবি তুলতে তিনি কোন কারচুপি করতেন না। তিনি হচ্ছেন মধুবালা। কেননা তাঁকে যেকোনো দিক থেকেই সুন্দর দেখাতো। মধুবালার বেশিরভাগ ছবিই কিন্তু দামোদরের তোলা। মধুবালাকে একবার একটা ক্লোজ আপ শটের কিছু ছবি তোলেন দামোদার। ছবি দেখে খুশি হয়ে মধুবালা দামোদরকে রোয়েলফ্লিক্সের ক্যামেরা উপহার দিয়েছিলেন – যেটা ছিল সেসময়কার অন্যতম দামী ক্যামেরা।

পোর্টফলিও সেই যুগে চালু না হওয়ায় অধিকাংশ প্রযোজক দামোদরের কাছেই অভিনেতাদের পাঠাতেন, কাস্ট করার আগে স্ক্রিন প্রেজেন্স বুঝে নিতেন। রাজেন্দ্র কুমার ‘জোগান’ সিনেমায় একটা ছোট্ট রোল করেছিলেন। সেখানে প্রযোজকের নজরের পরায় তাঁকে দামোদরের কাছে পাঠানো হয়।

রাজেন্দ্র কুমার ভয়ে ভয়ে ছিলেন তাই কোন পোজ দিতে পারছিলেন না। দামোদর রাজেন্দ্রকে নিয়ে কটুক্তি করতে করতে কয়েকটা ছবি তুলেন। সেখানকার স্টিল প্রযোজকের পছন্দ হওয়ায় রাজেন্দ্র কুমার ‘ভাচান’ সিনেমায় মুল ভুমিকায় অভিনয় করেন।

মীনা কুমারীর সবচেয়ে আইকোনিক ছবিটা হচ্ছে ‘ফুল অওর পাত্থার’ সিনেমার। এই সিনেমার একটি আবেগী দৃশ্যের শ্যুটিং কেবলমাত্র শেষ হয়েছে। তখন তিনি দামোদরের সাথে কথা বলার জন্য আসছিলেন, টেকনিশিয়ানরা লাইট রেডি করতেছিল পরবর্তী শর্টের জন্য।

ঠিক এমন তাঁদের একজন আড় চোখে মীনা কুমারীর দিকে তাকায় – ঠিক এই মুহুর্তকে ফ্রেমবন্দী করেছিলেন দামোদার। এই বিখ্যাত ছবিটি পরবর্তীতে সিনেমার প্রমোশনে ব্যবহৃত হয়েছিল। এই ঘটনার এক বছর পরেই দামোদার মারা যান। সেটা ১৯৬৭ সালের ঘটনা। ১৯২০ সালের ২৭ নভেম্বর এসেছিলেন পৃথিবীতে, ৪৭ বছর বাদে সেই দিনটাকেই বেছে নেন চলে যাবার জন্য।

দামোদরের সংগ্রহে রেখে যান অসংখ্য অমুল্য স্টিল ফটোগ্রাফ। সংখ্যার হিসাবে ফটোর সংখ্যা তিন লক্ষাধিক। কিন্তু এই পরিবারের লিগ্যাসি এখানেই থেমে থাকেনি। দামোদার যখন মারা যান তখন তার ১৩ বছরের একটি পুত্র ছিল যার নাম বিদ্যাধর দামোদর কামাত৷ তাঁর বাবার লিগ্যাসি তাকে সাহায্য করে স্টিল ফটোগ্রাফির কাজ পেতে।

২০০২ সাল পর্যন্ত তিনিও অসংখ্য সিনেমার স্টিল ফটো তুলেছেন। যার ফলে কামাত ফটো ফ্লাশে আর্কাইভ করা ছবির সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ লক্ষাধিক।

এই আর্কাইভে এখনো কোন সফটওয়্যার ব্যবহার হয় না। তাদের কোন ছবি দেখার কথা বললেই তারা ৫ মিনিটের মধ্যে আপনাকে অরিজিনাল ফটো এনে দেখিয়ে দিবে। ১৯৪৫ সাল থেকে এই স্টুডিও তথা এই পরিবার হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে যাচ্ছে। সাহেব বিবি গোলাম, মাদার ইন্ডিয়া কিংবা উমরাও জানের ছবি আছে এখানে। আর রাজ কাপুর ও অমিতাভ বচ্চন সহ আরো বিখ্যাত বিখ্যাত সব সিনেমার স্টিল ফটোগ্রাফ এই আর্কাইভে সংগৃহীত৷

কিছু কিছু সাদা কালো সিনেমার সিনেমার স্টিল কালার প্রিন্ট করা হয়েছে যার মধ্যে সংগাম সিনেমার স্টিল অন্যতম। আজকাল অনেক সিনেমায় রেফারেন্স হিসাবে অনেক স্টিল ছবি দেখানো হয় সেগুলো কিন্তু কামাত ফটো ফ্লাশের আর্কাইভ থেকেই অধিকাংশ সংগৃহীত।

এই স্টুডিওর ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা বলে শেষ করা যাবে না। ম্যানচেস্টারের এক এক্সিবিশনের জন্য এখান থেকেই কয়েকশ ছবি সংগ্রহ করা হয়েছিল। ২০০৭ সালে এই স্টুডিও কে ওশিয়ান পুরষ্কার দেয়া হয় এক্সিলেন্স অফ আর্ট অ্যান্ড ডিজাইন ইন ফিল্ম এর জন্য। পুরস্কার নিতে আমন্ত্রন জানানো হয়েছিল পুরো কামাত পরিবারকে।

এই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম অভিষেক ও নেহা ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে নেননি। কিন্তু তারা এই আর্কাইভের মূল্য বুঝেন এবং আরো বহু বছর এভাবেই ছবিগুলো আগলে রাখতে চান৷

– ফিল্ম কম্প্যানিওন ও লাইভ মিন্ট অবলম্বনে

 

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।