কে.এম. নানাবতি কেস: ভারতবর্ষ কাঁপিয়ে দেওয়া এক খুনের মামলা!

বোম্বে হাইকোর্টে তখন ভারতবর্ষের সবচাইতে হাই প্রোফাইল মার্ডার কেসের বিচার চলছে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলেছিল সেই কেস শেষ পর্যন্ত মাথা গলাতে হয়েছিল ভারতবর্ষের তখনকার প্রধানমন্ত্রী জহর লাল নেহেরুকেও। জড়িয়ে গেলো সুপ্রিম কোর্টও। ভারতবর্ষের বিচার ব্যবস্থা থেকে জুরি প্রথা চিরকালের মতো উঠে গেলো এই কেসের পর!

ব্যাপারটা কি সেটা ধরতে পারছেন নাতো?

যদিও আপনারা অনেকেই বুঝে গেছেন কোন হত্যা রহস্যের বিচারের কথা বলতে চাইছি। এটা হলো আজ অবধি ভারতবর্ষের সবচাইতে আলোচিত সেই বিখ্যাত প্রেম আহুজা মার্ডার কেস!

২৫ এপ্রিল, ১৯৫৯। সোমবার সকালটা আর পাঁচটা সকালের থেকে খুব আলাদা বলে মনে হয়নি কারও। দু’মাস পরে ঘরে ফিরেছেন ভদ্রলোক। তিনি পুরো ঘটনার মূল চরিত্র – কাওয়াস মানেকশো নানাবতি। সকালে স্বামী-স্ত্রী পোষা কুকুরকে ডাক্তার দেখিয়ে, ছেলেমেয়েদের জন্য সিনেমার টিকিট কেটে ফিরেছেন কোলাবার ফ্ল্যাটে।

নানাবতি ও তাঁর স্ত্রী সিলভিয়া

এখনও লাঞ্চের দেরি আছে। এমন ছোট ছোট অবসরই পুরনো দাম্পত্যকে রিনিউ করার সময়। স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখলেন সাঁইত্রিশ বছরের পুরুষটি। ছ’ফুট লম্বা, ছিপছিপে, সুপুরুষ। নেভি কম্যান্ডারের ধবধবে সাদা ইউনিফর্ম পরলে তো কথাই নেই। পার্টিতে, ক্লাবে, সরকারি অনুষ্ঠানে গিয়ে তিনি দাঁড়ালেই মেয়েদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য পড়ে যায়।

অথচ দশ বছরের সুখী দাম্পত্য পেরিয়ে আসা আঠাশ বছরের সুন্দরী স্ত্রী কেমন শীতল। ক’দিন ধরেই এড়িয়ে যাচ্ছিলেন।
এখন স্বামী কাছে টানতে চাইলে হাত সরিয়ে দিলেন, ‘গায়ে হাত দিয়ো না।’

– ‘তুমি কি আমাকে ভালবাসো না আর, সিলভি? তবে কি আর কেউ?’

স্বামী-স্ত্রী’র কথাবার্তার মধ্যেই বেয়ারা টোকা দিয়ে জানিয়ে গেল, লাঞ্চ সার্ভ করা হয়েছে। গ্রেভি কাটলেট, প্রন রাইস দিয়ে দুপুরের খাওয়ার পর বউ-ছেলেমেয়েদের মেট্রো সিনেমায় পৌঁছে দিলেন স্বামী। ইন্টারভালে আইসক্রিম কিনে দিতে বললেন। যেন সবই ঠিকঠাক, তেমন কিছুই ঘটেনি।

তরুণ নানবতি

তারপর? তার একটু পরেই চলেছিল তিনটি গুলি, কাওয়াস মানেকশো নানাবতির রিভলভার থেকে। সেতলভাদ লেনের ‘জীবনজ্যোত’ বিল্ডিং-এর ফ্ল্যাটে নিজের বেডরুমের অ্যাটাচড বাথরুমে লুটিয়ে পড়েছিল সিলভিয়ার প্রেমিক প্রেম আহুজা।

গুলির শব্দ শুনে প্রেম আহুজার বোন ম্যামি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখে, ভয়ার্ত চাকরের দিকে রিভলভার তাক করে রেখে বেরিয়ে যাচ্ছেন নানাবতি। নিচে দারোয়ান আটকাতে গেলে বললেন, ‘আমিই যাচ্ছি পুলিশের কাছে।’

তা-ই গেলেন। সিআইডি-র ক্রাইম ব্রাঞ্চে ডেপুটি কমিশনার জন লোবো-র ঘরে ঢুকলেন। ঠাণ্ডা গলায় বললেন, ‘আই অ্যাম কম্যান্ডার কাওয়াস মানেকশো নানাবতি। আই হ্যাভ শট আ ম্যান।’

নানবতিদের পারিবারিক ছবি

সেই তিনটে গুলি শুধু তৎকালীন বোম্বে শহর নয়, গোটা ভারতবর্ষকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আপাতদৃষ্টিতে যা একটা ওপেন-অ্যান্ড-শাট মার্ডার কেস, তা নিয়ে পাঁচ বছর গোটা দেশে শ্বাসরুদ্ধ উত্তেজনা। কেস সুপ্রিম কোর্টে উঠল, প্রশ্ন উঠে গেল দিল্লির সংসদে, জবাব দিতে হল স্বয়ং জওহরলাল নেহরুকে। ভারত থেকে চিরকালের জন্য উঠে গেল জুরি দিয়ে বিচার করার প্রথা। ট্যাবলয়েড কাগজ বেস্টসেলার হয়ে উঠল।

পর পর ফিল্ম তৈরি হল নানাবতি-সিলভিয়া-আহুজার ত্রিকোণ প্রেম নিয়ে। ১৯৬২ সালের ‘ইয়ে রাস্তে হ্যায় পেয়ার কে’ থেকে শুরু করে ‘রুস্তম’ পর্যন্ত! নেভি কম্যান্ডারের ভূমিকায় সুনীল দত্ত থেকে অক্ষয় কুমার। বোম্বে কাওয়াস নানাবতি তখনও জেলবন্দি।
কেসের ডেট পড়লে বুকে ঝকঝকে মেডেল ঝুলিয়ে পুরোদস্তুর ইউনিফর্ম পরে নানাবতী হাজিরা দেন।

মেয়েরা চেঁচায়, ‘কাওয়াস! কাওয়াস!’ ছুড়ে দেয় প্রেমপত্র, লিপস্টিক-ছাপসুদ্ধ টাকার নোট। ঠাসা ভিড় থেকে স্লোগান ওঠে, নানাবতী জিন্দাবাদ। যেন খুনের আসামি নয়, ফিল্মের হিরো। তাঁর উকিলরা দাবি করেছেন, খুন করেননি তিনি, ধস্তাধস্তিতে গুলি চলে গিয়েছে।

সুখী পরিবার, অথচ…

নৌসেনার অফিসারদের ক্ষিপ্ত করেছিল নানাবতী কেস। বলাবলি করছিল, ‘আমি দেশ বাঁচাতে পড়ে থাকব সমুদ্রে, আর একটা প্লেবয় আমার বউকে ফুঁসলে নিয়ে যাবে? তাকে ছেড়ে দিতে হবে?’

নৌসেনা দাঁড়ায় নানাবতীর পাশে, সাক্ষ্য দিতে আসেন স্বয়ং নেভি কম্যান্ডার, ‘আমার সঙ্গেও এমন হতে পারে,’ এই আবেগ থেকে লোকে গলা ফাটায় কোনও এক পক্ষে। ফাঁসি দিতেই হবে। নইলে, ছেড়ে দিতেই হবে।

এর মধ্যে ঘটলো আরেক ঘটা। নানাবতী ছিলেন পার্সি। বোম্বে শহরের অর্ধেকটা তখন পার্সিদের। যেমন টাকা, তেমনই দানধ্যান।
জামসেদজি জিজিবয়ের অনুদানে তৈরি জেজে হাসপাতাল। মাহিম থেকে বোম্বে শহর জুড়বার রাস্তা তৈরি তাঁর স্ত্রীর টাকায়।

পেটিট লাইব্রেরি, পার্সি জেনারেল হাসপাতাল, মধ্যবিত্তের নানা আবাসন, সর্বোপরি তাজ হোটেল, সব পার্সিদের। আইনজীবীদের মাথায় ননি পালকিওয়ালা, সোলি সোরাবজি, ফলি নরিম্যান। ব্যবসা থেকে থিয়েটার, রেসের মাঠ, পার্সিরা বম্বের প্রাণশক্তি। বিখ্যাত ল ফার্ম ‘মাল্লা অ্যান্ড মাল্লা’-র ক্লায়েন্ট ইন্ডিয়ান নেভি।

ব্লিটজ পত্রিকা সেই সময় বড় ভূমিকা রাখে মামলায়।

ধনজিশ নানাবতী তার সিনিয়র পার্টনার। তাঁর ভাইপো নেভি কম্যান্ডার কাওয়াস নানাবতি। যার ‘আইএনএস মাইসোর’ যুদ্ধজাহাজে দিন কাটিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, কন্যা ইন্দিরা।

সেই কাওয়াস নানাবতীর সুন্দরী ইংরেজ স্ত্রীকে প্রলুব্ধ করে পার পেয়ে যাবে একটা সিন্ধি গাড়ির ডিলার? দোকানদারি, তেজারতি আর প্রোমোটারি করা যে সিন্ধিরা মাত্র ক’দিন আগেই পাকিস্তান থেকে এসেছে এ দেশে? প্রেম আহুজাকে খুনের দায়ে নানাবতির বিরুদ্ধে মামলা কার্যত দাঁড়িয়ে গিয়েছিল পার্সি বনাম সিন্ধি মামলায়। গোটা পার্সি সমাজ ছিল নানাবতির পিছনে।

পার্সি রুসি কারাঞ্জিয়ার ট্যাবলয়েড ‘ব্লিৎজ’ যে ভাবে দিনের পর দিন মামলার রিপোর্ট করেছে তা এক নিরস্ত্র, নিহত যুবককে ‘ভিলেন’, অন্যের প্রতি অনুরক্ত মহিলাকে ‘ভিক্টিম,’ আর খুনিকে হিরো বানানোর চিত্রনাট্য।

দীর্ঘ পাঁচ বছর বাদে রায় বেরোল! বোম্বে সেশন কোর্টের প্রধান বিচারক নানাবতীকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবৎজীবন কারাবাসের আদেশ দিলেন কিন্তু জুরিরা জানালো তাদের মতে নানাবতী নির্দোষ।

জট কাটলো না। কেস গেলো বোম্বে হাইকোর্টে। বোম্বে হাইকোর্ট সেসন কোর্টের রায় বহাল রাখলো। হাইকোর্টের মতে জুরিরা মিডিয়ার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।

তাই তাদের রায় এখানে খাটবে না। আইনগত ঝামেলা এড়ানোর জন্যে পার্লামেন্টে বিল পাস্ করে জুরি প্রথা তুলে দেয়া হলো।
তাই ভারতবর্ষের আইন প্রক্রিয়ায় এটাই শেষ জুরি ব্যবস্থা ছিল যদিও জুরিদের রায় হাইকোর্ট মানেনি। অন্য দিকে, বোম্বে হাই কোর্টে নানাবতীকে খুনের দায়ে যিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন, সেই বিচারপতি চৈনানি ছিলেন সিন্ধি।

আর যে যুক্তিটা ধসিয়ে দিয়েছিল নানাবতীর উকিলদের ‘ধস্তাধস্তি’ থিয়োরিকে, তা জুগিয়েছিলেন এক সিন্ধি আইনজীবী।
তাঁর নাম রাম জেঠমালানি। আহুজা পরিবারের স্বার্থরক্ষায় নিযুক্ত ৩৬ বছরের জেঠমালানিই প্রশ্ন তোলেন, ধস্তাধস্তি হয়ে থাকলে আহুজার কোমরের তোয়ালেটা যেমন-কে-তেমন রয়ে গেল কী করে?

কাগজে সেই রিপোর্ট বেরোতেই ফ্লোরা ফাউন্টেনে হকাররা গলা ফাটাতে লাগল, ‘আহুজা তৌলিয়া, মরেঙ্গা তো ভি নহি গিরেঙ্গা। নানাবতী কা পিস্তল, ব্যাং ব্যাং ব্যাং।’

তোয়ালে, খেলনা পিস্তল বিক্রির এমন মওকা ছাড়বে না ‘বোম্বে’। উকিলরা যতই গল্প ফেঁদে বসুক, আদালত কিন্তু ছিল অনড়।
আঠারো মাস প্রেম চলেছে সিলভিয়া-আহুজার, বিয়েতে আগ্রহী ছিল সিলভিয়া, রাজি ছিল না আহুজা। তবু সরে আসতে পারেনি সিলভিয়া।

নেভি কম্যান্ডার কে.এম মানেকশো নানাবতি

যে প্রেমের পরিণতি অনিশ্চিত, স্বামীকে তার কথা না জানিয়ে পারেনি। আদালতে নানাবতী বলেন, তিনি জানতে গিয়েছিলেন আহুজা তার স্ত্রী, ছেলেমেয়ের দায়িত্ব নিতে রাজি আছে কি না। আদালত মানতে পারেনি।

গুলি-ভরা রিভলভার নিয়ে কেউ অন্যের দায়িত্ববোধের জরিপ করতে যায় না। নিজের বাবা-ভাই থাকতে আহুজাকে সন্তানের দায়িত্ব দিতে এত আগ্রহই বা কেন?

ফৌজদারি আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্ট, সর্বত্র কাওয়াস নানাবতি খুনি সাব্যস্ত হন। কিন্তু ছা়ড়া পেয়ে গেলেন নানাবতি। গভর্নর বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত ক্ষমার আবেদনে সই করলেন।

একই সঙ্গে ছাড়া পেলেন সিন্ধি ব্যবসায়ী ভাই প্রতাপ। সর্বজনসম্মানিত এই ধনী ভদ্রলোক মিথ্যা সাক্ষ্যে ফেঁসে গিয়েছিলেন একটা প্রতারণার মামলায়। পার্সি নানাবতীর সাজা মাফ করলে সিন্ধি সমাজ ফুঁসে উঠবে, তাই একই সঙ্গে মাফ করা হল ভাই প্রতাপকে।

কিন্তু ভারতে ‘সেলিব্রিটি’-র বিচারের প্রোটোটাইপ তৈরি হয়ে গেল। যাবজ্জীবন সাজায় দণ্ডিত নানাবতী মাত্র বছর দেড়েক কাটিয়েছেন সাধারণ কয়েদির জীবন, তারও অনেকটা জেজে হাসপাতালে। সেখানে তাঁর জন্য আলাদা ফ্যানের ব্যবস্থা করেছিলেন তাঁর (পার্সি) ডাক্তার।

মাঝের মানুষটি হলেন নানাবতি

তার পর ‘বন্দী’ ছিলেন লোনাভালার ‘সানডাউন’ বাংলোতে। সেখানে দেখা করে গিয়েছেন হলিউডের হিরোইন ভিভিয়েন লে। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলছে। জেসিকা হত্যার মনু শর্মা, বিএমডব্লিউ হিট অ্যান্ড রান কেসে সঞ্জীব নন্দা, কৃষ্ণসার হরিণ মামলায় সালমান খান।

নানাবতী কি করলেন শেষে? জীবনের স্ক্রিপ্ট নতুন করে লিখলেন নিজেই। সপরিবারে চলে গেলেন কানাডার ওন্টারিওতে।
নয়া অবতারে বিমার সেলসম্যান। সিলভিয়া চাকরি নিলেন ব্যাংকে। আশি বছর পার করে (২০০৩) মারা গিয়েছেন কাওয়াস নানাবতী।

সিলভিয়া এখন দিন কাটাচ্ছেন নাতিপুতি নিয়ে।

মামলার ব্যাপারে একটা তথ্য না দিলেই নয়। ৬০ বছর আগের এই কেসের কার্যক্রম চলাকালীন কোর্টের বাইরে মানুষের বিপুল জনসমাগম হতো এবং কোর্ট শুরুর আগে অনেকেই কোর্টের সামনে টাকা নিয়ে প্রস্তুত থাকতো যেন টাকা দিয়ে হলেও কোর্ট রুমে উপস্থিত থাকা যায়!

নেভির একটা অনুষ্ঠানে নানাবতি দম্পতি (বামে)

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।