বিনোদনবঞ্চিত মা-খালাদের নিয়ে রসিকতা করা জেনারেশন

নোবেল নামের একটা শিল্পী আছে, ভারতের একটা চ্যানেলের অনুষ্ঠান থেকে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এমন না যে মা-খালা-বাবা-চাচার মধ্যে তাকে নিয়ে খুব উৎসাহ আছে। উৎসাহ যারা দেখায়, তারা প্রধানত তরুণ। ভারতীয় কয়েকটি টিভি চ্যানেল বন্ধ হওয়ায় সবচেয়ে উত্তেজিত এবং উৎসাহিত অংশটিও এরাই।

জি বাংলা বন্ধ হলে সারেগামাপা দেখাও বন্ধ হবে, তাহলে এই উত্তেজনার অর্থ কী? অর্থ এই যে, এই উত্তেজিত ও উৎসাহিত তরুণরা জি বাংলা দেখার জন্য কেবল নেটওয়ার্কের উপরে নির্ভরশীল না। সুতরাং বিনোদনের কোনো ভ্যাকুয়াম এখানে তৈরি হচ্ছে না।

কথা হলো, দেশের অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে সারেগামাপা কেনো দেখে? কারণ, সেখানে এমন কিছু পাওয়া যায়, যেটা দেশের অনুষ্ঠানে নেই। ঠিক এই জায়গাটা বুঝলেই ভারতীয় সিরিয়াল ও চ্যানেল নিয়ে বিতর্কের সুরাহাটা হতে পারে। আমার ষাটোর্ধ্ব বাবা প্রসেনজিত অভিনীত ‘মহানায়ক’ সিরিয়ালটি কেনো দেখতেন? ওই কারণেই, ওতে যা ছিল, তা আমার দেশের অনুষ্ঠানে পাওয়া যায় না।

আমার বিনোদনের কোনো অভাব নেই। কারণ আমার ইউটিউব আছে, নেটফ্লিক্স আছে, টরেন্ট আছে। আমার রুচি এভাবেই তৈরি হয়েছে যাতে রক্তকরবী আর গেম অফ থ্রোনস সমান তৃপ্তির সাথে হজম করতে পারি। এখন ‘নিম্নরুচির’ পটলকুমার গানওয়ালা বাদ দিয়ে যদি আমার বাপকে বলি ডেক্সটার দেখতে, তার ফলাফল খুব একটা সুখের হবে না।

এই বিনোদনবঞ্চিত মানুষ, জীবনসংগ্রামে প্রায় সময়ই পরাজিত মধ্যবিত্ত, অফিস-বাজার-লোকাল বাস ঠেলে রাত বিরেতে ঘরে ফেরা প্রৌঢ়, রান্নাঘর-গুদামঘর-স্নানঘর সামলানো মা-খালারাই সিরিয়াল দেখেন। দেখেন তার কারণ প্রথমত, এর চেয়ে ভালো কিছু তারা পান না, দ্বিতীয়ত এর সাথে তারা নিজেদের এক করে দেখতে পারেন। ওতে আর কিছু না থাক, একটা পরিবারের গল্প থাকে। সিরিয়ালে যে কুটনামি, পরচর্চা দেখানো হয়, এ তাদেরই জীবনের গল্প।

ওইখানে ন্যাকামি ছ্যাবলামিটা দেখায় সেটা তাদের এই প্রতিদিনের হেরে যাওয়া জীবনে কমিক রিলিফ আনে। আইমএমডিবির নাইন পয়েন্ট ওয়ান রেটিং এর গেম অফ থ্রোনস যেমন তারা হজম করতে পারেন না, তেমনি বগলকাটা গেঞ্জি পরে ট্রাকের উপরে ঘুরে বেড়ানো বন্ধুত্ব আনলিমিটেড গোছের এয়ারটেল নাটকও তাদের ভালো লাগে না। এটা আমাদের পছন্দের কথা না হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতাটাকে স্বীকার করতে হবে।

ভারতীয় চ্যানেল আর তার অনুষ্ঠান এমন কিছু মহার্ঘ্য বস্তু নয়। কিন্তু তার সমতুল্য বা তার চেয়েও ভালো বিকল্প তৈরির দরকারটাও আছে। বাংলাদেশে কেনো এখন শীতের পাখির মতো নাটক বা বন্ধনের মতো সিরিয়াল তৈরি হয় না?

আমি প্রচুর ঘুরে বেড়াই দেখে আমার মা একবার বলেছিল, ‘তোমার ডানা আছে তাই উড়তে পারো, আমার নেই তাই তোমার কাছে তোমার কাছে গল্প শুনি।’ সিরিয়াল দেখার জন্য মা-খালাদের নিয়ে রসিকতা করতেই পারেন, কিন্তু তাদের সীমাবদ্ধ কয়েকশো স্কয়ারফিটের দুনিয়াটার ভিতরে নিজেকে রেখে একবার ভেবে দেখবেন। চোখে লাগানো চশমার রংটা পালটে যাবে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।