যুবতী/সর্বতোমঙ্গল রাধে বিতর্ক, মৌলিকতা এবং সাহিত্য

আমার মতোন সুন্দর রাধে যদি পেতে চাও,

গলায় কলসি বেধে যমুনাতে যাও।

কোথায় পাবো হাড় কলসি কোথায় পাবো দড়ি,

তুমি হও যমুনা রাধে আমি ডুইবা মরি।

একাডেমিক কোর্সে ‘লোকসাহিত্য এবং লোকসাহিত্য তত্ত্ব’ পড়া একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এতোটুকু জানি যে এরকম একটা পালার ঢঙে গাওয়া গানের ইতিহাস ‘ব্যান্ড সরলপুর’, ‘শাওন-চঞ্চল’ কিংবা ‘আইপিডিসি আমাদের গান’ হিসাবের অনেক অনেক আগের।

যারা কন্টেক্সট জানেন না তাদের জ্ঞাতার্থে উল্লেখ করছি, যে কিছুদিন আগে ‘আমাদের গান’ এর আয়োজনে চঞ্চল চৌধুরী ও মেহের আফরোজ শাওন সর্বতোমঙ্গল রাধে গানটি কভার দিয়েছেন, এবং সেখানে লেখা ছিল গানটি সংগৃহিত। আর সরলপুর নামের একটি ব্যান্ড দাবী করছে গানটি তাদের তৈরি করা মৌলিক গান। তারা ‘আমাদের গান’র ওপর কপিরাইট বিষয়ক অভিযোগ এনেছে, ফলে ইউটিউব গানটি সরিয়ে ফেলেছে। আসলেও আমাদের গানের কাজটা নৈতিক ভাবে অসঙ্গত। তাদের উচিত ছিল কভারটি আপলোড করবার আগে এই বিষয় গুলো পরিষ্কার ভাবে উপস্থাপন করা।

তো সেই আগ্রহের জায়গা থেকেই সরলপুরের দেয়া বিবৃতি গুলো দেখলাম অনেক সময় ধরে। আশ্চর্য করবার মতোন বিষয় হচ্ছে, তারা তাদের সব ধরণের বিবৃতিতে বারবার উল্লেখ করছে গানটি সম্পূর্ণ মৌলিক। তারা এটিও বলছে যে নিয়মিতভাবে পালা, রাধা কৃষ্ণকে নিয়ে হওয়া গান তারা শুনেছে, তাদের ভালো লেগেছে এবং এটা অনেকটা তেমন চিন্তা থেকে লেখা গান। কিন্তু তাদের নিজস্ব গীতিকার এই গানটি রচনা করেছেন, এই গানের সত্ত্বাধিকার নিয়ে এর আগেও মামলায় গিয়েছে সরলপুর। ২০১৮ সালে নিজেদের মৌলিক গান হিসেবে এই গানটির কপিরাইট নিয়েছে তারা।

কিন্তু আমি তাদের কোনো বিবৃতিতে দেখিনি তারা স্বীকার করেছে যে গানটিতে , ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র ‘মহুয়া’ শীর্ষক একটা নির্দিষ্ট পালার কিছু চরণ আছে। তারা কোথাও এটিও বলেনি যে তারা পালাগানের এই সম্ভারের প্রতি কৃতজ্ঞ, এমন ঢঙের গানের প্রতি কৃতজ্ঞ, তাদের অনুপ্রাণিত করবার জন্য। কোথাও ই মহুয়া পালার স্বীকৃত লেখক ‘দ্বিজ কানাই’ এর নাম নেই। নেই সংগ্রাহক চন্দ্র কুমার দে, সম্পাদক দীনেশ চন্দ্র সেন রায়বাহাদুর এর নাম। এমনকি শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ধারা অবলম্বন করার ও কোনোরকম স্পষ্ট উল্লেখ নেই।

দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ মহুয়া পালার ৫ নম্বর গীতিকবিতা ‘নদ্যার ঠাকুরের সঙ্গে মহুয়ার জলের ঘাটে দেখা’ অংশের শেষ চার চরণে স্পষ্ট উল্লেখ আছে,

লজ্জা নাই নির্লজ্জ ঠাকুর লজ্জা নাইরে তর।

 গলায় কলসী বাইন্দা জলে ডুব্যা মর।।

 কোথায় পাবো কলসী কইন্যা কোথায় পাবো দড়ী।

 তুমি হও গহীন গাঙ আমি ডুইব্যা মরি।।

সরলপুরের আরেকটা বড় দাবীর জায়গা হচ্ছে গানটি সম্পূর্ণ রচনা করার সাথে সাথে সুর ও তাদের করা। অথচ যারা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে একটু হলেও পরিচিত, তারা বলামাত্রই বুঝবেন যে সেই সময়কার প্রধান বাংলা সাহিত্য গুলো ঠিক কেমন ছিল। রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, মঙ্গল কাব্য, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, পদাবলী, গীতিকবিতা সব ই কিন্তু তখন ছিল কোনো সভা বা আসরকে কেন্দ্র করে সুর করে পাঠ করা সাহিত্য। মৈমনসিংহ-গীতিকার অনেকটা আগে রচনা হওয়া, সেই আরাকান রাজসভা কেন্দ্রিক আলাওলের পদ্মাবতী, পুরাণভিত্তিক প্রচলিত বাংলার মঙ্গলকাব্য সব ই কিন্তু এই ঢঙের অন্তর্ভুক্ত।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের দ্বারা আরো পরিষ্কার হওয়া যায় এই ধারা নিয়ে। বাসলি দেবীর চরণে উৎসর্গকৃত বড়ুচন্ডীদাসের সব কীর্তন গুলোই কিন্তু এমন ই চরণবিন্যাসের, এবং একই সুরে টেনে টেনে গাওয়া। কখনো প্রশ্নোত্তর মূলক, কখনো পাশ থেকে কয়েকজনের ধুয়া ধরা।

যুবতী রাধে, সর্বতোমঙ্গল রাধে, কিংবা বিনোদিনী রাধে, সব গুলো গান ই আবহমান বাংলার সেই লোকগীতি গুলোর ই সংস্করণ। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মহুয়ার পালার  মতোন এখানেও আছে নায়ক নায়িকার সংলাপধর্মী অভিসারের চরণ। এই গান গুলো, এই নির্দিষ্ট ধুয়া গুলো একেবারেই আমাদের দেশের লোকজ সঙ্গীতের অংশ। এখনো যাদের বাড়ি গ্রামে, তারা বিয়ে বাড়িতে  কনে কে হলুদ দেয়ার সময়, বা স্নান করাবার সময় বয়স্কা মহিলাদের মুখে এরকম সুরের অনেক গান শুনে থাকবেন। এই গান গুলো একেবারেই এই অঞ্চলের মাটির সাথে মেশানো। মানুষের মাথায় গাঁথা আছে সুর গুলোও।

সরলপুর নামের ব্যান্ডটি লোকায়ত জীবনের অংশ থেকে তুলে নেয়া কিছু চরণ, সুর, ধুয়া নিজেদের মতোন করে রিঅ্যারেঞ্জ করেছে। এবং তাদের কাজটা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার। কিন্তু সর্বজনস্বীকৃত একটি সাহিত্য উপাদানের নির্দিষ্ট অংশ চয়ন করে তৈরি করা গান কেউ কিভাবে মৌলিক প্রমাণ করে সেটার সম্পূর্ণ স্বত্ত্ব দাবী করতে পারে, এটা প্রথমত চিন্তার বিষয়। চিন্তার বিষয় এই কারণে যে তারা শিল্পী হয়েও আমাদের আদি সাহিত্য, সৃষ্টি গুলোকে আদৌ কতোটা মূল্যায়ন করছে বা ঋণস্বীকার করছে। তাদের দাবীর জায়গা হতে পারতো সঙ্গীত আয়োজন নিয়ে। গানটির রচয়িতা বা সুরকারের নয়। যে অভিযোগ তারা আমাদের গানের বিরুদ্ধে এনেছে সেটি কিছু অংশে তাদের ওপর ও বর্তায়।

এবং এই পুরো ঘটনায় আরো দুইটা বিষয় সামনে আসে। এক হল আমাদের নিজেদের ঐতিহ্য, দেশীয় সাহিত্য সংস্কৃতির ব্যাপারে অজ্ঞতা, দুই ভাষার/শব্দের উপযুক্ত ব্যবহারের নিয়ে অনীহা। একটা ব্যান্ড অথবা একটা বড় স্টুডিও যখন কোন আয়োজনে যাবে তখন তাদের কিছু জায়গায় সবসময় পরিষ্কার থাকতে হবে। মৌলিকত্ব, সত্ত্বাধিকার, রচয়িতা, সংগ্রাহক, সংগৃহিত এই শব্দ গুলো আসলে কোন ক্ষেত্রে কিভাবে ব্যবহার করা দরকার, কোথায় আসলেই দাবী করবার জায়গা থাকে আর কোথায় ঋণস্বীকার করে নিতে হয় এই বিষয় গুলো বোঝার ও দরকার আছে। আবার গোড়ায় ফিরে আদিরচনাকে সামনে আনায় যে অগৌরব নেই, বরং সেটিই উচিত ; তাও বোঝার আছে।

অনেকে ভেবে থাকবেন যে একটা পালা থেকে নেয়া নির্দিষ্ট দুইচরণের জন্য তো আর পুরো গানটি পালার হয়ে যায় না। সেক্ষেত্রে বলবো, লোকসাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি পরিবর্তনশীল। অঞ্চলভেদে পালা গুলোর চরিত্র, শিরোনাম, গল্প, সব ই আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু ভিত্তি টা একই আবহমান লোকজীবনের থাকে। এগুলো হয়ে যায় জনমানুষের। খোদ মহুয়ার পালাকেই অনেকে আঞ্চলিক ভাবে চিনে থাকে “মেওয়ার পালা” বলে। দেওয়ানা মদীনাকে জানে, মদিনা, আলাল দুলালের পালা ইত্যাদি নামে। আর সেক্ষেত্রে চরণ, শব্দে আসে অনেক পরিবর্তন।

রাধার বিরহ শোকে কৃষ্ণ ব্যাকুল হচ্ছে, রাধা তাকে কপট ভৎসনা করে বলছে যমুনার কালো জলে ডুবে আত্মহুতি দিতে; বঙ্গভূমিতে এই প্রেক্ষাপটে আজ অবধি রচনা হওয়া গান, কবিতা, পালা কিছুর সংখ্যাই কম নয়। রাধার বিরহে কীর্তনে পুড়েছে নান্দের নন্দন, পালায় হুমরা বেদের কন্যা মহুয়াকে না পেয়ে পুড়েছে নদ্যার ঠাকুর। ভিত্তি টা একই। এগুলোই আমাদের সাহিত্য। যা একেক সময়ের ব্যবধানে নতুন নতুন করে সামনে এসেছে, তৈরি হয়েছে নতুন উপাখ্যান। শুধু গান, পালা, নাটক এসব নয়, কালের পরিক্রমায় যেকোনো সাহিত্য বারবার এক জায়গায় ঘুরেফিরে আসাও সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।  আজ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এর রাধা বিরহ খণ্ড, বা বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে যেকোনো পরিচালক নতুন চলচ্চিত্র বানাতে পারেন। কিন্তু তিনি কখনোই দাবী করতে পারেন না, চলচ্চিত্রের প্লটটি তার মস্তিষ্কজাত, প্লটটি মৌলিক।

এই জটিলতা গুলোর অবসান হোক। সাহিত্য মানুষের জন্য সহজ হোক। ঋণস্বীকার, অনুপ্রেরণা এই শব্দ গুলো আরো প্রচলিত হোক। আমার লেখার প্রমাণস্বরূপ মহুয়া পালার নির্দিষ্ট চরণের অংশ টুকুর ছবি সংযুক্ত করে দিলাম।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।