জয়ার জয়রথ

তিনি প্রথাগত চলচ্চিত্রের নায়িকা নন। নায়িকা বলতে আমরা যেমনটা ভাবি সেখানে তিনি কেমন যেন বেমানান। আমাদের অধিকাংশের চোখে নায়িকারা হয়ে থাকবে চলচ্চিত্রের শো-পিস, কড়া মেকাপ নিয়ে স্বল্পবসনা হয়ে নাচ-গান করবে আর কিছু দৃশ্যে থাকবে; তিনি ঠিক তেমন নন। তবে তিনি নায়িকাও, সাথে সুঅভিনেত্রীও।

তাঁর কাজগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অধিকাংশ চলচ্চিত্র, নাটক কিংবা টেলিফিল্মের গল্প এগিয়েছে তাকে ঘিরে। অর্থাৎ তিনি নায়িকা যিনি অভিনয়কে জয় করেছেন। তিনি বাংলাদেশের চৌহদ্দি পেরিয়ে পা রেখেছেন ওপার বাংলায়, তাও পাঁচ বছর হয়ে গেল। বলছিলাম জয়ার কথা, দুই বাংলা জয় করা জয়া আহসানের কথা।

জয়ার চলচ্চিত্রের শুরুটা হয় ব্যাচেলর ছবিটি দিয়ে। ছবিতে অধিকাংশই ছিলেন নাটকের কলা-কুশলী, তবুও ছবিটি জনপ্রিয় হয়েছিল, নির্মাণ ও গল্পশৈলীর জন্য। জয়া সে ছবি দিয়ে পা রাখলেন চলচ্চিত্রে। প্রায় চৌদ্দ বছর, যদি কাগজ কলম নিয়ে হিসেব কষতে বসা হয়; জয়ার চলচ্চিত্রে আগমন চৌদ্দ বছর আগে।

সে সময়ের জয়ার সঙ্গে এ সময়ের জয়ার ব্যবধান অনেক, যোজন যোজন। চেহারায় খুব একটা পরিবর্তন হয়নি, বরং তার লাবণ্য দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার প্রেমে পড়ছে অনেকেই, বয়সটাকে এক পাশে সরিয়ে রাখুন মশাই। প্রেয়সীদের বয়স ঘুরপাক খায় মধ্য কুড়িতে, তারা তরুণী থেকে যায় নারী হয়ে ওঠেনা, জয়াই তো তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

পাঁচ বছর আগে ‘আবর্ত’ দিয়ে টালিগঞ্জে পা রাখা জয়া কি করে এত আপন হয়ে গেলেন তাদের? বাংলাদেশে আমরা তাকে বিবেচনা করেছি নাটকের মেয়ে দিয়ে, মাপা হয়নি তার প্রতিভার পুরুত্ব। কলকাতার অরিন্দম শীল ভুল করেননি, তিনি জয়ার জয় করার মানসিকতা আতশী কাঁচ দিয়ে দেখেছিলেন জহুরীর চোখে।

তাই তো জয়াকে দিয়ে কাজ করিয়েই ছাড়লেন তার ছবিতে। নতুন জয়াকে যেন পেলাম আমরা। গেরিলা দিয়ে নিজের জাত চেনানো জয়া এবার দেশের বাইরে নিজেকে চেনালেন। আবর্তের পর একটি বাঙালী ভূতের গল্প, ঈগলের চোখ, রাজকাহিনী, ভালোবাসার শহর, বিসর্জন দিয়ে জয়া জয় করে চলেছেন কলকাতাবাসীর মন।

জয়া পুরোদস্তুর বাঙালি মেয়ে। যে কিনা অভিনয়ের জন্য চরিত্রে মিশে যেতে পারে, ক্যামেরার সামনে নিজের চরিত্রে ধারন করে নতুন কোন মেয়েকে। কখনো সে বারবণিতা, কখনো সে অল্পবয়েসী বিধবা, কখনোবা শহুরে মেয়ে। তখন জয়া আর জয়া থাকেনা, সে হয়ে যায় অন্য কেউ। সেই অন্য কেউ সকলে হতে পারেনা। জয়া পারেন বলেই তিনি জয় করছেন নিত্য নতুন সংস্কৃতিপ্রেমীর মন। আপনি যখন জয়ার চলচ্চিত্র বা নাটক দেখতে বসবেন আপনার মনে হবে আপনি জয়াকে নয় সেই চরিত্রটিকে দেখছেন।

জয়া তার কাজের পুরস্কার পেয়েছেন, দেশে যেমন বিদেশেও তেমন। দেশে তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার। সম্প্রতি ভারতের অন্যতম দুটো চলচ্চিত্র পুরস্কার তার ঝুলিতে এসেছে, একটি হলো জি সিনে অ্যাওয়ার্ড (২০১৭) অন্যটি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড (২০১৭)। দুটোতেই তিনি সেরা অভিনেত্রীর মুকুট পরেছেন, যা প্রমাণ করে তিনি নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন।

জয়াকে অভিনয়ের গন্ডিতে বেঁধে রাখলে চলবে? তিনি ভক্ত, দর্শকদের কাছেও আসছেন নিজের কাজ, অকাজের (!) খবর নিয়ে। এ বছরের শুরুতে অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ খুললেন ভক্তদের জন্য। অল্প কদিনেই ভেরিফাইড হয়ে গেল তার পেজ। জয়া নিয়মিত আপডেট দিচ্ছেন নিজের ছবি দিয়ে, বিভিন্ন কমেন্ট দিয়ে।

আর কজন তারকা আছেন যারা এতকিছু ভাবছেন দর্শকের জন্য? জয়ার অফিসিয়াল ফেসবুক গ্রুপও হয়েছে ভক্তদের ভালোবাসায়, তাতেও জয়া আছেন। অর্থাৎ সোশাল মিডিয়ায় একটিভ হয়ে জয়া নিজেকে আরো উচ্চতায় নিয়ে গেলেন।

জয়া কি করছেন বর্তমানে? তিনি কাজ করছেন, কাজ। চুটিয়ে কাজ করছেন। এপার বাংলায় কিছু, ওপার বাংলায় কিছু। যখনই নারী প্রধান কোন ছবি ভাবা হয় সেখানে অবধারিতভাবে চলে আসে একজনের নাম, তিনি জয়া আহসান। এদিক দিয়ে তিনি ভাগ্যবতী, তাকে যেন তেন ছবির জন্য ভাবা হয়না। পরিচালকরা জানেন জয়া যে সে ছবির অভিনেত্রী নন, তার শ্রেণী আলাদা; তাকে নিতে হলে পরিচালককেও সে মানের কাজ করতে হবে। তবেই না জয়ার পরিচালক হওয়া যাবে।

জয়ার জয়রথ চলছে, চলুক আরো দীর্ঘদিন। বাংলা চলচ্চিত্রকে দেয়ার অনেককিছু রয়েছে তার, আমাদের তা আদায় করে নিতে হবে নিজস্ব মেধা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, জয়া না করবেন না। তিনি পর্দায় যেমন আছেন, পর্দার বাইরেও আছেন; কারো জন্য জয়া আহসান কারো জন্য জয়াদি কিংবা কারো জন্য জয়াপি হয়ে। কি জয়া, আছেন তো?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।