সাধারণ জন্ম, অসাধারণ কর্ম

আর দশটা সাধারণ পরিবারের মত সাধারণ এক ঘরে বেড়ে ওঠা বালক। হেসে খেলে বড় হচ্ছিল শৈশবে খুব সাধারনভাবেই, মধ্যবিত্ত পরিবারে যা হয আর কি। সবার মত করে বিদ্যালয় জীবনটা ও বেশ চলছিল।

কিন্তু হঠাৎই অশান্তি!

মা বিছানায় শয্যাশায়ী হন অসুখে। সংসারে নেমে আসে হতাশা আর কষ্টের ছায়া। তার কিছুদিন পর তাঁর বাবাও সাধারণ চাকরিটি হারিয়ে ফেলেন।

জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিশহ। ঘরে অসুস্থ মা, বেকার পিতা আর ভয়াবহ অর্থকষ্টে সে বালকটির আরও দারিদ্রে এবং সাধারণ হয়ে বেড়ে ওঠার কথা। কোনে এক কারখানার শ্রমিক হয়ে জীবন কাটানোর কথা, তিনি সবাইকে অবাক করে দিয়ে হয়ে ওঠেন সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কমেডিয়ানদের একজন। তিনি হলেন অভিনেতা জিম ক্যারি।

পুরো নাম- জেমস ইউজিন ক্যারি। জন্ম ১৯৬২ সালের ১৭ জানুয়ারি। কানাডিয়ান বংশদ্ভুত এই মার্কিন অভিনেতার জীবন শুরু হয়েছিল এমনি কষ্ট দুঃখ আর দুর্দশার মধ্য দিয়ে। এতটাই কষ্ট আর দুরাবস্থা যে টাকার অভাবে তিনি পড়ালেখা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

আর তখন তাঁর বয়স মাত্র চৌদ্দ যখন পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র ব্যক্তিতে পরিনত হন তিনি। মাত্র চৌদ্দ বছরের এ বালকের পক্ষে লোহার কারখানায় টানা আট ঘণ্টা কঠোর খাটুনি খেটে এসে পড়ায় মনোযোগী হওয়া ছিল অসম্ভব।

তাঁর বয়সী বালকরা যখন হেসে খেলে জীবন কাটাচ্ছে তখন তিনি জীবনের ঘাণি টানতে শুরু করে দিয়েছেন। তিনি তাই তখনই বুঝতে পেরেছিলেন যে জীবন পুষ্পশয্যা নয়। কিন্তু, এতটুকু ছিল স্বাভাবিক নিম্নবিত্ত পরিবারের গল্প যা আমরা ঢাকা শহরের বস্তিতেও হরহামেশা দেখতে পাই।

কিন্তু এ অতি সাধারণকে অসাধারণ করতে গিয়েই জাদুকর হলেন জিম ক্যারি নামের সে বালক। যিনি সাধারণ জীবনকে দুমরে মুচরে ভেঙে গড়ে আজকে আমাদের জিম হয়ে উঠেছেন।

আসলে আমরা প্রত্যেকে সাধারণ হয়েই জন্মাই। তারপর আমরা জীবনকে গড়ি। আমরা এমনই থাকবো নাকি আরো কিছু করবো – এই সিদ্ধান্তটা আমাদের। আর অসাধারন হওয়ার জাদুটা এখানেই।

ঠিক সেই জাদুকরী সিদ্ধান্তটা নিতে পেরেছিলেন জিম। এক বুক কষ্ট বুকেই চেপে মানুষ হাসানোর অভিনয়ে নেমে গিয়েছিল সেদিনের সেই ছোট্ট বালক। কিন্তু পাঠক, মানুষ হাসানোর কাজটা কিন্তু মোটেই সহজ নয়।

দ্য মাস্কে জিম ক্যারি

মানুষকে হাসতে বললেই মানুষ হাসবে কেন? জিমের মা যখন জানলেন জিম পড়াশোনা ছেড়ে নেমে গেছেন মানুষ হাসাতে তিনিও খুব বকলেন। অথচ সামনে তাঁর অডিশন। জীবনের প্রথম অডিশন। টিকে গেলে তিনি মাসে কিছু টাকা পাবেন কমেডি করে।

বাবা তখন তাঁর পিঠ চাপড়ে দিলেন, বললেন, ‘বাবা,  তুমি যেটা চাও না তাতে বিফলতার সম্ভবনা বেশি, বরং যেটা চাও সেটাই করো।’ আর সেই কথা গুলো তাকে আজকের জিম হতে অনুপ্রেরণা দেয়।

তিনি অডিশনে যান। প্রাণ দিয়ে অভিনয় করেন এবং খুব ভালভাবে বাদ পড়েন। কি অবাক হলেন?

না অবাক হবেন না!

এ বালক জিম। পুনরায় তিনি নিজেকে বোঝান। কারখানার কাজ বাদে প্র্যাকটিস করেন এবং আবার সময় এলে আবারও অডিশন দেন। প্রাণপণ দিয়ে এবারও অভিনয় করেন এবং ছোটখাটো কমেডিয়ান হন। এভাবে দিন চলছিল।

কিশোর জিম অভিনয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠেন একটু একটু করে। পনেরো বছর বয়সে হলিউডে যোগ দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখান থেকে বাদ পরেন। তার মন খারাপ হয়ে যায়। তবে অভিনয় তিনি ছাড়েন নি। ছোটপরিসরে চালিয়েছেন।

একদিন তিনি হলিউডের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন – ভেবো না জিম। তুমি অবশ্যই একদিন বিখ্যাত হবে। এবং দ্রুত পকেট থেকে চিরকুট বের করে টুকে রাখেন- তুমি একসময় এতটাই বিখ্যাত হবে যে প্রতি মুভিতে তোমাকে দশ মিলিয়ন করে দিবে।

আর এরপর তিনি পাগলের মত অভিনয়ের অনুশলীনটা চালিয়ে গেলেন। আর যেখানেই যেতেন সাথে রাখতেন দশ মিলিয়ন লেখা চিরকুরটি।

অবশেষে তিনি ১৯৯৪ সালে মুভি করতে প্রস্তাব পেলেন, মুভিতে তাকে দেয়া হয়েছিল – ‘দশ মিলিয়ন’। দি মাস্ক, লায়ার লায়র, এইস ভেঞ্চুরাসিরিজ, ডাম্ব এন্ড ডাম্বার এগুলো দিয়ে তিনি বিশ্বজয় শুরু করেন। আর সেই বালক হয়ে ওঠেন আজকের জিম ক্যারি। আশির দশকে বেশ কিছু ইংরেজি সিরিজে কাজ করে ফেলা জিম ক্যারি ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে উঠে যান খ্যাতির চূড়ায়।

জিম এই লম্বা দুর্দশাময় জীবনে দুটো কথা ভাবতেন। এক. বিনোদন তাই যা করে মানুষ আনন্দ পায় দুই. তোমার সামনে দুটো রাস্তা, এক ভয় নয় ভালবাসা।

কিশোর জিম ভয়কে জয় করতে শিখেছিলেন। জীবনকে ভালবাসতে পেরেছিলেন। আর ভালবাসলে খারাপকেও ভালর মত মেনে নেয়া যায়। তাই জিম জীবনের খারাপ সময়কে ভালবেসেছেন বলেই হয়তো ভয় না পেয়ে আজ আমাদের কাছে পৌছেছেন। হয়ে উঠেছেন বিশ্ববন্দিত জিম ক্যারি।

আর এভাবেই বিখ্যাতরা সাধারণ থেকে আমাদের চোখের সামনে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।