জার্নি বাই স্টার জলসা!

ঘুম ভেঙে আবিষ্কার করলাম আমি আমার বেডরুমে নাই। একটা বিয়ের মন্ডপে বসে আছি। চারিদিকে তুমুল হৈ-চৈ। আমার সামনে ক্যামেরা তাক করা। পাশে কনে বসে আছে।

স্ট্রেঞ্জ! হোয়াট দ্য হেল ইজ গোয়িং অন। আমি কোথায়। উলু বাজছে। সানাই বাজছে। চারিদিকে কিচির মিচির। হুংকার ছেড়ে বলে উঠলাম – ‘এ আমি কোথায় এলাম?’

ডান কানের পাশে এক ধুতি পরা লোক বললো – ‘তুমি এখন স্টার জলসার বিয়ের মন্ডপে আছো বাবা?’

– আরে বাবা, আমি নিজেই তো দেখছি আমি বিয়ের মন্ডপে। কিন্তু কি হচ্ছে এসব?

পাশ থেকে বেনারসি পরা কনেটা বলে উঠল – ‘আমরা এখন স্টার জলসায় আছি। একটু পর ই আমার আর তোমার বিয়ে হবে।’

মানে কি? আমি স্টার জলসায়। সিরিয়াসলি? কিভাবে? কেমনে?

কনেটা আবার ফিড়িক করে হেসে বলে উঠল – ‘আমি নায়িকা, তুমি নায়ক। হিহি। তোমার আরো অনেকবার বিয়ে হবে। হিহি। কিন্তু তারপরেও তুমি ভার্জিন থেকে যাবা। হিহি।’

মেয়েটার কথা সত্যি। আসলেই আমার বিয়ে হয়ে গেল। এর ফাঁকে একজন এসে জানাল, এইটাই আমার প্রথম বিয়ে৷ কিন্তু আরো অনেক বিয়ে হবে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম আপনি কে? লোকটা ফিড়িক করে হেসে বললো – ‘আমি স্টার জলসার ডিরেক্টর। হিহি!’

আজব কি হচ্ছে এসব?

বিয়ে হল। এস এস সি ফেইল অশিক্ষিত বউ গ্রামের মেয়েয়াতা আমার মাকে প্রণাম করতে গেলে আমার বড়লোক অহংকারি মা পা সরিয়ে নিল। গরীব, ছোটলোক বলে খোটা দিল। ঠিক তক্ষুণি আমার গরীব বউটা ক্যামেরা কে পেছনে করে আস্তে আস্তে হাটতে লাগল। আর কাঁদতে কাঁদতে মনে মনে প্রতীজ্ঞা করলো – ‘আমি একদিন এ বাড়ির যোগ্য বউ হয়ে উঠবই।’

এভাবে প্রায় বিশদিন আমরা আমাদের সিঁড়ির গোড়ার বড় রুমটাতে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার কাকা, কাকার বৌ, কাকার বৌ এর ছোট বোন, আমার পিষি, পিষি চাচাতো দেবর, চাচাতো দেবরের গার্লফ্রেন্ড, কাজের লোক, কাজের লোকের ক্রাশ ওরা সবাই আমাদের বিয়ে নিয়ে এখনো কথা বলে চলেছে। ক্যামেরার লেন্স আচমকা একজনের মুখে তাক করছে, তারপর প্রায় এক ঘন্টা ধরে রাখা হচ্ছে।

অবশেষে প্রায় একুশ দিনের মাথায় আমার কাকীমা অনেক কষ্ট করে কোনমতে আমাদের বাসর ঘরের ব্যবস্থা করে দেন। বাসরঘরে ঢুকি। সেখানে বাসর হওয়ার পরিবর্তে আমাদের মধ্যে আরো এক মাস হাবিজাবি কথাবার্তা হয়, তারপর আমি বালিশ নিয়ে নিচে ঘুমাতে যাই। আমার বউ উপরে ঘুমায়। আমি ভার্জিন থেকে যাই।

একত্রিশ দিনের মাথায় অন্য ঘর থেকে আমার বউ আমার রুমে ঢোকার সময় দুজনেই ধাক্কা খাই। কিছু একটা হবে হবে করেও হয়না। ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বাজে। আমার বউ আমাকে ছেড়ে পেছনের দিক চলে যায়, যেদিকে ক্যামেরা ধরা। মনে মনে কি যেব ভাবে। সবাই শুনে কেবল আমি শুনিনা। আমি তখনো ভার্জিন থেকে যাই।

আরো সাত মাস পরের ঘটনা, ঘরের কোথাও আমার মায়ের দাদুর ছোট বোনের ছোট খালার বড় আন্টির মেঝো চাচার ছোট মেয়ের একটা ন্যাকলেস খুজে পাওয়া যায়না। শেষমেশ খুজে পাওয়া যায় আমার গ্রাম্য, অশিক্ষিত বউ এর ঝুলিতে।

আমি ওকে ভুল বুঝি। আমাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলি।

অথচ এ কাজটা আমার বউ করে ই নি। যে মেয়ে বাসর ঘরে বর কে পেয়ে একা বিছানায় ঘুমাতে পারে। সে মেয়ে কিভাবে চুরি করবে? আসলে কাজটা করেছে আমার আব্বুর বিজনেস পার্টনার রিপোন্দার মেয়ে সানাই। ও আমার উপর ক্রাশ। আমাকে যে ও নিজের করে পেতে চাই, এইটা আমি অনেক আগ থেকেই জানি। কিন্তু আমার ওকে ভালো লাগেনা। আমার সব ফিলিংস তো মূলত আমার ঐ এস এস সি ফেইল বউটার জন্যে।

আমার বউ এর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে রিপোন্দার মেয়ে সানাই আমার আম্মুকে ছলে বলে কৌশলে কি সব হাবিজাবি দেখিয়ে পটিয়ে ফেলে। আমাকে জোর করে বিয়ে করে ফেলে। আমি কিচ্ছুটি বলিনা। বলতে গেলেই ডিরেক্টর বলে – ‘নো নো, তুমি নায়ক, নায়ক এখানে একদম নির্বাক! কথা বললে দ্বিতীয় বিয়ে কেমনে হবে?’

আমার দ্বিতীয়বার বিয়ে হয়।

আবার সবাই এসে দাঁড়ায় আমাদের সেই সিঁড়ির গোড়ার রুমটায়। সেখানে কেটে যায় আরো সাত মাস। সবাই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। ক্যামেরা ঠাস ঠাস মুখে গিয়ে পড়ে। করুণ, ভয়ংকর, আর্তনাদী ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজে।

এদিকে সানাই তার ক্রাশকে আই মিন আমাকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে নস্টালজিক হয়ে পড়ে। আড়ালে গিয়ে আমার গরীব বউকে মেসেঞ্জারে কল দিয়ে বলে ” তোকে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম না, আমার ক্রাশ শুধুই আমার। এটা শুনে আমার গরীব বউ কান্না করে। ছুটে যায় তার তারা মা কিংবা কালী মার কাছে। চরণ তলে লুটিয়ে পড়ে। হামাগুড়ি, গড়াগড়ি খেয়ে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে বলে ” তারা মা, আমার বরকে তুমি দেখে রেখো। সুখে রেখো। কিন্তু তার প্রার্থনা কাজে লাগেনা। কারণ তখনো আমি তখনো ভার্জিন থেকে যাই৷ সানাই এর সাথেও আমার কিছু একটা হবে হবে করেও আর হয়না। ধাক্কা খাই। স্যাড রোমান্টিক গান বাজে। ঐ ঐটুকুন। আর হবেই বা কিভাবে সানাই গোটা শরীরে কমপক্ষে এক মণ স্বর্ণ, আর দশ কেজি ভরের কাতান /জামদানি পরে সবকিছু লুকিয়ে রাতে ঘুমুতে আসে।

এক দিন আমাদের ঘরে চুটকিটা একটা ফ্রড জাস্ট ফ্রেন্ডের সাথে সাথে রিলেশন করে পালিয়ে যায়। এটা আমরা কেউ জানিনা। কিন্তু আমার গরীব বউটা রাস্তায় হেটে যাওয়ার সময় দেখে ফেলে। সে ছলেবলে কৌশলে ঐ ফ্রড ছেলেটার কাছ থেকে আমাদের চুটকিকে বাঁচিয়ে ঘরে ঢুকে।

আমার ঘরের সম্মান বাঁচিয়ে আবার আমার মন জয় করে নেয় শ্যামা আই মিন আমার ফার্স্ট বউ। আবার আমার মন ঝুকে যায় তার কাছে। আবার আমি তার কাছে যাই। আবার ধাক্কা খাই। স্যাড রোমান্টিক গান বাজে। তারপরেও আমাদের মধ্যে কিছু হয়না। আমি তখনো আমি ভার্জিন থেকে যাই।

এসব দেখে সানাই এর গা জ্বলে যায়। ল্যাব থেকে একটা ভুয়া রিপোর্ট এনে সবাইকে তাক লাগিয়ে। সবার সামনে এসে আমাকে দেখিয়ে বলে – ‘আমি প্রেগনেন্ট’। আমি পুরা লুল হয়ে তাকিয়ে থাকি সানাইয়ের দিকে৷ ছুলাম না ধরলাম না, তবু ওর পেটে আমার বাচ্চা৷ কেমনে কি ম্যান?

আবার সেই সিঁড়ির গোড়ার রুমে। আমি, আমার বাবা, আমার মা, আমার অশিক্ষিত বউ, সানাই, কাকা, কাকার বউ, কাকার বউ এর ছোট ভাই, তার ফ্রেন্ড, তার ফ্রেন্ডের ক্রাশ, নামকরা বিখ্যাত শিল্পী, মেডিকেল কলেজের প্রফেসর, কাজের বুয়া, কাযের বুয়ার দ্বিতীয় স্বামী সবাই রাউন্ড হয়ে স্ট্যাচু অব লিবার্টির মত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।

সাত বছর পর প্রমাণ হয় সানাই মিথ্যা বলেছিল। আমার গরীব অশিক্ষিত এস এস সি ফেইল বউ ডাক্তারদের সাথে লবিং করে সন্দেহাতীত ভাবে বিভিন্ন থিওরি এপ্লায় করে সানাই এর করা এহেন বাজে নোংরা অভিশাপ থেকে আমাকে মুক্তি দেয়। আমি আবার তার প্রেমে পড়ে যায়।

গান বাজে। ধাক্কা খাই। কাছে আসি। তারপরেও আমি ভার্জিন থেকে যাই৷

আরো কয়েক বছর পর হঠাত করে আমার বাবার ব্যবসা নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের অভাব দেখা দেয়। আমাদের হঠাত করে ভাত খাওয়ার চাল পর্যন্ত ঘরে ফুরিয়ে যায়। আমার মা সন্ধ্যায় একটা অন্যায় আবদার নিয়ে আমার ঘরে আসে। তিনি তার জাস্ট ফ্রেন্ড সুনীদ বাবুর মেয়ে জেসিয়াকে বিয়ে করতে বলে। তার নাকি আগে আরো পঁচিশটা বিয়ে হয়েছে। তবুও নাকি সে আমার উপর ক্রাশ৷ আমি প্রথমে রাজী হইনা। কিন্তু আমার গরীব বউটা আমাকে বুঝায়। যেহেতু আমি ওকে রিয়েল লাভ করি, তাই ওর কথা ফেলতে পারিনা। তাই বিয়ে করতে রাজী হয়ে যাই। জেসিয়ার সাথে আমি ডেইটে যাই। জেসিয়া জানায় আমি ওকে বিয়ে করলে আমাদের সব সম্পত্তি আবার ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করবে। এ কথা শুনে আমি জেসিয়ার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ি।

তৃতীয় বিয়ে হয়। জেসিয়ার সাথে ধাক্কা খাই। কিন্তু তারপরেও আমি ভার্জিন থেকে যাই।

নিজের ভার্জিনিটির যন্ত্রণায় একসময় আমার ভেতর রাগ ক্ষোভ জমে উঠে। আমি উন্মাদ হয়ে বের হয়ে পড়ি ঘর থেকে। জোরে গাড়ি চালাই। এক্সিডেন্ট করি।

হারিয়ে যাই পাহাড়ের পাদদেশে। সেখান থেকে রক্ষা করে আমাকে আরেক মেয়ে। সব স্মৃতিশক্তি হারিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যে আমি তাকেও বিয়ে করি।

অথচ তখনো আমি…!

তারপর আবার এক্সিডেন্ট। কিভাবে যেন আমার পরিবার আমাকে খুজে পায়। ফর দ্যা ফার্স্ট টাইম ওরা সবাই সেই বিখ্যাত সিঁড়ির গোড়ার রুমটা ছেড়ে হাসপাতালের ওটির ওয়েটিং রুমে এসে ভীড় জমায়। সেখানে আরো সাত মাস।

ডাক্তার আমার ফ্যামিলিকে জানিয়ে দেয় – ‘আমি আর বেঁচে নেই।’ সবাই আশা ছেড়ে দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে।

ঠিক তক্ষুণি। ঠিক তক্ষুণি এন্ট্রি নেয় আমার সেই গরীব অশিক্ষিতা বউ। সে এসে ডাক্তারের কাছে সব কথা শোনার পর ইন্টারের মেয়েদের মতন জেদ করে বসে। শাড়ির আচলে কান্না মুছতে মুছতে সে বলে উঠে আমার প্রাণোনাদ মরতে পারেনা। তিনি মরে নি।

এটা বলেই সে গান গাওয়া আরম্ভ করে।

গানের প্রথম কলি শেষ হতে না হতে আমি মরা লাশ থেকে বেঁচে উঠি।

বেঁচে উঠেই স্মৃতিশক্তি ফিরেই আমি ফ্যাল ফ্যাল করে সবার দিকে তাকায়। আমার মা আমার কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে – ‘ওরে আমাদের বউ মা টা অসাধ্য সাধন করেছে রে!’

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করি – ‘আমার তো অনেক গুলো বিয়ে হয়েছে। তাদের মধ্যে কোন বৌ, মা?’

আমার মা বলে – ‘ওরে হতভাগা। তোর আসল বৌ।’

ডাক্তার বলে – ‘আপনার আসল বউ অসাধ্য সাধন করেছে।’

– কি করেছে?

– আরে আপনি একটু আগে মরে গিয়েছিলেন।

– হ্যা তো?

– তো আপনার বৌ আপনাকে জাস্ট একটা হিন্দী গান গেয়ে ভালো করে ফেলেছেন।

– কোন হিন্দি গান?

– আগার তুম সাথ হো…

ডাক্তারের এ কথা শুনে আমার ইচ্ছে করল মাথাটা জাস্ট দেয়ালের সাথে ঠুকে আবার মরে যায়। কেমনে কি বাল? একটা মরা মানুষরে জাস্ট একটা হিন্দী গান শোনায় জ্যান্ত করে ফেলল?

না আর বসে থাকলে চলবেনা। আমার এক্ষুণি উঠে দাঁড়াতে হবে। খুজে বের করতে হবে ওভাররেটেড গাঁজা সাপ্লাইকারিদের।

যে ভাবা সে কাজ। আমি স্টার জলসার আসর ছেড়ে জোরে দিলাম দৌড়।

পেছন থেকে শ্যামা চিৎকার করে বললো – ‘কই যান প্রাণনাথ! আমি প্রেগনেন্ট।’

আমি একবার দাঁড়িয়ে বললাম – ‘প্রেগনেন্ট কি তোরা বাতাসের ফুঁতে হস রে বান্দর, এতগুলা বিয়ে হইলো একটা বিয়েতে আমার কোন মাইয়ার লগে হত ধরাধরিটা অবধি হইলোনা আর তোরা আইসা কস আমি প্রেগ্নেন্ট। ফাত্ত্রামি?’

স্টার জলসার হাসপাতালের স্টুডিও ছেড়ে আমি দৌড়াচ্ছি। দৌড়াচ্ছি। আর দৌড়াচ্ছি।

আমার পেছন পেছন কয়েকটা লোক ও দৌড়াচ্ছে। আর আমাকে পেছন থেকে ডাকছে। একসময় ওরা আমাকে দৌড়ে ধরে ফেলল। আমি হাপাতে হাপাতে বললাম – আপনারা কে?

ওরা হাঁপাতে হাঁপাতে জবাব দিল – ‘আমরা জি বাংলা। নতুন ছন্দে লিখব জীবন’

– তো আমার কাছে কি?

– আমরা একটা সিরিয়াল করব।

– কেমন সিরিয়াল।

– এই ধরেন ঘরোয়া সিরিয়াল। আপনার অনেকবার বিয়ে হবে। একটা সিঁড়ির গোড়ার ঘর থাকবে। আপনাদের ফ্যামিলি ক্রাইসিস হবে৷

এরপর আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম। আমার আর কিছু মনে নেই।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।