জোসেফ গোয়েবলস: বিশ্বযুদ্ধের এক ধুরন্ধর খলনায়ক

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ছোটখাট গড়নের মানুষটি সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল! ১৮৯৭ সালের ২৯ অক্টোবর, জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করেন প্যল জোসেফ গোয়েবলস নামের এক শিশু। তাঁকে দেখে মুচকি হেসে নিয়তি বলেছিল – পৃথিবীকে শাসন করবে এই শিশু, তাও মিথ্যা দিয়ে!

গোয়েবলস ছোটবেলা থেকেই দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। তাঁর ডান পা ছিল বাম পা অপেক্ষা মোটা এবং ছোট। রোমান ক্যাথলিক পিতামাতার ইচ্ছা ছিল তিনি চার্চের যাজক হবেন। কিন্তু ধীরে ধীরে গোয়েবলস চার্চ থেকে দূরে সরে যান।

তবে পড়াশোনায় বরাবরই তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯২১ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। এজন্য তাকে ‘দ্য লিটল ডক্টর’ নামে ডাকা হতো!

‘দ্য লিটল ডক্টর’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তি প্রোপাগান্ডা শব্দটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতায়। এখনো পৃথিবীজুড়ে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যাপক জনপ্রিয় গোয়েবলসীয় কায়দা’। ঠিক কি করেছিলেন তিনি? চলুন জেনে নেই।

১৯২৬ সালে গোয়েবলস নাৎসি পার্টিতে যোগদান করেন। ক্রমশ তিনি অ্যাডলফ হিটলারের একজন বিশ্বস্ত সহযোগিতে পরিণত হন। তিনি তার বিশ্বাস এবং চিন্তা-চেতনা লেখনীর মাধ্যমে শক্তিশালীভাবে সকলের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম ছিলেন। আর এই গুণটি সবচেয়ে মুগ্ধ করেছিল হিটলারকে। হিটলার এবং গোয়েবলস, দু’জনেই বিশ্বাস করতেন, শব্দ এবং ছবি যেকোনো আদর্শ প্রচারের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।

আর সে কারণেই, গোয়েবলস প্রোপাগান্ডাকে বেছে নেন তার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, শুধুমাত্র হিটলারের মেধাবী এবং অতুলনীয় নেতৃত্বের মাধ্যমেই জার্মানির হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাওয়া সম্ভব।

আর তাই, হিটলারকে কেন্দ্র করেই তিনি নাৎসি পার্টিকে জার্মানির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে আবির্ভুত করার চেষ্টা শুরু করেন। গোয়েবলস তাঁর প্রখর লেখনীর মাধ্যমে দলের পক্ষে প্রোপাগান্ডা শুরু করেন যেখানে তিনি হিটলারকে তুলে ধরেন নতুন দিনের জার্মানির ত্রাণকর্তা হিসেবে। পাশাপাশি, তিনি আয়োজন করতে থাকেন বিশাল বিশাল সমাবেশ।

এসব সমাবেশে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য গোয়েবলস নেন ভিন্নধর্মী কিছু উদ্যোগ। প্রায় প্রতিটি সমাবেশ শুরু হতো প্যারেড এবং জার্মান জাতীয়তাবাদী সংগীতের মাধ্যমে। থাকত ব্যাপক আলোকসজ্জা, আতশবাজি এবং রঙিন পোস্টার। এসব পোস্টার লেখা হতো বড় বড় অক্ষরে এবং দৃষ্টিকটু রং দিয়ে।

প্রতিটি সমাবেশের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে ক্যামেরা এবং মাইক্রোফোন স্থাপন করা হতো যাতে হিটলার কিংবা তার ভাষণ প্রতিটি জার্মানের কাছে পৌছে যায়। এসবের ফলে, ধীরে ধীরে জার্মানরা বিশ্বাস করতে শুরু করে, একমাত্র হিটলার তথা নাৎসি পার্টিকে সমর্থনের মাধ্যমেই জার্মানি সারাবিশ্বে আবারো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে।

ফলাফলস্বরূপ এক দশকের মধ্যেই নাৎসি পার্টি জার্মানির শীর্ষস্থানীয় দলে পরিণত হয়। ১৯৩৩ সালে পার্টির দলনেতা এডলফ হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর নির্বাচিত হন। ক্ষমতা গ্রহণ করার পর হিটলার বুঝতে পারেন, সমগ্র জার্মানিতে তাঁর দলের একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য প্রয়োজন তার আদর্শকে অতিরঞ্জিত করে জার্মানদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।

আর তাই তিনি গঠন করলেন ‘মিনিস্ট্রি অব এন্টারটেইনমেন্ট অ্যান্ড প্রোপাগান্ডা’। এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেলেন গোয়েবলস। এর মধ্য দিয়ে গণমাধ্যম খাতকে পুরোপুরি কব্জা করে নিলেন ধুরন্ধর এই ব্যক্তি। বিরোধীদলের পক্ষে বা নিরপেক্ষ কথা বলে, এমন পত্রিকাগুলো বন্ধ করা হলো শুরুতে, তাদের প্রচার-প্রকাশনাও সরকারী নজরদারীর আওতায় চলে এলো।

তারপর বেছে নিলেন রেডিওকে! সরকারের একটি রেডিও কেনার জন্য সবাইকে বাধ্য করলেন তিনি। আইন করে বিদেশী চ্যানেল শোনা নিষিদ্ধ করলেন! সরকারের একটি চ্যানেল শুধু শোনা যেত, যেখানে বলা হতো জার্মানরাই পৃথিবীর শ্রেষ্ট জাতি, অ্যাডলফ হিটলার পৃথিবীর অবিসংবাদিত নেতা!

জার্মানির রেডিও তাই বলে, যা গোয়েবলসের মুখে উচ্চারিত হয়, খবরের কাগজগুলো তাই ছাপায়, গোয়েবলসের অফিস থেকে যুদ্ধের যেসব খবর সরবরাহ করা হয়। বলাই বাহুল্য যে, এদের শতকরা ৯৯ ভাগই ছিল মনগড়া।

এমন সব খবর প্রচার করতো- জার্মান সৈন্যরা রোমানিয়া আক্রমণ করেছে, কাল ডেনমার্ক দখল করেছে, পরশু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে বোমাবর্ষণ করেছে জার্মান বোমারু বিমান- এ ধরনের ভিত্তিহীন খবর শুনে মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা তো বটেই, পিলে চমকে উঠতো খোদ জার্মান সেনাদেরও! নিজেদের বাহিনীর এমন সক্ষমতার কথা তো তারাও জানতেন না!

গোয়েবলসের থিওরিই ছিল তেমনই – ‘একটা মিথ্যাকে  ১০০ বার বলো, সেটা সত্যির মতো শোনাবে।’ এই কাজে হিটলার-গোয়েবলস জুটি বেশ সফলও হয়েছিলেন শুরুতে, অনেক জার্মান নাগরিকই এটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, ইহুদিরা হচ্ছে এই পৃথিবীর জন্যে জঞ্জালস্বরূপ, তাদের খুন করায় কোন পাপ নেই। আর একমাত্র জার্মানদেরই অধিকার আছে পৃথিবীকে শাসন করার, দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতি তারাই।

গোয়েবলসের পরিনতি না বলে শেষ করলে মনে হয় লেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, মিত্রবাহিনীর হাতে জার্মানীর পতন যখন সময়ের ব্যাপার মাত্র, হিটলার অবরুদ্ধ অবস্থায় বাঙ্কারে সদ্য বিবাহিত স্ত্রী ইভা ব্রাউনকে নিয়ে আত্মহত্যা করেন ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল!

 

আত্মহত্যা করার আগে গোয়েবলসের হাতে ক্ষমতা অর্পন করেছিলেন ফুয়েরার! নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন না, এই ফুয়েরার টা আবার কে! জার্মানীর লোকজন হিটলারকে আদর করে ফুয়েরার বলে ডাকতো।

তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন পিছু হটে আবার আক্রমন করার। গোয়েবলস দায়িত্ব পেয়ে বলেছিলেন, ফুয়েরারের নির্দেশ তার জীবদ্দশায় আমি কখনো অমান্য করিনি, কিন্তু আজ করছি, যা হবার হবে, আমরা পিছু হটবো না।

একটা সময় তিনিও সপরিবারে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। হিটলার আর ইভা ব্রাউনের মৃতদেহ আগুনে পুড়িয়ে দিলেন গোয়েবলস ও সহকর্মীরা, তারপর নিজেদের পালা।

ছয় সন্তানের মধ্যে পঞ্চম ছিলেন কন্যা ক্যাথরিন, এক মে ছিল তাঁর জন্মদিন। মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে একজন ডাক্তারের উপস্থিতিতে একে একে সবার দেহে মরফিন প্রয়োগ করলেন গোয়েবলস!

একে একে সবাই ঢলে পড়লো মৃত্যুর কোলে। স্ত্রী ম্যাগদাকে গুলি করে পিস্তল ঠেকালেন নিজের মাথায়। তার কয়েক মূহুর্ত পরেই অবসান ঘটলো ঘটনাবহুল একটি নিকৃষ্টতম জীবনের, নাৎসী সরকারের সবচেয়ে কুখ্যাত মন্ত্রীর!

কি অবিশ্বাস্য, গোয়েবলস বলে গিয়েছিলেন,  ‘আমরা ইতিহাসে ঠাই পাবো হয় সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্র অধিনায়ক অথবা সর্বশ্রেষ্ঠ অপরাধী হিসেবে।’ একেবারে মিলে হুবহু মিলে গেল তাঁর বক্তব্যটুকু!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।