জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির দুর্গা পূজা: ইতিহাসের সন্ধানে

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। ছয় নম্বর দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের বাড়িতে ঢুকেই সামনে পড়বে বড়ো একটা উঠোন আর সেই উঠোনের উত্তরপ্রান্তে বিরাট এক পাঁচ খিলানের ঠাকুরদালান। বাংলার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অবদান নিয়ে বাঙালি মননে কোনও সন্দেহ না থাকলেও ধর্ম বিশ্বাসে অপৌত্তলিক ব্রাহ্ম ঠাকুর পরিবারের ভদ্রাসন সংলগ্ন দুর্গাদালান দেখে অনেকের মনেই হয়ত বিস্ময় জাগে, হয়তবা জাগে প্রশ্নও! সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে যেতে হবে কয়েকশো বছর পিছনে।

সপ্তদশ শতকের শেষ দিককার কথা৷ দিল্লির সিংহাসনে তখন মোঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব৷ ব্যবসা বাণিজ্যের টানে পশ্চিম, দক্ষিণ ভারত ঘুরে বিদেশি বণিকেরা তখন পূর্বমুখী৷ পর্তুগিজ, আর্মেনিয়ান, ফরাসি, দিনেমার, ওলন্দাজদের ছাড়িয়ে ব্রিটিশ বণিকরা বেশ জোর কদমেই ভারতে বাণিজ্য করতে আরম্ভ করেছে৷ ওই সময়ে মোঘল সম্রাটের আমন্ত্রণে বাংলায় আবার বানিজ্যতরী নিয়ে এলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাশিমবাজার কুঠির প্রধান জোব চার্নক৷

তিনি এসে কুঠি গড়লেন সুতানুটিতে৷ ওই গ্রামের নিকটবর্তী গোবিন্দপুর গ্রামটা ছিল নদীর একটা বাঁকের ধারে৷ নদীর গভীরতা ও বিস্তৃতিও সেখানে অনেকটা বেশি৷ বড়ো বড়ো বাণিজ্যতরী ওখানে নোঙর করত মালপত্র খালাস করতে, খাবারদাবার নিতে৷ জীবিকার টানে বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষজন সেখানে আসতে আরম্ভ করেছিল৷ সেই কারণে ওই গোবিন্দপুর গ্রাম ঘিরে একটা জনপদ গড়ে উঠেছিল৷ তেমন ভাবেই সেখানে একদিন এসে হাজির হলেন শুকদেব ও পঞ্চানন নামে দুই ব্রাহ্মণ সন্তান৷ সাকিন যশোরের বারোপাড়া গ্রাম৷ সম্পর্কে তাঁরা কাকা – ভাইপো হলেও সমবয়সী৷

জনপদ হলেও গোবিন্দপুরের অধিবাসীদের বেশিরভাগই ছিল জেলে, কৈবর্ত, মালো প্রভৃতি মত্স্য ব্যবসায়ী এবং কিছু নিম্নবর্ণের বণিক গোষ্ঠীর মানুষজন৷ হঠাৎই উপবীতধারী শালগ্রাম শিলা -সহ দু’জন ব্রাহ্মণকে পেয়ে তারা বেশ খুশিই হল৷ বর্ণে ব্রাহ্মণ তাই ‘ঠাকুর বলে সম্বোধন করে সসন্মানে দুই বামুনকে তারা সেখানে থাকবার ব্যবস্থা করে দিল৷’ তারা নিম্নবর্ণের মানুষ তাই শুকদেব -পঞ্চাননের পরিচয় কী ? কোথা থেকে তাঁরা আসছেন, কেনই বা আসছেন – সে সব জানার কৌতূহলও দেখাল না৷ দেখালে হয়তো ইতিহাসটা হত অন্য রকম!

পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যশোরের চেঙ্গুটিয়া পরগনার জমিদার ছিলেন গুড়-বংশীয় দক্ষিণনাথ রায়চৌধুরী৷ তাঁর চার পুত্র কামদেব, জয়দেব, রতিদেব ও শুকদেবের মধ্যে প্রথম দু’জন মামুদ তাহির বা পির আলি নামে এক ধমোর্ন্মাদ স্থানীয় শাসকের প্রভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য হওয়ায় অন্য দুই ভাই ব্রাহ্মণ সমাজে পতিত বলে গণ্য হন৷

তৎকালীন সামাজিক রীতি অনুসারে, তাদের বলা হত পির আলি বা ‘পিরালি’ ব্রাহ্মণ৷ সমাজে পতিত হওয়ার অর্থ হল, অন্যান্য ব্রাহ্মণ পরিবারের সঙ্গে তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্ক তো হবেই না, তদুপরি যজমানি বা পণ্ডিতি করার মতো পেশাও গ্রহণ করা যাবে না৷ রতিদেব ও শুকদেব চলে এলেন দক্ষিণডিহি অঞ্চলে৷ শিক্ষিত ও বিত্তশালী হওয়ায় তাঁদের খাওয়াপরার অভাব ঘটল না বটে কিন্তু বৈবাহিক সম্পর্ক তৈরি করা এক রকম অসম্ভব দেখে তাঁরা ছল চাতুরীর আশ্রয় গ্রহণ করলেন৷ নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাঁরা সন্তানদের বিয়ে দিতেন৷

শুকদেব তেমন ভাবেই চাতুরী করে যশোরের পীঠাভোগের জমিদারপুত্র জগন্নাথ কুশারীর সঙ্গে বিয়ে দিলেন নিজের কন্যার৷ এক বর্ষার রাতে নদীযোগে স্থানান্তরে গমনের সময়ে জগন্নাথ আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন শুকদেবের গৃহে৷ একে রাঢ়ী শ্রেণির ব্রাহ্মণ, তার ওপর অভিজাত জমিদার বংশীয়। শুকদেব জগন্নাথকে হাতছাড়া করতে চাইলেন না৷

বিপন্ন জগন্নাথকে নিজের বাড়ি নিয়ে গিয়ে রাজকীয় ভাবে আপ্যায়িত করলেন এবং তার তদারকিতে রাখলেন নিজের কন্যাকে৷ আপ্যায়ণে মুগ্ধ জগন্নাথ আতিথ্য দেবার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাতে গেলে শুকদেব তাঁর মেয়ের সঙ্গে জগন্নাথের বিয়ের প্রস্তাব দিলেন৷ শুকদেব পিরালিভুক্ত পতিত ব্রাহ্মণ জেনেও তাঁর পরমা সুন্দরী কন্যার পাণিগ্রহণের লোভ সম্বরণ করতে পারলেন না জগন্নাথ৷ বিনা আড়ম্বরেই রাঢ়ী কুলীন ব্রাহ্মণপুত্র জগন্নাথের সঙ্গে পতিত পিরালি ব্রাহ্মণকন্যার বিয়ে হল, প্রায় রাতারাতিই৷ খবর গেল কুশারী পরিবারে৷

যে বজরা নিয়ে জগন্নাথ দক্ষিণডিহিতে এসেছিলেন, তাতে করে সস্ত্রীক পিঠাভোগে ফিরলেন বটে কিন্ত্ত পরিবারে স্থান হল না৷ সমাজপতিদের রোষের ভয়ে পরিবারে আশ্রয় না পেয়ে আবার তিনি শ্বশুরের কাছেই ফিরলেন৷ এমনটা যে হবে সেটা শুকদেব আগেই অনুমান করেছিলেন তাই জগন্নাথকে তিনি ঘরজামাই না করে পার্শ্ববর্তী বারোপাড়া গ্রামে বসতি করে দিলেন৷ ওই জগন্নাথ থেকেই আরম্ভ হল পিরালি থাকের কুশারীদের নতুন জীবন৷

প্রায় আড়াইশো বছর সেখানে কাটিয়ে জগন্নাথের পঞ্চম উত্তরপুরুষ শুকদেব এবং তাঁর বড়োদাদা মহেশের পুত্র পঞ্চানন ভাগ্যান্বেষণে যশোরের বারোপাড়া গ্রাম থেকে এলেন গোবিন্দপুরে৷ তাঁরা পড়াশোনা জানতেন৷ সে যুগের প্রয়োজন অনুসারে অল্পস্বল্প ফারসি তো জানতেনই সঙ্গে স্থানীয় ইংরেজ বণিকদের সংস্পর্শে এসে কাজ চালানো গোছের ইংরেজিটাও শিখে নিলেন৷ কাকা -ভাইপো মিলে এ বার আরম্ভ করলেন বণিকদের জাহাজে পণ্য, খাবারদাবার সরবরাহের কাজ৷ অল্প দিনেই সাফল্য৷ গোবিন্দপুরে জমিজমা কিনে বাড়ি করলেন কাকা-ভাইপোয়৷

প্রতিবেশীদের দেওয়া ‘ঠাকুর’ উপাধি সাহেবদের উচ্চারণে গিয়ে দাঁড়াল ‘টেগোর ’ বা ‘ট্যাগোর ’-এ৷ যশোরের বারোপাড়ার পতিত জগন্নাথ কুশারীর বংশের শাখা গোবিন্দপুরে এসে হয়ে উঠল ঠাকুর বংশে৷ কাকা শুকদেবের উত্তরপুরুষরাই পরবর্তীকালে উত্তর কলকাতার চোরবাগান ঠাকুর বংশ৷ ভাইপো পঞ্চানন থেকে আরম্ভ হল পাথুরিয়াঘাটা, আর জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবার৷

শুকদেবের একমাত্র পুত্র কৃষ্ণচন্দ্র কিছুকাল বাবা -দাদাদের সঙ্গে ব্যবসা করে আলাদা হয়ে গেলেন৷ বৈষ্ণব পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি ছিলেন শাক্ত অনুরাগী৷ পরিবারের অন্যেরা যখন অন্যত্র বাসস্থান করার কথা ভাবছেন কৃষ্ণচন্দ্র তখন মধ্য কলকাতার চোরবাগান অঞ্চলে শঙ্কর ঘোষ স্থাপিত ঠনঠনিয়া কালী মন্দিরের কাছে বড়ো বাড়ি তৈরি করে সপরিবারে উঠে এলেন৷ তৈরি হল কুশারী -ঠাকুরদের চোরবাগান শাখা৷

পঞ্চাননের দুই পুত্র জয়রাম ও সন্তোষরাম প্রথমে কোম্পানির অধীনে ছোটো চাকরিতে ঢোকেন , তার পর কলকাতার প্রথম কালেক্টর র‌্যালফ শেলডন শহরের জমি জরিপের কাজ আরম্ভ করলে দুই ভাই আমিনের কাজ পেলেন৷ চাকরি ও আমিনী করে দুই ভাই প্রভূত সম্পত্তি উপার্জন করেন৷ পরিবার বড়ো হওয়াতে জ্যেষ্ঠ জয়রাম ধনসায়ের বা আজকের ধর্মতলা এলাকায় আলাদা ভদ্রাসন তৈরি করে উঠে গেলেন৷

কনিষ্ঠ সন্তোষরাম নিকটবর্তী তালতলায় বাড়ি করে উঠে গেলেন৷ সন্তোষরামের তিন পুত্র রামহরি, ব্রজরাম ও রামরাম তেমন কোনও উন্নতি করতে পারেননি৷ কলকাতার জনারণ্যে তাঁরা চিরকালের মতো হারিয়ে গেছেন৷ অন্য দিকে জয়রামের চার পুত্র আনন্দীরাম, নীলমণিরাম, মুকুন্দরাম ও গোবিন্দরাম৷ গোবিন্দরাম চার ভাইয়ের মধ্যে মেধাবী হলেও উত্শৃঙ্খল প্রকৃতির আনন্দীরাম জয়রামের আগেই প্রয়াত হন৷

পলাশির যুদ্ধের পর ইংরেজরা গোবিন্দপুরে নতুন কেল্লা তৈরির জন্য সেখানকার বাসিন্দাদের অন্যত্র জমি দেয়৷ এ দিকে তার আগের বছরে সিরাজের কলকাতা আক্রমণের ফলে জয়রামের ধর্মতলার বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷ সব ক্ষতিপূরণ মিলিয়ে যা পেলেন তাই দিয়ে জয়রামের পুত্র নীলমণিরাম বা নীলমণি ঠাকুর উত্তর কলকাতার পাথুরিয়াঘাটা অঞ্চলে জমি নিয়ে বাড়ি করে সপরিবারে উঠে এলেন৷ প্রতিষ্ঠা হল পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুর বংশের৷

নীলমণি বাড়ি করলেও আবার তিনি ওডিশায় চলে যান চাকরি করতে৷ বাড়ি, পরিবার রইল পরের ভাই দর্পনারায়ণ ও গোবিন্দরাম ঠাকুরের জিম্মায়৷ দর্পনারায়ণের পুত্ররা ও তাঁদের পরিবারবর্গ পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর বংশ নামে পরিচিত৷ এই বংশে অনেক কৃতবিদ্য মানুষ জন্মেছেন, তাঁদের মধ্যে গোপীমোহন ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রমানাথ ঠাকুর প্রমুখ উল্লেখযোগ্য৷ টেগোর ক্যাসল , টেগোর প্যালেস, মরকত কুঞ্জ প্রভৃতি ভবন পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুরবাড়ির বিভিন্ন সদস্য নির্মাণ করেন৷

এর বেশ কিছুকাল পরে, সম্পত্তি নিয়ে নীলমণি ও দর্পনারায়ণ ঠাকুরের বিরোধ হলে, নীলমণি এক বস্ত্রে স্ত্রীপুত্র ও গৃহদেবতা লক্ষ্মীজনার্দন নিয়ে পাথুরিয়াঘাটার বাড়ি ত্যাগ করে পথে এসে দাঁড়ালে বৈষ্ণবচরণ শেঠের দেওয়া মেছুয়াবাজারের জমিতে কুঁড়েঘর তৈরি করে বসবাস আরম্ভ করলেন৷ পরে পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ পেয়ে ১৭৮৪ সালে নতুন বাড়ি করলেন৷ সেই বাড়িই আজ জোঁড়াসাকো ঠাকুরবাড়ির রামভবন৷ পরে এই পরিবারের দ্বারকানাথ ঠাকুর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ ব্যক্তিরা আরও কয়েকটি বাড়ি করেন সেখানে৷ পতিত হিসেবে চিহ্নিত ব্রাহ্মণ বংশ কালক্রমে বাংলার ব্যবসা – বাণিজ্য থেকে শিক্ষা – সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিবার৷

পলাশির যুদ্ধের পর থেকে কলকাতা শহরের প্রকৃত নগরায়ণ আরম্ভ হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে বাংলার শাসন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় সমগ্র পূর্ব ভারতের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে ওঠে কলকাতা। ইংরেজদের সঙ্গে বাণিজ্য করে বা তাদের ব্যবসা-সহায়ক হয়ে এক শ্রেণির মানুষের হাতে জমে উঠতে থাকে প্রভূত ধনসম্পত্তি। দুর্গা পূজা ক্রমশ হয়ে ওঠে বিত্তবান শ্রেণির বৈভব প্রদর্শনের অন্যতম মাধ্যম। কলকাতায় যত বাড়তে থাকে ধনীর সংখ্যা, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুর্গা পূজার সংখ্যাও।

সেই সময়ে এবং পরবর্তী কালে কলকাতার যে সমস্ত বাড়িতে দুর্গাপুজা আরম্ভ হয় তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল চক্রবেড়িয়া রোডের মিত্রবাড়ি (১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ), দর্জিপাড়ার জয়রাম মিত্র স্ট্রিটের দাঁবাড়ি (১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ), পাথুরিয়াঘাটার রমানাথ ঘোষের বাড়ি (১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ), বিডন স্ট্রিটের ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়ি (১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ), হাটখোলার দত্তবাড়ি (১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ), বৌবাজারে অক্রুর দত্তের বাড়ি (১৭৮৬-৮৭ খ্রিস্টাব্দ) ইন্টালির দেববাড়ি (১৭৯০ খ্রিস্টাব্দ), জানবাজারে প্রীতরাম মাড়ের বাড়ি (১৭৯০ খ্রিস্টাব্দ, এটি অবশ্য এখন রানি রাসমণির বাড়ি বলে বেশি পরিচিত), বৌবাজারে বিশ্বনাথ মতিলালের বাড়ি (১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দ), দর্পনারায়ণ স্ট্রিটের মল্লিকবাড়ি (১৮০৯ খ্রিস্টাব্দ), পটলডাঙা (বর্তমান কলেজ স্কোয়ার অঞ্চল) বসুমল্লিকবাড়ি (১৮৩১ খ্রিস্টাব্দ), পাথুরিয়াঘাটার খেলাৎ ঘোষের বাড়ি (১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দ) ইত্যাদি।

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রতিষ্ঠাতারা কলকাতার ওই নব্য দোল-দুগোর্ৎসবের ধারাকে উপেক্ষা করতে পারেননি। ধর্ম বিশ্বাসে বৈষ্ণব ভাবাপন্ন হলেও শহরের আর পাঁচটা ব্যবসায়ী পরিবারের মতোই বাড়িতে দুর্গাদালান তৈরি করে শক্তি আরাধনা করতেন। বাড়ি অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগে তৈরি হলেও এখনকার ঠাকুরদালান সম্ভবত তৈরি হয়েছিল আরও পরে। রবীন্দ্রনাথের বড়দিদি সৌদামিনী গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তিনি খড়ের চালার দালানে দুর্গা পূজা হতে দেখেছেন।

সেই তথ্য ঠিক ধরলে, বর্তমান দুর্গাদালান তৈরি হয়েছিল দ্বারকানাথ ঠাকুরের বাবা রামলোচন ঠাকুরের জীবনের শেষ দিকে বা  দ্বারকানাথের আমলেই। আজকের বিশাল আয়তনের জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি একদিনে তৈরি হয়নি। বেশ কয়েক প্রজন্ম ধরে একটু একটু করে বেড়ে উঠেছে, আবার ভেঙেও ফেলা হয়েছে কিছু কিছু অংশ। বর্তমানে যে চেহারা আমরা দেখতে পাই তা মূলত সাড়ে তিনখানা বাড়ি। তার মধ্যে গঠন শৈলীর বিচারে পূর্ব দিকের ‘রাম ভবন’ প্রাচীনতম।

পশ্চিম দিকের ‘মহর্ষি ভবন’ প্রাচীন হলেও তুলনায় পরে হয়েছে বলেই সাক্ষ্য দেয় তার স্থাপত্য বৈশিষ্ট। মাঝে বিশাল উঠোন এবং তার উত্তর দিকে ঠাকুর দালান। এবং এর ঠিক উল্টো দিকে, অর্থাৎ, দক্ষিণ দিকে ঐতিহাসিক নাট্যমঞ্চ। যেটাকে জোড়াসাঁকো নাট্যমঞ্চ বলা যেতে পারে৷ নাট্যমঞ্চটা যেন অনেকটা অ্যাম্ফি থিয়েটারের মতো৷ বাড়ির মহিলারা রাম ভবন, মহর্ষি ভবনের বারান্দায় বসে অভিনয় দেখতে পেতেন৷

বাড়ির বয়স্কা মহিলারা চিকের আড়ালে থেকেই অনুষ্ঠান দেখেছেন৷ আরও পরে, ঠাকুর বাড়ির আধুনিক প্রজন্মের মেয়েরা অংশগ্রহণ করছেন বিভিন্ন নাটকে ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে৷ যেমন অনেকের মধ্যে একটি নাটকের কথা খুব উল্লেখযোগ্য সেটা হচ্ছে বাল্মীকি প্রতিভা৷ যেখানে ঠাকুর বাড়ির মেয়েরা এবং রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে সব ব্যক্তিত্বরা এখানে অভিনয় করেছেন৷

জোড়াসাঁকো বাড়ির ঠাকুরদালান আকারে বেশ বড়ো। পাঁচ খিলান ও দু’ দালান বিশিষ্ট ওই দুর্গামণ্ডপে দুর্গাপুজো ছাড়াও বেশ ঘটা করে জগদ্ধাত্রী পুজোও হত। দ্বারকানাথের আমলে পুজার আড়ম্বর বৃদ্ধি পায়। রামমোহন রায়ের প্রভাবে তিনি একেশ্বরবাদী ঐশ্বরিক ধর্মে বিশ্বাসী হতে আরম্ভ করলেও দুর্গা পূজায় অংশগ্রহণ করতেন বলেই জানা যায়। দেবেন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে পিতার আদর্শে একেশ্বরবাদী ভাবধারায় তেমন প্রভাবিত হয়েছিলেন বলে জানা যায় না।

পুজাতে তিনি অংশগ্রহণ করতেন। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর্ণনা থেকে সামান্য কিছু ঠাকুরবাড়ির তখনকার পুজার কথা জানা যায়। রামমোহন দ্বারকানাথের উভয়েরই বিদেশে প্রয়াণ হলে খানিকটা আকস্মিক ভাবেই দেবেন্দ্রনাথ ব্রহ্ম উপাসনায় মনোনিবেশ করেন এবং ব্রাহ্ম সমাজের হাল ধরেন। বস্তুত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগেই ব্রাহ্ম সমাজ পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ যখন ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হলেন, তার  পর কিছুকাল এই বাড়িতে প্রতিমা গড়ে দুর্গা-জগদ্ধাত্রীর পূজা চললেও একটা সময়ে তিনি ‘পুতুলপুজো’ বন্ধ করে দিলেন। তার পরিবর্তে ওই দুর্গাদালান ও উলটো দিকের নাট্যমঞ্চ ব্যবহৃত হত মাঘোৎসব উপলক্ষে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য।

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর কিছুকাল পরেই পারিবারিক দ্বন্দ্বে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রায় সবটাই ঠাকুর পরিবারের হাতছাড়া হয়ে যায়। গোটা বাড়িটা দখল করে বহিরাগতরা। বাদ পড়েনি ঠাকুর দালানও। বছর বিশেক পর, রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের সময়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের উদ্যোগে ওই বাড়ি সরকারি অধিগ্রহণের মাধ্যমে দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়। বর্তমানে ওই বাড়ি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।