জোকার: দেখ না কেউ হাসির শেষে নীরবতা

‘জোকার’ সিনেমাটা মুক্তির প্রায় সাথে সাথেই দেখেছিলাম। ট্রেলার মুক্তির দিন থেকেই বুঝা যাচ্ছিল এটি হতে যাচ্ছে একটি মাস্টার পিস, ম্যাগনাম ওপাস, এবং হয়েছেও তাই। টরোন্টো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সিনেমা শেষে টানা আট মিনিটের স্ট্যান্ডিং ওভ্যাশন দেখার লোভ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এবং অবশেষে যখন জোকারের সাক্ষাৎ পেলাম, বুঝলাম, কেন চারিদিকে এই সিনেমার এত জয়জয়কার!

কেন এত ভাল লেগেছিল সেটা লিখতে হাত নিশপিশ করছিল। নানান ঘটনা দুর্ঘটনায় তা আর লেখা হয়ে উঠেনি। এখন যখন সুযোগ পেলাম, দুই চার লাইন লেখার লোভ সামলাতে পারছি না।

তিন কারনে জোকার আউটস্ট্যান্ডিং ছিল। স্ক্রিপ্ট, ডিরেকশন এবং অভিনয়। এই তিন স্তম্ভ ভূমি ছেদ করে দাঁড়িয়ে যাওয়ায় বাকিগুলো আপনাতেই সিনেমাকে অন্তরীক্ষে নিয়ে গেছে।

স্ক্রিপ্টের কথা বলতে গেলে এত এয়ার টাইট স্ক্রিপ্ট খুব কম সিনেমায় দেখা যায়। প্রথম দৃশ্য থেকে শুরু করে একদম শেষ দৃশ্য পর্যন্ত, আপনি পর্দা থেকে চোখ সরাতে পারবেন না। ঘটনা বিবরণে একটি চমৎকার ধারা, তাল, লয় ধরে রেখেছে। কোন ধ্রুপদী সংগীতের মতন, কোথাও এতটুকু বিচ্যুতি নেই। যখন ভাববেন সিনেমাটির গল্প বুঝে ফেলেছেন, শেষ দৃশ্যে এসে মাথা চুলকে আবার ভাবতে বাধ্য হবেন, যা দেখলাম সেটা কী আসলেই ঘটেছে? নাকি পুরোটা কল্পনা ছিল? কোন দৃশ্য বাস্তবে ঘটেছে? কোনটা ছিল বিভ্রম?

এর বেশি বলতে গেলে স্পয়লার দেয়া হয়ে যাবে, তাই চুপ করে যাচ্ছি।

অনেকেই গল্পের এই পাঞ্চ/টুইস্টটা নিয়ে সমালোচনা করতে পারেন, আমার এই পাঞ্চগুলিই ভাল লাগে। এই কারণেই জোকার চরিত্রটি এতটা আনপ্রেডিক্টেবল।

টড ফিলিপ্সের ডিরেকশনে মার্টিন স্করসিসির ছাপ ছিল বলে অনেকেই অভিযোগ করেছেন। আমার তাতে বিন্দুমাত্র সমস্যা মনে হয়নি। স্করসিসি ওস্তাদ মানুষ, বিশ্বজুড়ে লাখো ডিরেক্টর তাঁর পিরিয়ড ড্রামাকে বাইবেল গণ্য করবে, এইতো স্বাভাবিক। জোকারের সিকোয়েন্সগুলো মনে করিয়ে দিল সত্তুরের দশকের অপরাধপ্রবণ নিউইয়র্ক (এখানে ‘গোথাম’) শহরের কথা। কিছুক্ষন পরপর পুলিশের সাইরেন ধ্বনি, ময়লা ভর্তি ট্র্যাশব্যাগ রাস্তায় ছড়ানো ছিটানো, হোমলেসদের প্রচন্ড ভিড় – কী নেই তাতে? এই সেট আর প্রপ্সগুলোই চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিল অস্থিতিশীল অর্থনীতির কথা, বেকারত্বের কথা, আন্ডার এম্প্লয়মেন্টের কথা।

সেট ডিজাইনিং এক কথায় অসাধারন! সত্তুরের দশকের গাড়ির মডেল থেকে শুরু করে দালানের ডিজাইন, দোকানের শাটার, সাইনবোর্ড হয়ে গাড়ির লাইসেন্স নাম্বার প্লেট পর্যন্ত প্রতিটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ডিটেইলে যত্নের ছাপ স্পষ্ট। কোন উপায়ই নেই অবিশ্বাস করার যে এটি কোন সময়ের ঘটনা। পিরিয়ড ড্রামা তৈরীতে হলিউডে অনেকেই ওস্তাদি দেখান, ইনফ্যাক্ট, হলিউডে এখন এইসব সেট ডিজাইন বা প্রপ্স দেখানো ক, খ, গ, ঘর মতন ব্যাপার হয়ে গেছে। প্রতি বছর প্রচুর সিনেমা হচ্ছে, প্রচুর টিভি সিরিয়াল হচ্ছে এসবের উপর।

হলিউডের ইউনিভার্সাল স্টুডিওজে যারা কখনও গেছেন, তাঁরা নিশ্চই জানেন এখন হলিউডে কত সহজে ছবি এঁকে, হার্ডবোর্ড দিয়ে ও কম্পিউটারের সাহায্যে কত সহজে ও কম খরচে এমন সেট নির্মাণ হয়ে থাকে। ডিরেক্টর টড ফিলিপসের আসল ওস্তাদি বুঝতে হলে সিনেমার ছোটখাটো ডিটেইলসে গভীর মনোযোগ দিতে হবে। যেমন আর্থার ফ্লেকের নোটগুলিতে হাতের লেখা, ভুল বানানগুলো, আবার একই সাথে তাঁর মায়ের লেখা চিঠিতে হাতের লেখা ও ভাষাশৈলী – এইগুলোকে বলে ওস্তাদের ওস্তাদি।

ওয়াকিন ফিনিক্সের কাছ থেকে যেভাবে অভিনয় আদায় করে নিয়েছেন, তাতে নিঃসন্দেহে তাঁর কৃতিত্ব অবশ্যই আছে। প্রতিটা দৃশ্যের গভীরতা, গল্পের ভিত্তি ইত্যাদি নির্মাণে ক্যামেরার মুভমেন্ট, এঙ্গেল, লাইট, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ইত্যাদি ছিল এক কথায় অসাধারন! সর্বোপরি, জোকার একটি টেক্সট বুক সিনেমা।

ফিল্ম মেকিং শিখতে হলে এই ধরনের সিনেমার উদাহরণ নেয়া যেতে পারে। পরতে পরতে প্রতিটা ভাজে শিল্প লুকিয়ে আছে। টড ফিলিপ্স নিজের ক্যারিয়ার স্থায়ী করে ফেলেছেন এই সিনেমার মাধ্যমে। তিনি যে ইচ্ছা করলেই ক্রিস্টোফার নোলান পর্যায়ে যেতে পারবেন, সেই প্রতিভা যে তাঁর আছে, সেই আভাস তিনি দিয়েছেন। এই জীবনে তাঁর নির্মিত কোন সিনেমা দেখা বাদ দেয়া যাবেনা।

সবশেষে আসা যাক অভিনয় বিষয়ে। সেরাটা দিয়েই উপসংহার টানা যাক। চেরি অন টপ! তবে কোত্থেকে শুরু করবো সেটাই বুঝতে পারছি না। এত অসাধারন অভিনয় আসলেই বহুদিন দেখিনা। অভিনয় বিষয়টা বুঝতে হলে অনেকটা এইভাবে বুঝতে হবে যে, অভিনয় করা আসলে খুব সহজ একটি কাজ। যেকোন পরিস্থিতিতে সংলাপ যেকোন ভাবে বললেই হয়।

এক্সপ্রেশনের ক্ষেত্রেও তাই। কারন আমরা একেকজন মানুষ একেক পরিস্থিতিতে একেকভাবে প্রতিক্রিয়া করি। অতি কষ্টে কেউ পাথর হয়ে যান, কেন বুক চাপড়ে কাঁদেন। দুইটাই স্বাভাবিক। দৃষ্টিকটু নয়। তবে কঠিন অংশটা হচ্ছে কনসিস্ট্যান্টলি সে স্টাইল ধরে রাখা। একই চরিত্র একবার কোন কষ্টে বুকে পাথর চাপা দিলে পরে একই পরিমান বা তারচেয়ে কম কষ্টে হাউমাউ করে কাঁদে না। বুঝাতে পারছি? জোকারে এই কাজটাই অতি দক্ষতার সাথে করা হয়েছে।

ওয়াকিন ফিনিক্স যে জোকার চরিত্রের গভীরে গিয়ে নিজের মধ্যে চরিত্র ধারণ করেছেন সেটা শুধু হাসির প্যাটার্ন দেখলেই বুঝতে পারবেন। বিভিন্ন মানসিক অবস্থায় বিভিন্ন স্টাইলে সে হাসে। কখনও সে হাসতে চাইছে না, কিন্তু জোর করে বেরিয়ে আসছে। ওটা তাঁর মেন্টাল কন্ডিশন। হাসি থামাতে গিয়ে হাসি তাঁর গলায় আটকে যাচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে খুব, চোখ মুখ ভুরু কুঁচকে একাকার।

গলার শিরা উপশিরা ফুলে উঠেছে, মুখ রক্তাভ, তবু হাসি বেরিয়ে আসছে এমন অবস্থা। আবার কখনও তাঁর হাসি পাচ্ছেনা, কিন্তু জোর করে হাসছে। সেই হাসি কিন্তু অন্য রকম, নিষ্প্রাণ, মেকি। আবার যখন তাঁর হাসি আপনাতেই বেরিয়ে আসছে, সেই হাসিটা আরগুলো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, অনেক স্নিগ্ধ, অনেক অনাবিল, নিষ্পাপ। সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিটায় সে কনসিস্ট্যান্ট। এখানেই তাঁর অভিনয়ের স্বার্থকতা।

বা তাঁর নাচের দৃশ্যগুলো ধরা যাক। চরিত্র বুঝতে হলে আপনাকে অবশ্যই তাঁর নাচ বুঝতে হবে। শুরুর দিকে সে অতি সাবধানী, প্রতিটা মুদ্রার আগে যেন দ্বিধাগ্রস্ত, আত্মবিশ্বাসের অভাব। শেষের দিকে এসে সিঁড়ির উপর সে উদ্দাম নটরাজ! যেন পৃথিবীর মুক্ত বাতাসে এই প্রথম বুক ভরে সে শ্বাস নিতে পারছে, বেঁচে থাকার স্বাধীনতা এই প্রথম সে অনুভব করছে।

অথবা একদম প্রথম দৃশ্যটার কথাই ধরুন। গ্রীনরুমে সে জোকারের সাজ নিচ্ছে, ব্রাশের আঁচড়ে সে আর্থার থেকে জোকার হয়ে যাচ্ছে। ঠোঁট টেনে হাসিটিকে আকর্ণ বিস্তৃত করছে, আবার পরমুহূর্তেই রাজ্যের বিষাদ এসে ভর করছে তাঁর চেহারায়। দৃশ্যের যবনিকাপাত ঘটে তাঁর অশ্রু বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। বহু বছর আগে শোম্যানদের জীবন নিয়ে আমাদের আইয়ুব বাচ্চু এই কারণেই যেন বলেছিলেন, ‘দেখ না কেউ হাসির শেষে নীরবতা।’ গানটির কথাটি একদম খাপে খাপে মিলে যায় এ দৃশ্যে। পুরো পৃথিবীকে হাসানোর দায়িত্ব যাদের, তাঁদের অশ্রুর খোঁজ রাখে কয়জনা?

কিংবা কিছু দৃশ্যে ইন্টেন্সিটি ধরে রাখার জন্য অভিনেতা ওয়াকিন শ্বাস প্রশ্বাস পর্যন্ত নেয়া বন্ধ করে দেন। দর্শক একা কেন দম বন্ধ করে দৃশ্য দেখবেন? তিনি নিজেও তা করে দেখালেন।

মোট কথা, জোকার সিনেমাটি আর্থারের জীবনের এক অনন্য যাত্রা! এক মানসিক রোগী, যার জীবনে ঘটে যাওয়া ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনা, দুর্ঘটনা, যা তাঁর পরিণতির জন্য অনুঘটক বা নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে, তা রক্তমাংসের শরীর ধারণ করে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। সে হিরো? অবশ্যই না।

সে ভিলেন? হ্যা, এবং কেন ভিলেন, সেটাই এই গানের রাগ। গল্প জানার পরে দর্শক মনে জোকারের জন্য সহানুভূতি জাগতে পারে, করুণা জন্মাতে পারে, কিন্তু কেউই বাস্তব জীবনে জোকার হতে চাইবে না। না চাইবে তাঁকে প্রেমিক হিসেবে পেতে। নেগেটিভ চরিত্র নিয়ে সিনেমা বানানো নিয়ে যারা কুতর্ক করেন, বলিউডি ‘কবির সিং’কে জোকারের সাথে মিলিয়ে মিশিয়ে নিজেরাই প্যাঁচে জড়িয়ে যান, আশা করি এই সহজ সরল বোধটা তাঁদের মস্তিষ্কে জন্মাবে।

সিনেমা প্রেমীদের অবশ্যই ভাল লাগার কথা। এমন সিনেমা বহু বছর পরপর পর্দায় ভেসে উঠে। বছরের সেরা চলচ্চিত্র, সেরা অভিনেতা, সেরা পরিচালক, স্ক্রিপ্ট ইত্যাদির অস্কার পেল কি পেল না তাতে কিছু যায় আসেনা। হলিউডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটি ছবি তৈরী হলো, এই হচ্ছে সার কথা।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।