অচেনা অরন্যের গভীরে জিং সিয়াম ঝর্ণায়

অরণ্য আঁধার করে রাখা পাহাড়ি পথে বেশ খানিকটা সময় আয়েসে কাটিয়ে যখন উঠি তখন সবাই বেশ চনমনে। আর তেমন না থাকার কোন কারণও নেই। যেহেতু সুংসাং পাড়া থেকে খুব বেশী সময় হাটা হয়নি। তখন সকাল ১০ টার মত বাজে হয়তো।

একটু একটু করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি ঝর্ণার ঝরে পরার গুনগুন শুনতে শুনতে। প্রায় ৩০ মিনিট চলার পরে প্রথম পাহাড়ি ঢাল এলো। যে ঢাল বেঁয়ে ঝর্ণা ধারার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আর এই ঢাল থেকেই শুরু হল প্রথম গা ছমছমে অনুভুতি।

কারন পথ, পথের দুই পাশের গাছপালা, আগাছা, এসব দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে এই পথে বহুদিন কেউ আসেনি। একেবারেই অন্য রকম একটা রোমাঞ্চে সবাই কমবেশি রোমাঞ্চিত। একদম নতুন, অচেনা কোন কিছুর সন্ধানে যাচ্ছি একটি দল হয়ে। সবচেয়ে বড় যে ব্যাপারটা আমাদের রোমাঞ্চ বাড়িয়ে তুলেছিল সেটা হল, এই পথে সূর্যের আলো পর্যন্ত ঠিকমত পৌছাতে পারছেনা আদিম অরন্যের বিশাল বিশাল গাছের ছায়া দিয়ে ঘিরে রাখা ছাঁদের কারনে।

পাহাড়ি ঢাল থেকেই শুরু হল আরও নতুন রোমাঞ্চ| সতর্ক হয়ে পা ফেলতে হল দুটি কারণে – এক হল এই ঢালে রাতের শিশির পড়ে পড়েআর সূর্যের আলো বা তাপ না পেয়ে পেয়ে একদম ভিজে আছে পুরো ট্রেইল-ই। অবশ্য ট্রেইল বা ছিল কোথায় যেখানে বহুদিন কেউ যাওয়া আসা করেনি সেসব পাহাড়ি পথের ট্রেইলও হারিয়ে যায় বেশ অল্প সময়ের মধ্যেই। যে কারণে ট্রেইল বা পথ নিজেদের মত করেই করে নিতে হচ্ছিল দা দিয়ে চলার পথের দুই পাশের আগাছা আর গাছের ডালপালা কেটে কেটে।

এই অচেনা পথের, গভীর অরণ্যের মাঝে, পাহাড়ি ঢালে, নিজেদের বানিয়ে নেয়া ট্রেইল ধরে আমরা কোথায় আর কোন দিকে যাবো তার একমাত্র সংকেত ছিল পাহাড় দিয়ে ঝরে পড়া ঝর্ণা ধারার মৃদু শব্দমাত্র। কারণ আমাদের গাইড পর্যন্ত সঠিক ভাবে পথ নির্ধারণ করতে পারছিলনা যে আসলেই আমরা কোন দিকে যাবো।

যদিও তার দেয়া তথ্য মতে সে এই জিং সিয়াম ঝর্ণায় এর আগেও এসেছে। তবে সেটা অনেক আগে তাই পথে চিনে নিতে তার সমস্যা হচ্ছে। এটা হতেই পারে, তবে কেন যেন আমরা কেউই ওকে ঠিক মত বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে আসলেই ও এই ট্রেইলে আগে এসেছে।

তবুও কি আর করার, একটুও মন্দ লাগছিলনা কারো। অনেকজন মিলে বেশ দারুণ একটা দল হয়ে গিয়েছিলাম বলে। সবাই বেশ কাছাকাছি বয়সের আর কারোই নিজ থেকে তেমন মাতব্বরি করা স্বভাব ছিলোনা। যে কোন দলবদ্ধ অভিযানে যেটা খুব বেশি দরকার।

যে কোন এক জনের নির্দেশ বা পরামর্শ মেনে এগিয়ে চলা। যেটার জন্য অভিযান সফল হবার সম্ভাবনা বেশী থাকে। আর যে কোন নতুন, অচেনা আর অজানা কোন কিছুর সন্ধানে বের হলে ব্যর্থতা আসতেই পারে সেটা সব সময় মাথায় রাখা উচিৎ।

কারণ নতুন আর একদম ভিন্ন রকম কোনো কিছু চাইলেই হুট করে এসে হাতে ধরা দেবেনা কখনোই। তার জন্য চাই ধৈর্য, চেষ্টা, শ্রম আর কঠোর মনোবল। এই সবের সমন্নয় যদি ঘটে বা কেউ ঘটাতে পারে একই সাথে তবেই নতুন কিছু অর্জনের বা অচেনা কোন লখ্যে পৌছানো অনেকটা সহজ হয়ে যায়। এটা সব সময় আমরা মাথায় রেখেছিলাম। যে কোন দলবদ্ধ লখ্য অর্জনে সবারই এটা মাথায় রাখা উচিৎ।

আর এই সুত্র মেনেই সামনের দিকে পাহাড়ি পিচ্ছিল খাড়া ঢাল বেঁয়ে বেঁয়ে নিচের দিকে নামছিলাম ঝর্ণার শব্দ শুনে শুনে। অবশ্য চেনা পথ হলেও তেমন কোন লাভ হত বলে মনে হয়নি, কোন পথই যে চোখে পরেনি কখনো। শুধু আগাছা, ঘাস, লতা-পাতা, শুকনো ডালপালা আর কিছু পাহাড়ি জংলি ফুল ছাড়া। তাই পথ থাকলেও সেটা বিলীন হয়ে গেছে কোন কবে কে জানে?

এভাবে কখনো ঝুরো মাটির পথে স্লিপ কেটে, কখনো পিচ্ছিল পাথরে পা ফেলে, কখনো প্রাচীন গাছের ঝুলে থাকা লতা ধরে ধরে ঢাল বেঁয়ে একটি ঝিরির দেখা পেলাম। ঝিরি পেয়েই আমাদের সবার চোখ মুখ উদ্ভাসিত হয়ে গেল। কারন ঝিরি মানেই ঝর্ণা আর ঝর্ণা মানেই ঝিরি এটা পাহাড়ে যারা একটু আধটু যায় তারা জানে।

হোক সে একটু কাছে বা কিছুটা দূরে, ঝিরি যেহেতু পাওয়া গেছে ঝর্ণাও পাওয়া যাবে সেই ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হয়ে গেলাম। আর ঝর্ণা কোন দিকে হবে সেটার জন্য বিশেষ কোন অভিজ্ঞতার দরকার নেই, সাধারন সেন্স দিয়েই বোঝা যায় যে ঝিরির পানি পাহাড়ের যেদিক থেকে প্রবাহিত হচ্ছে সেদিকেই ঝর্ণাধারার দেখা পাওয়া যাবে।

সুতরাং ঝিরির মাঝের টলটলে শীতল জলের মাঝে মাঝে অনন্তকাল ধরে ডুবে বা ভেসে থাকা পিচ্ছিল পাথরে খুব সাবধানে পা ফেলে ফেলে, বেশ ঝুঁকিপূর্ণ পথ পেরিয়ে এগিয়ে যেতে যেতেই দুই একজন স্লিপ কেটে পরে গিয়েছে, ব্যাথা পেয়েছে, কারো একটু কেটে গিয়েছে, কেউ কেউ আর প্যান্ট গুটিয়ে পাথরের পরিবর্তে সরাসরি হিম শীতল জলের ধারা পাহাড়ি সেই ঝিরিপথ ধরেই সামনে এগিয়ে চলেছে।

যতই সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম ততই ঝর্ণার গান যেন তার সুর উপরে তুলে ধরছিল, আমাদেরকে জানাতে যে সে আছে, খুব বেশি দূরে নয়। কাছেই, আশেপাশেই। আর একটু কষ্ট করে সামনে এগিয়ে, পাথুরে পিচ্ছিল পাথরের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধা পেরিয়ে গেলেই দেখা মিলবে পাহাড়ের অনন্ত সুখ, সুখের কান্না, আনন্দের অশ্রু বিসর্জনের অপূর্ব রূপের। ঝর্ণা ধারার।

সত্যি-ই তাই। খুব বেশি নয়, ২০ মিনিটের মত হবে হয়তো। এমন গভীর পাহাড়ি অরন্যের মাঝে বয়ে চলা ছোট্ট ঝিরির ভীষণ পিচ্ছিল পাথুরে আর জনমানবহীন গা ছমছমে নির্জন পথ পেরিয়েই আমরা দূর থেকে দেখতে পেয়েছিলাম জিং সিয়াম ঝর্ণার ক্ষীণ রূপ। তবে কিভাবে কার কি হয়ে গেল জানিনা। দূর থেকে উচু পাহাড়ের শরীর বেঁয়ে বেঁয়ে সুখের অশ্রুধারা, ঝর্ণার ঝরে পড়া দেখতে পেয়েই সবাই যেন অকুতোভয় হয়ে গেল! সবার সব ব্যাথা, কাটাছেড়া যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল! সুখের ঝর্ণাধারা সবার শক্তি যেন মুহূর্তেই বাড়িয়ে দিয়েছিল।

যে কারণে ঝর্ণার একদম কাছাকাছি যাওয়ার আরও প্রায় ১৫ মিনিটের পথ কেউ তিন চার বা পাঁচ মিনিটের মধ্যেই যে যার মত করে অসীম আনন্দ আর অপার উচ্ছ্বাস নিয়ে পৌঁছে গেল। ঝর্ণাধারার কাছে গিয়ে যে যার মত করে চুপ হয়ে গিয়েছিল। কেউ বসে, কেউ দাড়িয়ে, কেউ শুয়ে শুয়েই উপভোগ করছিল অবিরত পাহাড়ের শরীর দিয়ে ঝরে পড়া জিং সিয়াম ঝর্নারধারা। সবাই অনেক অনেকটা সময় কেউ কারো সাথে কোন কথা বলে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।