বাংলাদেশের জন্য তিনি বিমান ছিনতাই করেছিলেন!

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল।

মিত্র বাহিনীর আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণে যুদ্ধ নুতুন মাত্রা পেতে যাচ্ছে। মুক্তিবাহিনী তুমুল যুদ্ধ চালিয়ে ঢাকার দিকে অগ্রসরমান। ওদিকে জঁ ক্যা নামে ২৮ বছর বয়সী এক ফরাসি তরুণ একাত্ম হয়েছিলেন আমাদের মুক্তিসংগ্রামে। বিমান ছিনতাই করে ফ্রান্সসহ পুরো ইউরোপজুড়ে তখন তোলপাড় ফেলে দিয়েছিলেন জঁ ক্যা।

ফ্রান্সের অরলি বিমান বন্দরে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের (পিআইএ) একটি বোয়িং-৭২০ বি বিমান করাচি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বেলা তখন ১১ টা বেজে ৫০ মিনিট। পাইলট আকাশে ওড়ার প্রস্তুতি হিসেবে বিমানটি চালু করতেই পকেট থেকে পিস্তল বের করে জঁ ক্যা ইঞ্জিন বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন।

কেউ তাঁর নির্দেশ অমান্য করলে সঙ্গে থাকা বোমা দিয়ে পুরো বিমানবন্দর উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিলেন তিনি। ওয়্যারলেসটি কেড়ে নিয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মাধ্যমে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে জঁ নির্দেশ দিলেন, ‘বিমানটিতে যাতে ২০ টন ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী তুলে তা যুদ্ধাহত ও বাংলাদেশি শরণার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। আমার এই দাবি নিয়ে কোনো আপোষ চলবে না।’

দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা ধরে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেও তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও নাড়াতে পারেন নি। বিমানটিকে মুক্ত করতে ফরাসি সরকার তখন নতুন এক ফাঁদ আটল। তারা জঁ ক্যার দাবি অনুযায়ী ওষুধ আনতে ফরাসি রেডক্রসকে খবর দিল। রেডক্রস আরেক ফরাসি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘অর্ডি দ্য মানতে’র সহায়তায় বিমানবন্দরে দুটি ওষুধভর্তি গাড়ি নিয়ে হাজির হলো।

ওই গাড়ির চালক ও স্বেচ্ছাসেবকের পোশাক পরে বিমানটিতে প্রবেশ করলেন ফরাসি পুলিশের বিশেষ শাখার চারজন সদস্য। তাঁরা বিমানে তোলা ওষুধের বাক্সে পেনিসিলিন রয়েছে, এ কথা বলে বিমানের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় সেগুলো সাজিয়ে রাখার ভান করে সময়ক্ষেপণ করতে থাকলেন। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা ওষুধের বাক্স নামানোতে সহায়তার নাম করে জঁ ক্যার হাতে একটি বাক্স তুলে দিলেন।

এরপরই তাঁর ওপর আক্রমণ শুরু করলেন পুলিশের সদস্যরা। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে রাত আটটায় জঁ পুলিশের হাতে আটক হলেন। ফরাসি আদালত পাঁচ বছরের জন্য জেল দেয়। জঁ ক্যা কারাগারে থাকা অবস্থাতেই তাঁর পক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকারকর্মীরা সোচ্চার হয়ে ওঠেন।

অনেক আইনি লড়াইয়ের পর আদালত জঁ-এর শাস্তির মেয়াদ তিন বছর কমিয়ে তাঁকে ১৯৭৩ সালে মুক্তি দেন ততদিনে বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত স্বাধীন দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। তবে ’৭১-এর ৩ ডিসেম্বর প্যারিস বিমানবন্দরে তাঁর দুঃসাহসী বিমান ছিনতাই ঘটনা কিন্তু বৃথা যায়নি। ডিসেম্বরের ৮ তারিখে জঁ ক্যা জেলে থাকা অবস্থাতেই ফরাসি রেডক্রস ও নাইটস হাসপাতাল বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য ২০ টন ওষুধ ও শিশু খাদ্য পাঠায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের সমর্থন বাড়ে। বিস্ময়করভাবে জঁ’র মৃত্যুও হয়েছিল আমাদের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেই। দিনটি ছিল ২৩ ডিসেম্বর, ২০১২ সাল।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।