জয়া আহসানদের অসম্মান করা একটি ‘স্যাডিস্ট’ প্রজন্ম

আরেকজনকে অপমান করার কাজটা বাংলাদেশিদের চেয়ে ভালো পৃথিবীতে আর কেউ পারে বলে মনে হয় না। আমরা একজন মানুষকে কী নিয়ে অপমান করবো বা কী নিয়ে করবো না সেই নূন্যতম জ্ঞানটুকু পর্যন্ত রাখি না।

জয়া আহসান এই মুহূর্তে বাংলাদেশের গ্লোবাল স্টারদের মধ্যে অন্যতম। পাশের দেশ ভারতে গেলে দেখবেন তারা সাকিব আল হাসানের নাম শুনার পর আগে যেমন সম্মান দিতো বা এখনো যেরকম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, জয়া আহসানের নাম শোনার পরেও এখন সেই সম্মানটাই দেয়ার চেষ্টা করে। তিনি তার কর্মক্ষেত্রে সফল। অভিনয় করে মানুষের মন জয় করার প্রয়োজন ছিলো, সেটা তিনি করেছেন।

এখন জয়া আহসান গ্লোবাল স্টার কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন করলে লাগবে যুদ্ধ। ভাই জয়া আহসান অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশের ক্রিড়া জগতের সাথে আছেন। নারী ক্রিড়া সম্প্রসারণে তার অবদান আছে। আর কান চলচ্চিত্র উৎসবের মত জায়গাতেও তাঁকে নিমন্ত্রণ দেয়া হয়। এখন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, প্রিয়াঙ্কা চোপড়াদের দেশ তো আমাদের দেশ না। আমাদের দেশ হলো মুনমুন-ময়ূরীদের দেশ। এখানে জয়া আহসানের মত একজন গুণী মানুষকে গ্লোবাল স্টার হিসেবে বিবেচনা করাই যায়। উইকিপিডিয়াতে একটু গিয়ে তার অর্জন দেখে আসবেন। তিনি একদমই ফেলনা না।

আরেকদল সিরিয়াস অপদার্থ বলবে তিনি যাওয়ার আগে ক্রিকেট অনুশীলন করে যেতেন। আপনারা আপনাদের ঘরে থাকা চল্লিশোর্ধ্ব কোনো নারীকে ক্রিকেট শেখানোর চেষ্টা করে দেইখেন। সারাজীবন না খেলতে খেলতে শরীর এসবের জন্য রেডি থাকে না যে একদিন অনুশীলন করলেই শেখা হয়ে যাবে। জয়া আহসানের আরো অনেক ব্যাস্ততা আছে।

হ্যা, আপনি বলতে পারেন ডক্টর ইউনুস কে নিতে পারতো। হয়তো বা উনি অ্যাভেইলেবল ছিলেন না। হয়তো বা উনি অন্য কাজে বিজি ছিলেন। আর এই কাজটা একটা গ্ল্যামারাস ব্যাপারও আইসিসি মিডিয়া হাইপ চেয়েছিল, চেয়েছিল গ্ল্যামার। বাংলাদেশে জয়া আহসানের যেটা আছে। অন্তত মিডিয়া কাভারেজ তাই বলে। আইসিসি তাদের সিদ্ধান্ত ঠিকটাই নিয়েছিলো।

তার ক্রিকেটে অদক্ষতাকে ঘিরে যে নোংরা লেভেলের ট্রল করা হচ্ছে তা বলার বাইরে। যারা এরকমটা করছেন তারা কি নিজেদের মা বোনদেরকে নিয়েও তারা যেসব কাজে অদক্ষ, কিন্তু করতে গেলে না পারার পর এমন সব কথা বলেন? আমার মনে হয় না বললেও বলতে আপনাদের খুব একটা কষ্ট হবে না। অভ্যাস আছে এসব বলার।

সাকিব আল হাসান যেমন সিনেমায় অভিনয় করতে পারবেন না কিন্তু ভালো ক্রিকেট খেলেন তেমনি যেমন জয়া আহসানও ভালো ক্রিকেট না খেলতে পারলেও অভিনয়শৈলীতে ঠিকই পারদর্শী।

আচ্ছা এতবড় একটা লেখা লিখতেছি কিসের জন্য যেনো?

ও, হ্যা মনে পড়েছে। আইসিসি ওয়ার্ল্ডকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিনে ওয়ান মিনিট ক্রিকেট চ্যালেঞ্জে জয়া আহসানের ক্রিকেট না পারা নিয়ে নীচুজাত বাংলাদেশীদের অমানবিক আচরণের জন্য এই লেখাটা লিখতে হয়েছে।

আচ্ছা এই তোমরা যারা ৪৬ বছরের মা চাচীর বয়সী জয়া আহসানকে নিয়ে এমন জঘন্য ট্রল করছো তোমাদের কী মনে হয়? সেখানে জয়া আহসানকে কেনো নিয়েছে?

জয়া আহসান এখন আমাদের অন্যতম গ্লোবাল স্টার। তিনি সেখানে উপস্থিত থাকলে আইসিসির ইভেন্ট নিয়ে একটু মাতামাতি বেশি হবে, যেমনটা আইসিসি মালালা ইউসুফ জাইকে নিয়েছে পাকিস্তান থেকে। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নিয়ে তাই জয়া আহসান, ফারহান আখতার, মালালা ইউসুফ জাইদের মত গ্লোবাল সেলিব্রেটিদেরকে নিছে যেনো অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। এটা আমাদের গো-মূর্খদের মাথায় ঢুকে না!

আর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সেলিব্রেটিদেরকে নেয়া হয় ফেস ভ্যালুর জন্য। ক্রিকেট ম্যাচ খেলার জন্য তো ক্রিকেটাররাই আছেন। জীবনে কখনো মনে হয় উদ্বোধনী অনুষ্টান দেখে অভ্যাস নাই আপনাদের। সবাই ট্রল করছে তাই আমিও ট্রল করি নীতিতেই জীবন কাটিয়ে দিবেন মনে হচ্ছে।

এই ওয়ান মিনিট চ্যালেঞ্জ জিতে গেলে বিশ্বকাপ জিতে জেতাম, কারো কারো সমালোচনার ধরণ দেখে তাই মনে হচ্ছে।

এমন একেকটা ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, আমাদের চোখের সামনেই কি দারুণ একটা স্যাডিস্ট প্রজন্ম বসবাস করছে। ধর্ষণের জন্য পোশাক দায়ী করা, আগুন লাগার পরেও কেমিকেল গোডাউন সরানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া, বিল্ডিং এ রডের বদলে বাশ দেয়া, বেশি লাভের জন্য খাবারে ভেজাল মিশিয়ে দেয়া, সিন্ডিকেট করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দেয়া, ধর্মের ঢাল ব্যবহার করা নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করা, পাবলিকলি চুমু খেলে সেটাকে প্রকাশ্যে যৌনমিলনের সমতূল্য জ্ঞান করা, নিরাপদ সড়ক দাবি করলে পরিবহন শ্রমিকদের দ্বারা সারাদেশ অচল করে দেয়া, ক্রিকেট পারে না বলে জয়া আহসানকে ট্রল করা – সবই আসলে আমাদের জাতিগত সমৃদ্ধির পরিচয়।

এসবের কবে যে অবসান হবে কে জানে। জয়া আহসান আপনি এসব না দেখলেই ভালো। মানসিক ট্রমার মধ্যে পরে যাবেন। সাধুবাদ জানাই আইসিসির কাছ থেকে এই সম্মান পাওয়ার জন্য।

জয়া আহসান অনেকের প্রেরণার উৎস। অনেক নারীই তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়। উনাকে উনার প্রাপ্য সম্মানটা দেয়া উচিত ছিলো।

সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ঘৃণার চাষ করা জাতিগুলোর মধ্যে আমরা অন্যতম। আপনি না হয় আপনার পরিবার থেকে শেখা ভালোবাসা সম্মান শ্রদ্ধার বীজ রোপন করে দিন আপনার চারপাশে। নাকি আপনার পরিবার থেকে এই শিক্ষাটা দেয়নি? অন্যের মা বোন কে কিভাবে যথাযথ সম্মানটা দিতে হয় সেই শিক্ষাটা অর্জন করতে পারেননি?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।