মিয়াঁদাদ-লিলি যুদ্ধ: ক্রিকেট মাঠের ন্যাক্কারজনক অতিত

১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি। ডেনিস লিলির সাথে কুখ্যাত এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন সুনিল গাভাস্কার। সেই ঘটনার জের ধরে আরেকটু হলেই অধিনায়কত্ব হারিয়ে বসতেন গাভাস্কার। ভারতীয় ম্যানেজার শহীদ দুররানিকে এগিয়ে এসে তখন দলকে অনুপ্রেরণার দায়িত্বটাও নিতে হয়। ফলাফল, অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েই দেয় ভারত।

সেই বছরেই এরপর আরেকটা ঝামেলায় জড়ান লিলি। আর এটা কেবল তাঁর খ্যাতিকেই কলঙ্কিত করেনি, চিরাচরিত ভদ্রলোকের খেলার আভিজাত্যেও কালি লাগিয়েছিল।

লিলি এবার যার সাথে ঝামেলায় জড়ান তিনি হলেন পাকিস্তানের অধিনায় জাভেদ মিয়াঁদাদ। লিলি ও মিয়াদাদ – দু’জনই সেকালের বড় তারকা, জনপ্রিয় ক্রিকেটার। দক্ষতা ও নৈপুণ্যে তাঁদের জুড়ি যেমন পাওয়া কঠিন ছিল তেমনি তারা ছিলেনও রগচটা প্রকৃতির।

পার্থ টেস্টে পাকিস্তানের সামনে ৫৪৩ রানের অসম্ভব এক লক্ষ্য দাঁড় করায় স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার। পাকিস্তান যখন পরাজয়ের সন্নিকটে চলে এসেছিল, ঠিক তখনই আক্ষরিক অর্থেই ‘মারপিট’ করে জিততে চেয়েছিলেন মিয়াঁদাদ।

  • সে সময় যা হয়েছিল

লিলির ইনসুইঙ্গার লেগ সাইডে খেলে এক রান দিলেন মিয়াঁদাদ। তখনই বোলারের সাথে ধাক্কা লাগে তাঁর। ভিডিও দেখে মনে হতে পারে লিলি ইচ্ছা করেই একটু পিছিয়ে গিয়ে মিয়াঁদাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।

বিষয়টাতে যতটা না মিয়াঁদাদের দোষ, তার চেয়ে বেশি দোষ নি:সন্দেহে লিলির। কিন্তু, উল্টো লিলিই বেশি ক্ষেপে গেলেন। ক্রিজ পার করে ফেলা মিয়াদাঁদকে লাথি মেরে বসলেন লিলি। ব্যস, মিয়াঁদাদের মেজাজও তখন চড়া, ব্যাট হাঁকিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়লেন।

আম্পায়ার টনি ক্রাফটার মাঝে না এসে পড়লে হয়তো সেই দফায় পাল্টা মারই খেয়ে বসতেন লিলি। আম্পায়ারই উত্তেজিত দুই তারকাকে শান্ত করেন। মধ্যস্ততায় এগিয়ে আসেন অজি অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেলও। লিলিকে বাউন্ডারিতে ফিল্ডিং করতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

এটা ক্রিকেট মাঠে ঘটে যাওয়া অন্যতম কুৎসিত ঘটনাগুলোর একটি। গোটা বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হন লিলি। সাবেক অস্ট্রেলিয়ন অধিনায়ক বব সিম্পসন বলেই দেন যে তিনি ক্রিকেট মাঠে এর আগে কখনো এতটা ন্যাক্কারজনক ঘটনা দেখেননি। ৪০ ও ৫০-এর দশকে অস্ট্রেলিয়ার স্টার অলরাউন্ডার কিথ মিলার দাবী করেন, মিলারকে ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধই করে দেওয়া উচিৎ।

যদিও, অধিনায়ক চ্যাপেল সেই সময় লিলির পাশে এসে দাঁড়ান, কারণ লিলি নিষিদ্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হত তাঁর দলকেই। লিলি ওই সময়ের তো বটেই, ক্রিকেটের ইতিহাসেও অন্যতম সেরা ফাস্ট বোলারদের একজন। চ্যাপেল দাবী করেন, শুরুটা পাকিস্তানিরাই আগে করেছেন। একই সাথে তিনিও এই ঘটনাকে ক্রিকেট মাঠে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বাজে ব্যাপার বলে রায় দেন।

লিলি অবশ্য ছাড় পাননি। তাঁকে ২০০ ডলার জরিমানা করা হয়। অস্ট্রেলিয়ান খেলোয়াড়রা ভিতরে যাই ভাবুন না কেন, বাইরে তাঁরা বরাবরই বলেছেন যে, লিলিকেই আগে অহেতুক উত্তেজিত করা হয়েছে। পাকিস্তানের টিম ম্যানেজমেন্ট এই ‘সামান্য’ সাজায় নাখোশ ছিল।

অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন টিম ম্যানেজার জন এডওয়ার্ডস পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে বিষয়টার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, ‘ডেনিস প্রতিশোধপরায়ন হয়ে কাজটা করেছে। তবুও আমরা তাঁকে ক্ষমা করিনি। ২০০ ডলার জরিমানা করা হয়েছিল। এটা খুব সামান্য ব্যাপার হলেও, অস্ট্রেলিয়ান দল দাবী ছিল প্রথম শারীরিক আক্রমণটা জাভেদই করেছে।’

তিনিও এটাও মনে করেন যে, মিয়াঁদাদের সাথে তাঁর সংঘর্ষ না হলে ঘটনা এতদূর গড়াতোই না। তিনি বলেন, ‘ফুটেজে সবাই দেখতেই পেয়েছে কি হয়েছিল, জাভেদকে লাথি মেরেছে লিলি। তবে, জাভেদের সাথে ওর প্রথম সংঘর্ষটা না হলে তো ঘটনা এতদূর গড়ায়ই না।’

  • লিলি-মিয়াঁদাদের ভাবনা

মিয়াঁদাদের বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই এর চেয়ে অনেক আলাদা ছিল। তিনি বলেন, ‘আমি রানটা শেষ করছি। লিলি আমাকে আটকে বাজে কথা বললো। আমি দেখছিলাম, বলটা রডনি মার্শের হতে পৌঁছে গেছে। আর ও আমাকে রান আউট করার অপেক্ষায় ছিল। ওই সময় আমাকে লিলিকে ধাক্কা মারা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। এরপর ও ক্ষেপে গিয়ে আমাকে লাথি মারে আর আম্পায়াররা আমাদের মাঝে চলে আসে। ও অকথ্য ভাষায় আমার সাথে কথা বলছিল। বিষয়টা আমার কাছে ভাল লাগেনি।’

লিলি অবশ্য এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পাকিস্তান দলের কাছে আনুষ্ঠানিক ভাবে ক্ষমা চেয়েছিলেন। তবে, এটাও বারবারই বলেছিলেন যে, তিনি প্রতিশোধ নিতেই কাজটা করেছিলেন। পরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের মধ্যে একটা রেষারেষি আগে থেকেই ছিল। আর ওই লাথির ব্যাপারে বলতে চাই, ইট মারলে পাটকেল তো হজম করতেই হবে। কেউ যদি কিছু শুরু করে, তাহলে তাঁকেও তো প্রাপ্যটা বুঝিয়ে দেওয়া দরকার।আমার অবশ্যই লাথি মারা ঠিক হয়নি, তবে মনে রাখতে হবে ও নিজেও আমাকে ব্যাট তুলে মারতে এসেছিল। দুটি পক্ষই এখানে দেখতে হবে, এক হাতে তালি বাজে না। নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে অবশ্যই আমি ওকেই বেশি দোষ দিবো।’

পাকিস্তানের তৎকালীন ম্যানেজার ইজাজ বাট সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ও (ডেনিস লিলি) যদি আমার দলের খেলোয়াড় হত, তাহলে আর কখনো টেস্ট খেলারই সুযোগ পেত না।’

‘ইন কাটিং এজ: মাই অটোবায়োগ্রাফি’তে মিয়াঁদাদ সেই ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। সেখানে তিনি দাবী করেছেন, রান শেষ করার একদম শেষ মুহূর্তে লিলি তাঁর পথ আটকান। তাই, ক্রিজে পৌঁছাতে লিলিকে ধাক্কা মারার কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না তাঁর সামনে। মিয়াঁদাদ লিখেছেন প্রায় সাথে সাথেই লিলি ঘুরে তাঁর প্যাডে লাথি মারেন। এরপরই মিয়াঁদাদ ব্যাট তুলে মারার হুমকি দেন।

মিয়াদাঁদ মনে করেন, তাঁকে ভিলেন বানানোর কারণ হল তিনি পাকিস্তানি। তিনি লিখেছেন, ‘আমি যদি ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হতাম তাহলে আমার প্যাডে লাথি মারা ভাবনা ডেনিসের কল্পনাতেও আসতো না।’

তবে, যাই হোক না কেন কালক্রমে এই দুই ক্রিকেটারই নিজেদের মধ্যে বিষয়টা মিটমাট করে ফেলেছেন। এখনো কোনো সাক্ষাৎকারে কিংবা নিজেদের আত্মজীবনীতে সেই ঘটনাটিকে তাঁরা নিজেদের ‘কম দোষী’ বিবেচনা করেই ব্যাখ্যা করেন। তবে, সত্যিটা হল সেটা ক্রিকেট মাঠের কলঙ্কজনক এক অধ্যায় হিসেবে আজীবন লেখা থাকবে।

– ক্রিকেট কান্ট্রি অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।