জেমস-ফিলিংস ও ‘জেল থেকে বলছি’ গানের অজানা গল্প

১৯৯৩ সালে সারগাম থেকে প্রকাশিত তৎকালীন জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘ফিলিংস’ এর দ্বিতীয় অ্যালবামের শিরোনাম সংগীত ‘জেল থেকে বলছি’ গানটির কথা শোনেনি এমন মানুষ বাংলাদেশে পাওয়া যাবে না। বাংলা ব্যান্ড ও আধুনিক গানের বহু জনপ্রিয় ও কালজয়ী গানের গীতিকার ও সুরকার লতিফুল ইসলাম শিবলির লেখা ছিল ‘জেল থেকে বলছি’ নামের এই গানটি।

যারা খুব অল্প হলেও বাংলা গান শুনেছেন তারাও জানেন সেই ‘ফিলিংস’ এর ‘জেল থেকে বলছি’ গানটির কথা। শুনেছেনও সবাই। এই একটি গান ও অ্যালবাম দিয়ে বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের জীবন্ত কিংব্দন্তি ‘জেমস’ ও তাঁর দল ফিলিংসকে নিয়ে আসে পাদপ্রদীপের আলোয়। অথচ এর আগেও জেমস এর একটি একক ‘অনন্যা’ ও ফিলিংস এর ‘স্টেশন রোড’ নামের দুটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছিল।

সেই দুটি অ্যালবাম দিয়ে জেমস ও ফিলিংস কে যত মানুষ চিনেছিল তাঁর চেয়ে কয়েক গুন মানুষ শুধু ‘জেল থেকে বলছি’ অ্যালবাম দিয়ে জেমস ও ফিলিংস কে চিনেছিল। এর আগে যারা কখনও জেমস ও ফিলিংস কে চিনতো না তারাও দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘জেল থেকে বলছি’ দিয়ে জেমস ও ফিলিংস এর ভক্ত হয়ে যায়।

এরপরের ইতিহাসটা সবারই জানা। জানা নেই যেটুকু, সেটুকু নিয়েই আমার আজকের এই গল্প।

৯০ দশকের শুরুতে স্বৈরাচার এরশাদ সরকার এর পতনের পরপরেই জেলা শহর ‘নাটোর’ এর এক প্রাণবন্ত ও প্রতিবাদী তরুন প্রিয় নাটোর ছেড়ে ও পরিবার পরিজন ছেড়ে ঢাকা শহরে আসে লেখাপড়া করার জন্য যার নাম ছিল লতিফুল ইসলাম শিবলি। ছেলেটি ঢাকায় যে বাসায় ভাড়া থাকতো সেটা ছিল একটি বাসার ছাদের উপরের একটি ছোট্ট ঘর যেটিকে আমরা বলি ‘চিলেকোঠা’।

ঘরের ভেতরের একটা জানালা ছিল। সেই জানালার পাশে ছেলেটির বিছানা যেখান থেকে বালিশে মাথা রাখলেই পুরো আকাশটা দেখা যায় আর বাপাশে ছিল ছাদ এর পাকা আঙ্গিনার সাথে দুরের আকাশের একাকার হয়ে যাওয়ার অপরুপ দৃশ্য। একদিন দুপুরে ছেলেটি বিছানায় শুয়ে ডান পাশের জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আকাশ দেখছিল।

তখনই শিবলি ভাইয়ের মনে জেলে থাকার সেই দিনটির কথা মনে পড়লো, যেখানে আকাশ দেখা যেতো না। ধীরে ধীরে শিবলি ভাই ভাবতে লাগলেন অসুস্থ অবস্থায় শুয়ে থাকা কোন রোগীর কথা যে বহুদিন আকাশ দেখেনি। আবার কখনও মনে ভিড় করলো কনডেম সেলে থাকা কোন খুনের দায়ে ফাসির আসামী’র কথা যে বহুদিন আকাশ দেখেনি। শিবলি ভাই তখনই শোয়া থেকে উঠে বসলেন। হুট করে কাগজ কলম নিয়ে লিখতে থাকলেন।

দিন রাত এখানে থমকে গেছে

কনডেম সেলের পাথর দেয়ালে

প্রতি নিঃশ্বাসে মৃত্যুর দিন আমি গুনছি

শোন জেল থেকে আমি বলছি

এভাবে এক লাইন লিখেন আর গুনগুন করে নিজের মতো করে গাইতে থাকলেন। পাঁচ মিনিট পর লেখা যখন থামলো তখন আবার সেই লিখাটা টেবিলে উপর রেখে দু’হাত দিয়ে টেবিল বাজিয়ে নিজের মতো করে গাইতে গাইতে সুর ঠিক করে ফেলেন। মাত্র পাঁচ মিনিটেই একটি গান লিখা ও সুর করা হয়ে গেলো। পরবর্তীতে এই গানটি হয়ে যায় বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসের একটা অংশ।

গানটি যেদিন লিখেন ও সুর করেন তখন পর্যন্ত গানটির শিল্পী জেমস এর সাথে শিবলী ভাইয়ের পরিচয় নেই। কেউ কাউকে তখনও চিনেন না। পরের দিন সকালে গ্রিন রোড এর একটি টং দোকানে বসে শিবলী ভাই চা নাস্তার অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করছিলেন আর টেবিলে হাত দিয়ে বাজিয়ে গানটি গুনগুন করছেন।

সেই সময়ে সেখানে ঢুকলেন জেমস এর পূর্ব পরিচিত ও অথিতি ড্রামার শহীদ মাহমুদ ভাই। যিনি শিবলি ভাইকে আগে থেকে চিনতেন। শিবলি ভাইকে গাইতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিরে শিবলী? এটা কার গান গাচ্ছিস?’

গীতিকার ও সুরকার লতিফুল ইসলাম শিবলি

শহীদ ভাইয়ের কথা শুনে শিবলি ভাই হো হো করে হেসে উঠে বললেন, ‘শহীদ ভাই এটা কারো গান না। কেউ গায়নি এখনও। আমি লিখেছি তাই আমিই গাইছি।’ শিবলী ভাইয়ের কথা শুনে শহীদ ভাইয়ের গান টি পছন্দ হয়ে যায়। উনি তখন শিবলী ভাইয়ের কাছ থেকে গানটি নিজের আগামী অ্যালবামের জন্য চেয়ে নিলেন।

শিবলী ভাইও হাসিমুখে দিয়ে দিলেন শহীদ ভাইকে গানটি। গানটি নিয়ে শহীদ ভাই প্র্যাকটিসে গিয়ে জেমস কে দেখালে জেমস গানটি শহীদ ভাইকে গাইতে নিষেধ করে দেন। কারন গানটি জেমস এর পছন্দ হয়েছে । তাই জেমস শহীদ এর গানটি নিজের ব্যান্ড ‘ফিলিংস’ এর আগামী অ্যালবামে রাখতে চাইছেন। গানটি দেখেই শহীদ ভাইকে বললেন, ‘এটা কার লিখা গান? ছেলেটাকে একবার আমার কাছে নিয়ে এসো। পরিচয় করিয়ে দিও। কথা আছে তাঁর সাথে।’

শহীদ ভাইও জেমস অনুরোধ ফেলতে পারেননি। তাই দিয়ে দিলেন গানটা ‘ফিলিংস’ ও জেমস এর হাতে। পরেরদিন জেমস এর বাসায় শহীদ ভাই নিয়ে গেলে গানটির গীতিকার লতিফুল ইসলাম শিবলীকে। শিবলী ও জেমস এর সেই প্রথম পরিচয়। সেই প্রথম গান দেয়া এবং সেদিনই নতুন অ্যালবাম এর জন্য আরও গান থাকলে দিতে বললেন।

জেমস ও ফিলিংস ব্যান্ড

এরপর একে একে সেই ‘জেল থেকে বলছি’ অ্যালবাম এ ঠাই করে নিলো একেবারে নতুন একজনের একাধিক গান যেগুলো হলো ‘নীলাকাশ যতদূর দেখা যায়’, ‘প্রানের শহর ঢাকা’, ‘পেশাদার খুনি’ ‘জোসি প্রেম’ গানগুলো। যার সবগুলো গানই হিট হয়েছিল আর হিট হয়েছিল ‘ফিলিংস’ ও জেমস । সারা বাংলাদেশে তখন চারিদিকে ‘জেল থেকে বলছি’ আর জেমস এর ঝড় শুরু হয়ে গেলো। সেই জেমস আজ ইতিহাসের পাতায়।

গানটি গীতিকার লতিফুল ইসলাম শিবলী ভাই লিখেন মুলত ৯০ দশকের শুরুতে ছাত্রবস্থায় ঢাকায় আসার পর। তবে গানটির প্রেক্ষাপট তারও অনেক আগের। যে সময়টা ছিল ‘স্বৈরাচার বিরোধী’ আন্দোলনের অগ্নিঝরা সময়। ১৯৮৭ সাল, শিবলী ভাই তখন নাটোর কজেজের উচ্চ মাধ্যমিক এর ছাত্র। একদিকে ভাবুক মন আর অন্যদিকে রক্ত টগবগ করা জ্বলে উঠার বারুদ দুটোই নিয়েই বেশ ছিলেন। সেই উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময়ে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে পড়েন।

কলেজের মাঠে, রাস্তাঘাটে তৎকালীন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে মিছিলে শ্লোগানে মুখরিত করছেন শিবলী ভাই। চোখের সামনে দিয়ে মিছিল যেতে দেখলেই আর রক্ষা নাই, দৌড়ে গিয়ে মিছিলে যোগ দিতেন। শিবলী ভাইয়ের সক্রিয় ভুমিকা দেখে অল্প দিনেই তিনি কলেজের একজন তুখোড় ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলেন।

যার ফলে সেই সময়ে নাটোর কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবলী ভাইকে সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মনোনয়ন দেয়া হয় যার মুল পরিষদ ছিল সরকার বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো। নির্বাচনের আগের দিন কলেজ থেকে আরও বিরোধী নেতাকর্মীদের সাথে শিবলী ভাইকেও পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। কবি ও ছাত্রনেতা শিবলী ভাই তখন জেলে।

জেলের এক কামরায় ঠাসাঠাসি করে জড়সড় হয়ে সবাই বসে আছেন। তবু স্বৈরাচারের সাথে কিছুতেই হাত মেলাবেন না। সকাল হলেই নির্বাচন অথচ সকল প্রার্থী ও কর্মীরা জেলে। সেই সময়ে জেলে কলেজের সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ব্যনারে একদল ছাত্রছাত্রী এলেন সবাইক দেখতে। কিভাবে নির্বাচনে জিতবেন সেটা নিয়ে ভাবছেন। সবার চোখে মুখে অন্ধকার। শিবলী ভাই ও উনার বন্ধুদের সাথে জেলে তখন একই দলের আরেক বড় ভাই ও সিনিয়র ছাত্রনেতাও ছিলেন যিনি শিবলী ভাইদের নেতৃত্ব দিতেন।

বড় ভাই সহ সবাই আলোচনা করে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের হাতে শিবলী ভাই একটা চিঠির মতো লিখে সবার কাছে ভোট চেয়ে আকুল আবেদন লিখে কাগজটা ধরিয়ে দিলেন যার শিরোনাম ছিল ‘জেল থেকে বলছি’। শিবলী ভাইয়ের হাতে লিখা সেই ‘জেল থেকে বলছি’ শিরোনামে আকুল আবেদন এর কথাগুলো সেদিন রাতেই পুরো নাটোর জুড়ে রাস্তা ঘাটে, কলেজ প্রাঙ্গনে পোস্টার হিসেবে ছড়িয়ে গেলো।

সকাল বেলায় যা দেখে পুরো নাটোরবাসি অবাক। সেই আবেদনে সারা দিয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা শিবলি ভাই ও তাঁর পরিষদ/প্যানেল কে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করালেন। সেই নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায় সভাপতি, সাধারন সম্পাদক এর প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে বিজয়ী প্যানেলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক লতিফুল ইসলাম শিবলী সর্বাধিক ভোট পেয়েছেন। সেদিনের সেই শিবলির মনে রয়ে যায় ‘জেল থেকে বলছি’ শিরোনামের চিঠিটি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।