মেথর পট্টি থেকে উঠে আসা এক ভিলেন

দশাসই একটা শরীর, কৃষ্ণবর্ণ। মাথায় একটাও চুল নেই। ঠোটের কোণে নিষ্ঠুর এক হাসি। এটুকু বর্ণনাতেই বোঝা যায় যে নিখাঁদ এক নেতিবাচক চরিত্রের কথা বলা হচ্ছে। তিনি হলেন বাবুল গোমেজ।

নামটা শুনলে খটকা লাগার কথা। বাবুল গোমেজ নামের কেউ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আসেননি। যদি বলি ‘জাম্বু’? নিশ্চয়ই এবার সবাই চিনতে পেরেছেন। জাম্বু ঢাকার সিনেমার খুব পরিচিত মুখ। টাকার বিনিময়ে কাউকে খুন করতে হবে? জাম্বু হাজির। একটা সময় তাকে দেখা মাত্রই চিনে ফেলতো সবাই। ‘ছেড়ে দে শয়তান, ঘরে কি মা বোন নেই’ – এই সংলাপটা সবচেয়ে বেশি সম্ভবত জাম্বুকেই শুনতে হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে মোটা মানুষ মাত্রই তাই ‘জাম্বু’ বলে ডাকার একটা রেওয়াজ ছিল।

জাম্বুর ক্যারিয়ারের সময়কাল বেশ দীর্ঘ। সাদাকালো যুগ থেকে শুরু করে রঙিন যুগ অবধি তিনি কাজ করে গেছেন। পরিচিত মুখ হলেও খুব বড় মাপের চরিত্র খুব কমই পেতেন তিনি। জাম্বু সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন মূল খল-নায়কের ‘ডান হাত’ বা সহকারী হিসেবে।

নায়িকাকে তুলে আনতে হবে, কে যাবে? অবশ্যই জাম্বু! বস্তি উচ্ছেদ করতে হবে? এবারো কাজটা জাম্বুই করবে। কারণ, তাঁর চেহারা, দৃষ্টি কিংবা কণ্ঠস্বর – সব কিছুতেই ছিল ভয়। ফলে ভীতিকর কাজগুলো করার জন্য তাঁর ‍জুড়ি ওই সময় পাওয়া কঠিন ছিল। বড় কোনো চরিত্র না করলেও তিনি সিনেমাগুলোতে ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ হিসেবে থাকতেন। ভিলেনের দলে জাম্বু না থাকলে যেন, ভিলেনদের খুব একটা প্রতাপশালী বলে মনেই হত না।

জাম্বুর ছবির সংখ্যাও বিস্তর। ঘাতক, কালিয়া, বন্ধু, সাজা, দোস্ত দুশমন, রাখাল রাজা, নয়নের আলো, বজ্রপাত, খুনের বদলা, অঙ্গার, বিপ্লব, যোদ্ধা, অভিযান, উসিলা, নিষ্পাপ, অমর, মৃত্যুদণ্ড, জ্যোতি, সাথী, মূর্খ মানব, দেন মোহর, প্রেম দিওয়ানা, চাকর, ববি, রাজলক্ষী শ্রীকান্ত, দায়ী কে, মিস লংকা, সাগরিকা, নির্মম, আত্মরক্ষা, পরিবার, সন্ত্রাস, অতিক্রম, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, উত্থান পতন, নয়নমণি, হাবিলদার, বিজয়, ঝুমুর, গোলাবারুদ, বাঘা বাঘিনী, সমর, অপরাজিত নায়ক, আপোষ, বিজলী তুফান, মাটির ফুল, পালকি, রুবেল আমার নাম, আঁচল বন্দী, টাইগার, বনের রাজা টারজান, হিরো, রাজাবাবু, নয়া লায়লা নয়া মজনু, শিকার, শত্রু ধ্বংস, আত্মত্যাগ,  সাগর ভাসা, এক মুঠো ভাত, রক্তের দাগ, শীষনাগ, সেলিম জাভেদ, হাসান তারেক, নির্দোষ, মোহাম্মদ আলী, ধর্ম আমার মা, ডাকাত, নবাব, রাস্তা, রাস্তার রাজা, রকি’র মত ছবিতে কাজ করেছিলেন তিনি।

সিনেমাগুলোতে জাম্বুর কাজ ছিল মূলত দুটো – মূল ভিলেনের নির্দেশ মেনে কোনো একটা কাজ করা। কিংবা নায়কের হাতে মার খাওয়া। প্রায়ই দেখা যেত, ভিলেনের দেওয়া অ্যাসাইনমেন্ট অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে ব্যর্থ হওয়ায় মৃত্যুর পথ বেছে নিতে হচ্ছে তাঁকে। আসলে তার কোনো রেহাই ছিল না। হয় নায়ক মারবেন, না হয় ভিলেন – জাম্বুর মৃত্যু ছিল অবধারিত এক ব্যাপার।

জাম্বু সবচেয়ে বেশি মার সম্ভবত খেয়েছেন জসিমের কাছে। জসিমের মার খেয়ে জাম্বু আছড়ে পড়বেন, আর দর্শক শিষ বাজাবে – একটা সময় দেশের হলগুলোতে এটা নিয়মিত এক দৃশ্য ছিল। এই জুটি এক সাথে ‘হিরো’, ‘রকি’, ‘মোহাম্মদ আলী’ ইত্যাদি ছবি করে।

সিনেমাভূবনে জাম্বুর উল্লেখ্যযোগ্য চরিত্রের প্রসঙ্গ উঠলে প্রথমেই বলতে হবে `রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’র কথা। এখানে তিনি ছিলেন মোহাম্মদী বেগের চরিত্রে। চরিত্রটি আলোচিত হয়, কারণ তাঁর হাতেই খুন হন স্বয়ং সিরাজউদ্দৌলা। ১৯৮৭ সালের ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ ছবিতে করেছেন অর্জুন সিংয়ের চরিত্র।

নেতিবাচক চরিত্রের ছক ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা খুব কমই করেছেন জাম্বু। ইতিবাচক চরিত্রে তাই তার কাজ সর্বসাকুল্যে একটি। ছবির নাম ‘আত্মরক্ষা’।

জাম্বুর জীবনের গল্পটাকে কেউ চাইলে অনুপ্রেরণা হিসেবেও নিতে পারেন। তাঁর জন্ম ১৯৪৪ সালের, ঢাকার মানিকগঞ্জে। তিনি দিনাজপুরের পার্বতীপুর এলাকার মেথরপট্টিতে থাকাতেন। করতেন শ্রমিকের কাজ। কাজের সন্ধানেই এসেছিলেন ঢাকায়। জীবনের নানা বাঁকে কতই না ‘চমক’ অপেক্ষা করে।

কে জানতো, সেই ঢাকাই আসাটাই বদলে দেবে বাবুল গোমেজের জীবন। সিনেমায় নাম লিখিয়ে বাবুল হয়ে উঠলেন জাম্বু। একটা সময় হয়ে উঠলেন অপরিহার্য্য এক ভিলেন।

জাম্বুকে হয়তো বাংলা সিনেমার ইতিহাসে কিংবদন্তিদের কাতারে রাখা যাবে না। কারণ, তাঁর অধিকাংশ কাজই একই ঘরানার। তবে, তিনি দক্ষ একজন অভিনেতা ছিলেন। প্রতিটা কাজে তার নিজস্ব একটা সিগনেচার থাকতো। যত অল্প সময়ই স্ক্রিনে থাকতেন, চমকে দিতে জানতেন।

জাম্বু মারা যান ২০০৪ সালের, তিন মে। চলচ্চিত্র জগতের কতজনকে নিয়েই কত আহা-উহু হয়, আক্ষেপ হয়। জাম্বুকে নিয়ে তেমন কিছু শোনা যায় না কখনও!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।