বিশ্ব ময়দানে বাংলাদেশকে গর্বিত করা বিজ্ঞানী

মহাবিশ্বের উৎপত্তি কিভাবে হয়েছিল সে সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি ৷ বিগ ব্যাং বা বৃহৎ বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্ব তথা পদার্থ, সময় কিংবা স্থানের জন্ম ৷ সে মহাবিশ্ব আজ ধারণ করে আছে লক্ষ কোটি নক্ষত্র, গ্রহ, নীহারিকা, ধুমকেতু৷

আইনবিদ থেকে বিজ্ঞানী বনে যাওয়া এডুইন হাবল ১৯২৯ সালে তাঁর ১০০” টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণ করে প্রমাণ করে দিলেন যে মহাবিশ্ব ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে৷ এ আবিষ্কারের পর থেকেই বিজ্ঞানীরা জানেন যে মহাবিশ্ব প্রতিমুহূর্তে প্রসারিত হচ্ছে, বিগ ব্যাংয়ের পর থেকে যার শুরু৷ এ থেকে মনে একটা প্রশ্ন জাগে, কি হবে মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি? তা কি প্রসারিত হতে হতে অসীম পাণে ধেয়ে চলবে নাকি গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যবর্তী মহাকর্ষ বলের প্রভাবে একদিন এই প্রসারণ থেমে গিয়ে ক্রমশ সংকোচন শুরু হবে? এই দুটি সম্ভাব্য ফলাফলের উপরই মহাবিশ্বের পরিণতি নির্ভর করছে৷

কি ঘটবে মহাবিশ্বের ভাগ্যে তা নির্ভর করে যে বিষয়ের উপর তা হলো ‘ক্রান্তি ঘনত্ব’৷ ক্রান্তি ঘনত্বের উপর নির্ভর করে মহাবিশ্বের দুটি পরিণতি ব্যাখ্যা করা যায়৷ প্রথমত – মহাবিশ্ব যেরকম প্রসারিত হচ্ছে তা চলতে থাকবে এবং এ ধরণের মহাবিশ্বকে বলা হয় উন্মুক্ত বা সীমাহীন মহাবিশ্ব (Open Universe)৷ দ্বিতীয়ত- মহাবিশ্বের প্রসারণ একসময় থেমে গিয়ে সংকোচন শুরু হবে আর এ ধরণের মহাবিশ্বকে বলা হয় বদ্ধ মহাবিশ্ব (Closed Universe)৷

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এসকল কথাবার্তা গুলোকে খুব সহজ মনে হলেও কয়েক দশক আগে কথাগুলো কাল্পনিক শুনাতো এবংএই তত্ত্বগুলো প্রতিষ্ঠিত করতে বিজ্ঞানীদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়েছে৷ মহাবিশ্বের কপালে কোন ধরণের পরিণতি আছে তা বুঝতে বলে তিনটি ধ্রুবকের নিখুত মান ও তাদের মধ্যকার সম্পর্ক জানতে হয় সেগুলো হল – হাবলের ধ্রুবক, ল্যামডা ও ওমেগা৷

এগুলো জানতে বিজ্ঞানীরা যখন মাথার চুল ছিড়ছেন তখন ১৯৭৭ সালে জ্যোতির্বিদ্যার বিখ্যাত ম্যাগাজিন ‘স্কাই এন্ড টেলিস্কোপ’ এ বেরোয় ‘দ্য পসিবল আল্টিমেট ফেট অব ইউনিভার্স’ গবেষণাপত্রটি৷ গাণিতিক যুক্তির মাধ্যমে মহাবিশ্বের সম্ভাব্য পরিণতির কথা তুলে ধরেন একজন বিজ্ঞানী৷ মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে অনেক গবেষণা থাকলেও তার পরিণতি নিয়ে এই প্রথম কেউ গানিতিকভাবে গবেষণাপত্র প্রকাশ করে৷ লেখা বেরোনোর পর পরই চারদিকে হই হই রব উঠে যায়৷

বিশ্বের তাবৎ বিজ্ঞানীদের জন্য গবেষণার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়৷ ‘স্কাই এন্ড টেলিস্কোপ’ম্যাগাজিন সে বিজ্ঞানীকে অনুরোধ করে লেখাটি সাধারণের পাঠের উপযোগী করে বই আকারে লেখার জন্য৷ তিনি তা করেন এবং ১৯৮৩ সালে ‘ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস’ সেই বইটি প্রকাশ করে ‘দ্য আল্টিমেট ফেট অব ইউনিভার্স’ নামে৷

প্রকাশের সাথে সাথেই পাঠক মহলে বইটি সমাদৃত হয় এবং অল্পসময়ের মধ্যে স্প্যানিশ, ফরাসি, পুর্তগিজ, ইতালিয়ান, জার্মান, ক্রোয়েট, সার্বসহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হতে থাকে৷ আমেরিকার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেই বই পাঠ্যপুস্তক হিসেবে পড়ানো শুরু করে৷ তার পেছনে অবশ্য কারণ আছে৷ বইটি যখন বেরোয় তখন মূলধারার জ্যোতির্পদার্থবিদদের লেখা বই বাজারে দুর্লভ। স্টিফেন হকিং, পল ডেভিস, শন ক্যারল, ব্রায়ান গ্রিনরা তখনো বই লেখায় হাত দেননি।

মহাবিশ্বের রহস্য নিয়ে একমাত্র অবলম্বন ছিল স্টিভেন ওয়েনবার্গের লেখা ‘দ্য ফার্স্ট থ্রি মিনিটস’। তবে সেটা মহাবিশ্বের শুরুর দিককার রহস্য নিয়ে। মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি নিয়ে বিজ্ঞানীদের লেখা বই বাজারে ছিলই না বলা যায়। সেই অভাব প্রথমবারের মত পূর্ণ করেছিল বইটি। বইটির তথ্য, বিষয়বস্তু, জনবোধ্যতা এবং সাবলীলতার প্রেক্ষিতে বইটি এদিকে যেমন পাঠকসমাজে দারুণভাবে সমাদৃত হয় অন্যদিকে ভাবনার খোরাক যুগিয়েছিল বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদেরও।

এই বইয়ের পাণ্ডুলিপি পড়ে সুচিন্তিত মতামত দিয়েছিলেন স্টিফেন হকিং, জয়ন্ত নারলিকার, সায়মন মিটন, জি সি টেলর এবং মার্টিন রীসের মত লব্ধ প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীরা। এ বই আরেক প্রতিভাবান বিজ্ঞানীকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করেছিল সে সময়। তিনি ফ্রিম্যান ডাইসন। ডাইসন একটি গুরুত্বপূর্ণ পেপার প্রকাশ করেন ‘সীমাহীন সময়: পদার্থবিদ্যা এবং জীববিদ্যা উন্মুক্ত মহাবিশ্বে’ শিরোনামে। পেপারটিতে একটা বড় অংশ জুড়ে ‘দ্য আল্টিমেট ফেট অব ইউনিভার্স’ বইয়ের উদ্ধৃতি ছিল৷

বস্তুত এই বই এবং ফ্রিম্যান ডাইসনের প্রথমদিককার কাজগুলোই যে পরবর্তী বিজ্ঞানীদের মহাবিশ্বের পরিণতি নিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করার খোরাক যুগিয়েছিল তার উল্লেখ পাওয়া যায় সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনের ১৯৯৯ সালের নভেম্বর সংখ্যায়। ‘মহাবিশ্বে জীবনের পরিণতি’ শীর্ষক এই রচনায় বিজ্ঞানী লরেন্স ক্রাউস এবং গ্লেন স্টার্কম্যান বলেন, ‘বিগত শতকের সময়গুলোতে বিজ্ঞানীদের দার্শনিক অভিব্যক্তি আশাবাদ আর নৈরাশ্যবাদের দোলাচলে দুলছিল। ডারউইনের আত্মবিশ্বাসী ভবিষ্যদ্বাণীর খুব বেশিদিন পরে নয় – ভিক্টোরিয়ান যুগের বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের ‘তাপীয় মৃত্যু’ (heat death) নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে শুরু করেছিলেন – যখন তারা বুঝতে শুরু করেছিলেন যে সমগ্র মহাবিশ্ব একটা সময় সাধারণ তাপমাত্রায় এসে পৌঁছবে, যার পর কোনকিছুরই আর পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু বিশের দশকে মহাবিশ্বের প্রসারণের ব্যাপারটা আবিষ্কৃত হবার পর থেকে বিজ্ঞানীদের উদ্বিগ্নতা একটু কমে আসে কারণ মহাবিশ্বের প্রসারণ সেই সাম্যাবস্থায় পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করে। সে সময় খুব কম সংখ্যক জ্যোতির্বিজ্ঞানীই প্রসারণশীল মহাবিশ্বে প্রাণের অন্যান্য ধারা নিয়ে চিন্তা করছিলেন, যতদিন পর্যন্ত না পদার্থবিদ ফ্রিম্যান ডাইসনের ১৯৭৯ সালে লেখা ক্লাসিক পেপারটা [‘সীমাহীন সময়: পদার্থবিদ্যা এবং জীববিদ্যা উন্মুক্ত মহাবিশ্বে’] প্রকাশিত হয়েছিল। ফ্রিম্যান ডাইসনের কাজ আবার প্রভাবিত হয়েছিল তার পূর্ববর্তী এক গবেষকের ‘দ্য আল্টিমেট ফেট অব ইউনিভার্স’ বইটি দ্বারা৷’

সহজেই বুঝা যাচ্ছে মহাকাশ গবেষণার দ্বার উন্মোচণে এই বই কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছিল৷ এখন আসি সেই বইয়ের লেখক প্রসংঙ্গে৷ বইটি লিখেছিলেন যিনি তাঁর নাম জামাল নজরুল ইসলাম৷ তিনি একজন বাঙালী ৷ তিনি একজন বাংলাদেশী৷ তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামে৷ বিশ্বগবেষণায় হৈচৈ ফেলে দেয়া এই বিজ্ঞানীর নাম আমরা কয়জন জানি? ক্যাটরিনা সকালে কি নাস্তা করেছে, রাতে কি দুঃস্বপ্ন দেখেছে সেই খবর দিয়ে পূর্ণ হয়ে থাকে আমাদের প্রধান প্রধান খবরের কাগজগুলো অথচ এতোবড় এক সম্পদের কথা প্রচার করতে আমাদের কত অনীহা৷

প্রচারবিমুখ এই মানুষটার নিভৃতচারীতার কারণে আমরা তার সম্পর্কে বেশি কিছু জানতে পারি না৷ যাঁরা মহৎ কর্মে ব্রতী হন, তাঁরা গলাবাজি না করে দেশ ও দশের কল্যাণ হয় এমন কাজে নিজেকে সঁপে দেন, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ তাদের চোখে তীব্র বেদনা সৃষ্টি করে৷ সারাজীবণ প্রচারবিমুখই থাকেন৷ তাঁরাই হন ক্ষণজন্মা৷ আজকের এই আয়োজনটি জামাল নজরুল ইসলামের পূণ্যস্মৃতির উদ্দেশ্যে তাঁর পদতলে নিবেদনের একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা৷

জামাল নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন ঝিনাইদহ জেলায় ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি৷ তাঁর বাবা মুহম্মদ সিরাজুল ইসলাম তৎকালীন জেলা মুন্সেফ( সাব জর্জ) ছিলেন৷ জন্মস্থান ঝিনাইদহ হলেও তাঁর শেকড়ের ঠিকানা চট্টগ্রাম৷ চার ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট৷ তাঁর মা ছিলেন সংগীতজ্ঞ ও সাহিত্যানুরাগী৷ রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ উর্দুতে অনুবাদ করে তাঁর মা অনেক প্রশংসা পেয়েছিলেন৷ কলকাতায় তাঁদের বাসায় কাজী নজরুল ইসলামের যাতায়াত ছিল , সেই কারণেই হয়তো তাঁর বাবা তাঁর নাম রাখেন জামাল নজরুল ইসলাম৷

তাঁর শিক্ষাজীবণ শুরু হয় কলকাতার মডেল স্কুলে৷ চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত তিনি এই স্কুলেই পড়েন৷ তারপর চলে আসেন চট্টগ্রামে৷ ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলিজিয়েট স্কুলে৷ স্কুলে বিশেষ কৃতীত্ব অর্জন করার ফলে প্রধান শিক্ষক তাঁর মেধায় মুদ্ধ হয়ে ডাবল প্রমোশন দিয়ে সোজা ষষ্ঠ শ্রেণীতে উৎত্তীর্ণ করেন৷ নবম শ্রেণী পর্যন্ত তিনি এই স্কুলেই পড়াশোনা করেন৷এখানে থাকাকালীনই তিনি জ্যামিতি প্রতি টান অনুভব করেন এবং নিজে নিজে প্রচুর জ্যামিতি সমাধান করতেন৷

তারপর পূর্বপাকিস্থান ছেড়ে চলে যান পশ্চিম পাকিস্থানে৷ সেখানে লরেন্স কলেজে ভর্তি হন৷ এই কলেজ থেকেই তিনি সিনিয়র কেমব্রিজ ও হায়ার সিনিয়র কেমব্রিজ পাশ করেন। সে সময় সিনিয়র কেমব্রিজ বলতে বর্তমানের ও লেভেল এবং হায়ার সিনিয়র কেমব্রিজ বলতে বর্তমানের এ লেভেল বোঝাতো। এ সময় নিজে নিজে অনেক অংক কষতেন। বিভিন্ন বই থেকে সমস্যা নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতেন যা পরবর্তীতে তার অনেক কাজে আসে। উল্লেখ্য, হায়ার সিনিয়র কেমব্রিজে তিনি একাই কেবল গণিত পড়েছিলেন। এটা বেশ উচ্চ পর্যায়ের গণিত হওয়ায় সবাই নিতে চাইতো না।

এ সময়ই গণিতের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। লরেন্স কলেজের পাঠ শেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়তে যান। এখান থেকে বিএসসি অনার্স করেন। এই কলেজের একজন শিক্ষককে তিনি নিজের প্রিয় শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই শিক্ষকের নাম ‘ফাদার গোরে’। গণিতের জটিল বিষয়গুলো খুব সহজে বুঝিয়ে দিতেন বলেই জামান নজরুল ইসলাম তার ভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি গোরের কাছে গণিতের বিভিন্ন বিষয় জানতে চাইতেন, গোরে আগ্রহভরে তা শেয়ার করতেন। গোরের সাথে এই সম্পর্কের কারণ বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘গণিতকে এমনিতেই অনেকে ভয় পেত। কিন্তু এটির প্রতিই ছিল আমার অসীম আগ্রহ, ঝোঁক। এ কারণেই বোধহয় তিনি আমাকে পছন্দ করতেন।’

বিএসসি শেষে ১৯৫৭ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। কেমব্রিজের প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান থেকে আবারও স্নাতক ডিগ্রি (১৯৫৯) অর্জন করেন। তারপর এখান থেকেই মাস্টার্স (১৯৬০) ডিগ্রি লাভ করেন৷ ১৯৬৪ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

সাধারণত একাডেমিক লাইনে থাকলে পিএচডি করাই যথেষ্ট, এর বেশি কিছু করার দরকার পরে না। পরে না যদি না তিনি জামাল নজরুল ইসলামের মতো কেউ না হন। ১৯৮২ সালে অর্জন করেন ডিএসসি বা ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রী, যেই ডিগ্রী সারা পৃথিবীতেই খুব কম সংখ্যক বিজ্ঞানী অর্জন করতে পেরেছেন। অবশ্য কৃতবিদ্য এই অধ্যাপকের একাডেমিক অঙ্গনে সাফল্যের ব্যাপারটা ধরা পড়েছিল অনেক আগেই। সেই যে, ১৯৫৭ সালে কলকাতা থেকে অনার্স শেষ করে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে গণিতশাস্ত্রে ট্রাইপস করতে গিয়েছিলেন। তিন বছরের কোর্স, উনি সেটা দুই বছরেই উনি শেষ করে ফেলেন।

ভারতের বিখ্যাত জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী জয়ন্ত নারলিকার যার নাম ফ্রেডরিক হয়েলের সাথে উচ্চারিত হয় ‘হয়েল নারলিকার তত্ত্ব’-এর কারণে, তিনি সেখানে নজরুল ইসলামের সহপাঠী ছিলেন। পরবর্তীতে কর্মক্ষেত্রে তার বন্ধু তালিকায় যুক্ত হয়েছিলেন নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ব্রায়ান জোসেফসন, স্টিফেন হকিং আব্দুস সালাম এবং রিচার্ড ফাইনমেন এর মত বিজ্ঞানীরা। ফাইনমেন তাকে তার নিজের বাড়িতে দাওয়াত করেও খাইয়েছিলেন, বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে উপহার দিয়েছিলেন একটা মেক্সিকান নকশিকাঁথাও।অবশ্য কার সাথে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল আর না ছিল সেটা তাকে পরিচিত করেছে ভাবলে ভুল হবে। তিনি পরিচিত ছিলেন নিজের যোগ্যতাবলেই।

পিএইচডি শেষ করে তিনি দুবছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড-এ কাজ করেন। মাঝে কাজ করেছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার বিশ্বখ্যাত ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবেও। ১৯৭৮ সালে লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটিতে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং পরে রিডার পদে উন্নীত হন।

তিনি পঞ্চাশটারও বেশি গবেষণা-পত্র এবং কিছু বৈজ্ঞানিক বই লিখেছেন । গবেষণা-পত্রগুলো অধিকাংশই প্রকাশিত হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান জার্নালসমূহে।বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণার জন্য লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটি এক অনন্য নাম। রয়্যাল সোসাইটির প্রসিডিংসয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করা মানে আক্ষরিক অর্থেই রাজকীয় কাজ সম্পন্ন করা। জামাল নজরুল ইসলাম এই প্রসিডিংসয়ে ধারাবাহিকভাবে পরপর ছয়টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এখানে গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে গেলে আবার রয়্যাল সোসাইটির কোনো ফেলো সদস্যের রিকমেন্ডেশন লাগে। জামাল নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে রিকমেন্ডেশন করেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং ও ফ্রেড হয়েল। একবার ভাবুন তো কি বিখ্যাত ব্যক্তিদের দ্বারা ব্যাপৃত ছিলেন তিনি!

কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন তিনি আইনস্টাইনের জেনারেল থিউরি অব রিয়েলেটিবিটি নিয়ে কাজ করা শুরু করেছেন৷ টানা চল্লিশ বছর ধরে তিনি একাজ করেন৷ এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার মত এত দীর্ঘ সময় ধরে, প্রায় ৪০ বছর, আর কেউ আইনস্টাইন-উত্থাপিত এই সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করছেন বলে আমার জানা নেই।’

১৯৮৪ সালে তিনি একটা বড় সিদ্ধান্ত নিলেন। জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তগুলোর একটি। বিলেত আমেরিকার লক্ষ টাকা বেতনের লোভনীয় চাকরি, গবেষণার অফুরন্ত সুযোগ, আর নিশ্চিত নিপাট জীবন সব ছেড়ে ছুড়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিধ্যালয়ে তিন হাজার টাকার প্রফেসর পদে এসে যোগ দিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রথম দিকে এমনকি এই তিন হাজার টাকা দিতেও গড়িমসি করেছিল। তারা বেতন সাব্যস্ত করেছিল আটশ টাকা।

কিন্তু তারপরেও পাশ্চাত্য চাকচিক্য আর ডলার-পাউন্ডের মোহকে হেলায় সরিয়ে দিয়ে অধ্যাপক নজরুল বিলেতের বাড়ি ঘর জায়গা জমি বেঁচে চলে আসলেন বাংলাদেশে। দেশটাকে বড়ই ভালবাসতেন তিনি। তিনি নিজেই একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘স্থায়ীভাবে বিদেশে থাকার চিন্তা আমার কখনোই ছিল না। দেশে ফিরে আসার চিন্তাটা প্রথম থেকেই আমার মধ্যে ছিল, এটার ভিন্নতা ঘটে নি কখনোই। আরেকটা দিক হল, বিদেশে আপনি যতই ভালো থাকুন না কেন, নিজের দেশে নিজের মানুষের মধ্যে আপনার যে গ্রহণযোগ্যতা এবং অবস্থান সেটা বিদেশে কখনোই সম্ভব না।’

তার দেশপ্রেমের নিদর্শন ১৯৭১ সালেও তিনি দিয়েছেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র জনগণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, নির্বিচারে হত্যা খুন ধর্ষণে মত্ত হয়েছিল, তখন পাক-বাহিনীর এই আক্রমণ বন্ধের উদ্যোগ নিতে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠিও লিখেছিলেন।

দেশে ফিরে বিজ্ঞানের উন্নয়নের জন্য অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম কাজ করে গেছেন নিরলসভাবে। শুধু বিজ্ঞানেই তাঁর অবদান ছিল না, তিনি কাজ করেছেন দারিদ্র দূরীকরণে, শিল্প ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করেছেন। তিনি মনে করতেন, আমাদের দেশটা যেহেতু কৃষিনির্ভর, তাই, আমাদের শিল্পনীতি হওয়া চাই ‘কৃষিভিত্তিক, শ্রমঘন, কুটিরশিল্প-প্রধান’ এবং ‘প্রধানত দেশজ কাঁচামাল-নির্ভর’।

তিনি বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ-এর ক্ষতিকারক প্রেসক্রিপশন বাদ দিয়ে নিজেদের প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটা সুষ্ঠু শিল্পনীতির প্রতি সবসময় গুরুত্ব দিতেন। পাশ্চাত্য সাহায্যের ব্যাপারে তার একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, ‘তোমরা শুধু আমাদের পথ থেকে সরে দাঁড়াও, আমাদের ভালোমন্দ আমাদেরকেই ভাবতে দাও। আমি মনে করি, এটাই সর্বপ্রথম প্রয়োজনীয়।’

অনেকে আছেন যারা বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার কথা শুনলেই নাক সিটকান। ভাবেন, উচ্চতর গবেষণা হতে পারে কেবল ইংরেজিতেই। জামাল নজরুল ইসলাম সেধরণের মানসিকতা সমর্থন করতেন না।পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত একটি কলামে তিনি বলেছেন, ‘অনেকের ধারণা, ভাল ইংরেজি না জানলে বিজ্ঞানচর্চা করা যাবে না। এটি ভুল ধারণা। মাতৃভাষায়ও ভাল বিজ্ঞান চর্চা ও উচ্চতর গবেষণা হতে পারে। বাংলায় বিজ্ঞানের অনেক ভাল বই রয়েছে। আমি নিজেও বিজ্ঞানের অনেক প্রবন্ধ লিখেছি বাংলায়। এদেশে বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করেন এমন অনেকেই বাংলায় বই লিখেছেন এবং লিখছেন। তাদের বই পড়তে তেমন কারও অসুবিধা হয়েছে বলে মনে হয় না। সুতরাং বাংলায় বিজ্ঞানচর্চাটা গুরুত্বপূর্ণ।’

বাংলা ভাষায় তিনি ‘কৃষ্ণ বিবর’ বইটি লেখেন, বাংলা একাডেমি প্রকাশ করে৷ ‘মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা’ নামে আরো একটি বই পাওয়া যায়৷ ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে তাঁর আরো কয়েকটি বই বেরোয় – ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি’, ‘রোটেটিং ফিল্ড ইন জেনারেল রিলেটিভিটি’ ও ‘ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি’।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান ও গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চতর গবেষণার জন্য ‘রিসার্চ সেন্টার ফর ম্যাথমেটিক্যাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্স (আরসিএমপিএস) গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন৷ এই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সেমিনারে তিনি নিয়ে আসতেন বিশ্বের প্রথিতযশা বিজ্ঞানীদের। একবার এখানেরই এক সেমিনারে নোবেলবিজয়ী পাকিস্থানী বিজ্ঞানী ড. আব্দুস সালাম বলেছিলেন, ‘আমার পরে যদি পদার্থবিজ্ঞানে এশিয়াতে কেউ নোবেল পাবার যোগ্য হয় তবে সেটা জামাল নজরুল ইসলাম।’

অবসর সময়ে তিনি প্রচুর বই পড়তেন৷ তাঁর আরেকটি গুন ছিল৷ সংগীতের প্রতি ছিল অসীম টান৷ পিয়ানো বাঁজাতে পছন্দ করতেন৷ রবীন্দ্রসংগীতের ভক্ত ছিলেন৷ অবসর পেলেই পিয়ানেতে রবীন্দ্রসংগীতের সুর তুলতেন৷

জীবদ্দশায় অনেক পুরষ্কার পেয়েছেন এই গুণী মানুষটি। বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি ১৯৮৫ সালে তাঁকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। ১৯৯৪ সালে তিনি ন্যাশনাল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি মেডেল পান। ১৯৯৮ সালে ইতালির আবদুস সালাম সেন্টার ফর থিওরিটিকাল ফিজিক্সে থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্স অনুষ্ঠানে তাঁকে মেডাল লেকচার পদক দেয়া হয়। তিনি ২০০০ সালে কাজী মাহবুবুল্লাহ এন্ড জেবুন্নেছা পদক পান। ২০০১ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ২০১১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর রাজ্জাক-শামসুন আজীবন সম্মাননা পদক লাভ করেন৷

২০১৩ সালের ১৬  মার্চ তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান না ফেরার দেশে৷ বাংলাদেশের অন্যতম এই বিজ্ঞানের প্রথিকৃত তাঁর অনবদ্য অবদানের জন্য বাংলাদেশের বিজ্ঞানজগতে বেঁচে থাকবেন যুগ থেকে যুগান্তরে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।