আমি ইতিহাস দেখেছি…

সালটা ২০০৯। তখন অষ্টম বা নবম শ্রেণীতে হয়তো পড়ি। তখন থেকেই ক্লাব ফুটবলের দিকে ঝুঁকে পড়া। রোনালদো-মেসির জয়রথের শুরুর সময় চলছে তখন। আর ব্রাজিলের সমর্থক হওয়ায় কাকার ফ্যান তো ছিলামই। কাকা-রোনালদো-মেসি এর খেলা দেখতেই লা লিগা দেখার শুরু আর সব মিলিয়ে কিছুদিনেই রিয়াল মাদ্রিদ কে ভালবেসে ফেলেছিলাম নিজের অজান্তেই।

এরপর কাকা চলে গেছেন ঠিকই আমি রিয়াল মাদ্রিদকে ছাড়তে পারিনি। এরপরের পাঁচ বছরের গল্প সবারই জানা। রিয়াল মাদ্রিদ বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল আর বার্সেলোনার চলছিল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সময়। তখন খালি জানতাম আমাদের সবচেয়ে বেশি চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফি আছে নয়টি। কিন্তু নিজের চোখে সেটি তখনও দেখিনি। সর্বশেষ যে সেই ট্রফি এসেছে ২০০২ সালে। এরপর মাদ্রিদ কে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও ১২ বছর। কিন্তু এরপরের পাঁচ বছরের চারটি ট্রফিই এসেছে আমাদের ঘরেই। তখন কি কেউ ভেবেছিল এটি সম্ভব।

২০১৪ সাল। রোনালদো, বেল, বেনজেমা, ডি মারিয়া, জাবি, ক্যাসিয়াস, রামোস, মার্সেলো এর সেই দলটি পুরো ফাইনাল ম্যাচ জুড়ে ভুগেছে অ্যাটলেটিকো’র কাছে। ৯২ মিনিট পর্যন্ত ১-০ তে পিছিয়ে থাকা দলটির ডিফেন্ডার রামোস ৯৩ মিনিটের হেডারে দলকে সমতায় ফেরান আর পরের ৩০ মিনিটে রিয়াল আরও তিনটি গোল দিয়ে জিতে নেয় তাদের প্রচুর আকাঙ্ক্ষিত দশম চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফি। আমার রিয়াল মাদ্রিদের প্রেমে পড়ার পর তাদের প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফি।

এরপর সময় গড়িয়েছে। পেরিয়েছে আরও চারটি বছর। ক্যাসিয়াস চলে গেছেন মাদ্রিদ ছেড়ে। আর আমাদের কাপ্তান হয়েছেন সেই রুপকথার নায়ক রামোস।

কিন্তু নায়কেরা তো একটি মাত্র গল্প লিখে দমে যান না। রামোস ও সেই রূপকথাকে আরও বড় করছেন আর করেই চলেছেন। ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮ পরপর তিন বছরে তিনটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফি ঘরে তুলেছেন অধিনায়ক।

এই জয়রথের শুরুটাও ছিল গোলমেলে। দশম শিরোপা জয়ের পর বিদায় নেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। আনচেলত্তির চলে যাওয়ার পর দায়িত্বে আসেন রাফা বেনিতেজ। ছন্নছাড়া রিয়াল মাদ্রিদ এর খেলা দেখে তখন এমন স্বপ্ন কল্পনাতেও আসেনাই। এরপর হুট করেই বেনিতেজের পরিবর্তে জিদান কে দায়িত্ব দিয়ে দেয়া হল যার আগে কোচিং অভিজ্ঞতা শূন্য। প্রথম কোচিং ক্যারিয়ার শুরুই করেছেন তিনি রাফা বেনিতেজের ছন্নছাড়া রিয়াল মাদ্রিদকে দিয়ে।

এরপর নানা ট্রল নানা মানুষের নানা কথা। কখনও কেউ বলছে সব বেল মাথাই পেপ গার্দিওলা নন। কেউ আবার বলছে এগারো নম্বর পেতে আরও ১২ বছর অপেক্ষা করতে হবে। সব ধারণা কে অমূলক প্রমাণ করে নিজের প্রথম মৌসুমেই জিতিয়ে দিলে চ্যাম্পিয়নস লিগ। তখন আবার বলা হল বিগিনারস লাক অর্থাৎ ভাগ্যের জোড়েই পেয়ে গেছেন তিনি।

কিন্তু এরপর? তিন মৌসুম ধরে রিয়াল মাদ্রিদের কোচ জিদান। তিন মৌসুমের তিনটিতেই চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন কোচ হয়ে। এই পর্যন্ত কোচ হিসেবে নক আউট হন নি চ্যাম্পিয়নস লিগে। যেই ইতিহাস আজ পর্যন্ত কোন কোচের নেই কোচ হিসেবে নিজের প্রথম তিন মৌসুমেই সেই রেকর্ড করে ফেলেছেন জিদান। পরপর তিন মৌসুমে ট্রফির হ্যাটট্রিক করেছেন তিনি। কি অনন্য অসাধারণ রেকর্ড!

কথা যখন বলছিলাম রিয়াল মাদ্রিদ আর চ্যাম্পিয়নস লিগ নিয়ে তখন রোনালদোর নাম না নিয়ে থাকা সম্ভব? রোনালদো আর যে টুর্নামেন্টে যেই ধরনের ফর্মেই থাকুক না কেন চ্যাম্পিয়নস লীগে এসে যেন তিনি অন্য জগতে চলে যান। এই টুর্নামেন্টের সবচাইতে সফল খেলোয়াড়ের নাম যদি বলি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো সমর্থক হিসেবে কি খুব পক্ষপাতিত্ব করা হবে আমার?

চ্যাম্পিয়নস ললিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা: রোনালদো (১২০)

চ্যাম্পিয়নস লীগের এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলদাতা: রোনালদো (১৭)

চ্যাম্পিয়নস লিগের এক বছরে সর্বোচ্চ গোলদাতাঃ রোনালদো (১৯)

সর্বোচ্চ সংখ্যকবার টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা: রোনালদো (৭)

ফাইনালে সর্বোচ্চ গোলদাতা: রোনালদো (পাঁচ ফাইনালে চার গোল)

সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয়ঃ রোনালদো ৯৭ টি

সবচেয়ে বেশি ট্রফি জয়ঃ রোনালদো (পাঁচটি)

সবচাইতে বেশি দলের হয়ে ফাইনালে গোলদাতা: ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ২০০৮, রিয়াল মাদ্রিদ ২০১৪, ২০১৭)

একজন খেলোয়াড় হিসেবে এই টুর্নামেন্ট থেকে আর কি অর্জনের বাকি আছে তাঁর? ২০১২ সালে পেনাল্টি মিস করে এই টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়ার পর রোনালদো মাদ্রিদ সমর্থকদের বলেছিলেন তোমাদের আমার কাছ থেকে একটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফি পাওনা আছে আমি তোমাদের এটি দেব। এরপরে রোনালদো প্রতিবার টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ৪টি ট্রফি জিতিয়েছেন মাদ্রিদ কে। তাঁর কাছ থেকেই বা সমর্থকদের আর কি চাওয়ার আছে?

সমর্থক হিসেবে শুরুর পাঁচটা বছর যেই আক্ষেপ বা অপূর্ণতায় ছিলাম পরের চার বছরে রিয়াল মাদ্রিদ তা পূরণ করে দিয়েছে কয়েক গুণেই। তারপরও হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের সময় বার বার আমাদের দশম শিরোপা জয়ের স্মৃতি ভেসে উঠছিল। রামোসের সেই গোল, ডি মারিয়ার অতিমানবীয় পারফর্ম্যান্স আর কানে ভেসে উঠছিল রিয়াল মাদ্রিদের সেই দশম শিরোপা জয়ী গান!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।