চিরসবুজ ইত্যাদি ও একজন হানিফ সংকেত

একসময় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান নামের একটা ব্যাপার ছিল। তার সর্বশেষ উদাহরণ ‘ইত্যাদি’।

হানিফ সংকেত নামের এক সেমি-ক্রিয়েটিভ লোক এই অনুষ্ঠানের প্রধান উদ্যোক্তা। টেলিভিশনে এই ইত্যাদির বয়স আজকে ৩০ বছর।

জনপ্রিয় অনুষ্ঠান এই ইত্যাদি মূলত পাঁচটা পর্বে বিভক্ত। নানা-নাতি, মামা-ভাগ্নে, বিদেশী ছবির বাংলা সংলাপ, দর্শক পর্ব এবং ইত্যাদির নিয়মিত শিল্পীদের পরিবেশনা। ইত্যাদির একটা নিজস্ব শিল্পিগোষ্ঠি আছে, সারাজীবন ধইরা তারাই এগুলা করতেছেন। এর বাইরেও কখনো কখনো নতুন কিছু আইটেম যোগ হয়।

এর ফাঁকে ফাঁকে মিডিয়ার বিভিন্ন সেলিব্রেটিদের দিয়া নাচ গান করানো হয়। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ থাকে শেষ গানটায়। সাধারনত লিটন অধিকারী রিন্টু ও আলী আকবর রূপু এই যৌথভাবে এই গানটা সৃষ্টি করেন।

এই ৩০ বছরে ইত্যাদির অ্যাচিভমেন্ট প্রচুর। একটা সময় মহল্লার দোকান পাট বন্ধ হইয়া যাইতো ইত্যাদির টাইম হইলে। রাস্তায় রিকশা গাড়ি চলতো কম। সকল কাজকর্ম বন্ধ রাইখা সকলে একসাথে বইসা ইত্যাদি দেখতে থাকতো।

এই ইত্যাদি প্রায়ই বিরল সব প্রতিভাবান লোকেদের খুঁইজা বাইর করতো। অনুষ্ঠানে দেখা যাইতেছে চ্যাঙড়া টাইপের এক লোক রেললাইনের উপর দিয়া আরামসে সাইকেল চালায়া চইলা যাইতেছে। লাল রঙের বালতি ভইরা পানি আনা হইছে, সেই পানি ভিত্রে থেকে তারতুর জোড়া লাগায়া বিদ্যুৎ উৎপন্ন কইরা ফিলিপসের বালব জ্বালায়া ফেলছে আরেকজন।

ইত্যাদি কিছু সেলিব্রেটিও তৈরি করছে অনুষ্ঠানগুলাতে। কন্ঠশিল্পী মমতাজ কিংবা কাঙ্গালিনি সুফিয়া কিংবা বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম এই ইত্যাদির মঞ্চেই প্রথমবারের মতো পর্দায় আসেন, যারা নিজগুনেই প্রতিভাবান ছিলেন, ইত্যাদির পর্দা তাদেরকে সারাদেশে জনপ্রিয় কইরা তুলছে।

রিকশাওয়ালা আকবর জনপ্রিয় হইছিলেন ইত্যাদিতে কিশোর কুমারের গলা নকল কইরা। প্রতিভার অভাবে হারায়া গেছে, ইত্যাদিতে এইরকম আরো অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে।

দুঃখের বিষয়, ইত্যাদির সেই গ্ল্যামার আজকে আর নাই। কিন্তু সাফল্য হইলো, ইত্যাদি এখনো আছে। আজকে ইউটিউবে অনেকগুলা পর্ব দেখলাম। অনুষ্ঠান পরিকল্পনায় সেই ১৯৮৯ সালের স্ট্যান্ডার্ড এখনো ধইরা রাখছে, একটুও বদলায় নাই।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একটা কথা প্রায়ই বলে, যদি কোন লোক সারাজীবন শুধু মাটি কাটেন, তাইলেও দেখা যাবে সে তার সারাজীবনে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট গর্ত আর সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট পাহাড় বানায়া ফেলছেন।

হানিফ সংকেতের শক্তির প্রধান জায়গা, তিনি প্রায় সারাটা জীবন ইত্যাদি বানায়া যাইতেছেন। এই অনুষ্ঠানের টিআরপি এখনো খুব কম না। একঘেয়েমিতার দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও বলা যায়, কমেডি ভাবমূর্তির এই লোক বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলাতে যত ধরনের অনুষ্ঠান হইয়া থাকে, তার মধ্যে সেরা অনুষ্ঠানটা সৃষ্টি করেন। টেলিভিশনগুলাতে কাতুকুতু দিয়া হাসানোর যেই কালচার তৈরি হইছে, তারা হানিফ সংকেতের থেকে প্রতিদিন শিখতে পারেন।

হানিফ সংকেত ও তার ইত্যাদির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।