দমে না গিয়ে লেগে থাকা জরুরী

সেবার আমার বড় বোনের মেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.১০ পেয়ে রীতিমত ভেঙে পড়েছে। ও আমাকে এসে বলল

– আমাদের হলিক্রস স্কুলে প্রায় সবাই জিপিএ ফাইভ পেয়েছে। আমার মতো এমন কম জিপিএ কেউ পায়নি। আমি স্কুলে মুখ দেখাব কিভাবে!

ওর কথা শুনে আমি তাকে আমার গল্প শুনালাম।

ডাক্তার’রা যখন আমার বাবা-মা’কে বলে দিলেন

– ওকে স্কুলে পাঠানো ঠিক হবে না; ও অন্য সবার সঙ্গে মিশতে পারবে না, পেরেও উঠবে না। আপনারা ওকে বাসায় রেখে পড়াশুনা সেখান।

আমার মা বাসায় ফিরে ঘোষণা করলেন-দরকার হয় তিনি নিজে প্রতিদিন তার ছেলের সঙ্গে স্কুলে যাবেন; তারপরও ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়েই ছাড়বেন! আমার বাবা শেষমেশ রাজি হলেন।

স্কুলে ভর্তি হয়েছি, সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। কারণ আমি অন্য আর দশটা ছেলের মতো স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পারতাম না। যে কিছু দেখলেই ভয় পেতাম!

ছেলেপেলরা স্কুলের পাশে রেললাইনে বসে আড্ডা দেয়। আমি সেটা দেখে ভয় পেতাম। ওরা আমাকে রেললাইনে বসতে বলার পরও আমি কোন দিন বসিনি। এই নিয়ে ওরা হাসাহাসি করত।

স্কুলে গিয়ে একদম পেছনের একটা বেঞ্চে বসে থাকতাম। ক্লাসে যারা ভালো ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিল, এরা কেউ আমার সঙ্গে ভালো করে কথাই বলতে চাইত না।

আমার সঙ্গে আমার বোন সব সময় স্কুলে যেত। জানালার ফাঁক দিয়ে বাড়ির কাজ থেকে শুরু করে ক্লাস নোট গুলো আমার বোন’ই টুকে নিত। আমি এর কিছুই করতে পারতাম না।

এই নিয়ে পুরো ক্লাস জুড়ে সেকি হাসাহাসি! অনেক বড় হওয়া পর্যন্ত এভাবেই চলছিল। আশপাশের ছেলেপেলেরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে আমি সেটা দেখে-শুনেই বড় হয়েছি!

তো স্কুলে থাকতে যেই ছেলেপেলে গুলো ভালো রেজাল্ট নিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলো, অনেক পরে জানতে পেরেছি এদের অনেকেই শেষমেশ আর ইন্টারমিডিয়েট পাশ করতে পারেনি!

কলেজে গিয়ে এদের অনেকেই বখে গিয়েছিল। যার কারনে আর পড়াশুনা করা হয়নি!

কলেজে ভর্তি হয়ে আমি নতুন করে আবার যুদ্ধ শুরু করি। ক্লাসের অনেকেই নতুন। যেহেতু আমি তখনও আর দশজনের মতো পুরো স্বাভাবিক ছিলাম না; আমাকে নিয়ে হাসাহাসি ছিল নিয়মিত বিষয়!

মর্নিং পিটি’র সময় কেউ পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে তো কেউ সামনে থেকে! আমি যেহেতু উল্টো কাউকে কিছু বলতে পারতাম না, তাই ওরা আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে আরও মজা পেত।

আমি অবাক হয়ে খেয়াল করতাম- আমাকে ঠাস করে মাটিতে ফেলে দিয়ে ওরা বিশাল মজা পাচ্ছে! বাসায় এসে মা’কে বলতাম- ওরা অন্যকে কষ্ট দিয়ে কেন মজা পায়?

আমি যেহেতু আর দশ জন স্বাভাবিক মানুষের মতো জন্ম গ্রহণ করিনি; তাই আমার মা সব সময় আমাকে আলাদা যত্ন নিতেন। তিনি আমাকে নিয়ম করে বলতেন- তুমি এতে কিছু মনে করবে না, আর নিজ থেকে কখনো অন্যকে কষ্ট দিতে যাবে না। দেখবে এক সময় সব ঠিক হয়ে যাবে।

কলেজ পাশ করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সময়; আবিষ্কার করলাম, কলেজের অনেক ভালো ছাত্র শেষমেশ কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই চান্স পায়নি। এদের মাঝে অনেকেই ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর আর পড়াশুনাই করেনি। কারন তারা হয়ত অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল!

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। ততদিনে আমি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসছি। এরপরও নরম স্বভাব এবং খানিক অন্য রকম স্বভাবের জন্য আমার বন্ধু-বান্ধবরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি চালিয়ে যেতে থাকল।

ঢাকা থেকে সিলেটে গিয়েছি পড়তে। আমার মনে আছে, সিলেটে আমরা এক এপার্টমেন্টে মেস করে থাকতাম, আমি যেহেতু যে কোন কিছুতেই ভয় পেয়ে যেতাম সহজে; এক সন্ধ্যায় আমার বন্ধুরা মিলে আমাকে এমন ভয় দেখালো, আরেকটু হলে হয়ত আমার হার্ট ফেল’ই হয়ে যেত!

ঘুমিয়ে আছি, চারদিক অন্ধকার হয়ে এসছে, হঠাৎ শুনি কই থেকে হালুম, হুলুম আওয়াজ আর জানালার কাছে কি যেন নড়ছে! ঘুম থেকে চমকে উঠে গিয়ে আমি ভাবলাম- এই সন্ধ্যে বেলায় এই ধরনের শব্দ কই থেকে আসছে! জানালার কাছেই বা কি নড়ছে!

ভুতের ভয় পেয়ে রীতিমত চুপসে গিয়েছি; এরপর জানতে পারলাম আমার মেসের বাদ বাকী ছেলেপেলেরা পরিকল্পনা করা আমাকে ভয় দেখিয়েছে। এরা সবাই ছাদে উঠে সেখান থেকে দড়ি নামিয়ে জানালায় শব্দ করেছে আর ছাদ থেকে নিজেরা নানান রকম শব্দ করে বেড়িয়েছে আমাকে ভয় দেখানর জন্য!

আমি যেহেতু এমনিতেই খুব নরক স্বভাবের ছিলাম, তাই ওরা আমাকে ভয় দেখিয়ে মজা পেয়েছে!

তো এই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যারা খুব ভালো ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিল, দেখা গেল পাস করে এদের অনেকেই চাকরী পাচ্ছে না কিংবা পেলেও খুব একটা ভালো চাকরি পায়নি!

এই বিশাল ইতিহাস লেখার কারণ হচ্ছে-মানুষজন আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে কিংবা আমি শেষ পর্যন্ত হয়ত পেরে উঠবো না; এটা ভেবে যদি আমার মা শেষ পর্যন্ত স্কুলে না পাঠাতো, তাহলে আমি হয়ত আজ সমাজের চোখে অশিক্ষিত’ই থেকে যেতাম।

সেই আমি দেশ বিদেশের নানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে ফেলেছি। দেশি, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি!

ক্লাসের অন্য ছেলেপেলেরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে, আমাকে নিয়ে নানান সব কথা বলছে; এর জন্য আমি আমার পড়াশোনা বন্ধ করে দেইনি। আমি আমার মতো করেই সব কিছু চালিয়ে গিয়েছি!

যারা হাসাহাসি করত, আমাকে নিয়ে নানান কথা বলে বেড়াত, তাদের অনেকেই শেষমেশ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত’ই যেতে পারেনি কিংবা খুব একটা কিছু করতে পারেনি, কারন তারা হয়ত তাদের যেই কাজটা করা দরকার, সেটাতেই মনোযোগী ছিল না!

আমার বড় বোনের মেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪ পেয়ে যখন আমাকে বলল

– আমি এখন স্কুলে মুখ দেখাবো কিভাবে!

আমি তাকে বললাম, অন্তত তোমার ক্লাসের মেয়েরা নিশ্চয় তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে না। খুব বেশি হলে তোমার রেজাল্ট নিয়ে কিছু বলতে পারে। আর আমর ক্লাসের ছেলেপেলেরা তো আমাকে নিয়েই হাসাহাসি করত। এরপরও আমি দমে যাইনি! মনে রাখবে- জীবনটা হচ্ছে অনেকটা ম্যারাথন দৌড়ের মতো!

এই দৌড়ে প্রথম কয়েক ধাপে এগিয়ে থেকে মোটেই জয়লাভ করা যায় না। খেয়াল করে দেখবে, ম্যারাথন দৌড়ে যারা প্রথম দিকে এগিয়ে থাকে তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দৌড়টাই শেষ করতে পারে না। কিন্তু যারা খুব আস্তে আস্তে, ধীরে-সুস্থে দৌড়ায়, দেখবে তারাই শেষ পর্যন্ত এই দৌড়ের শেষ মাথা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

আমার ভাগ্নি এসএসসি পরীক্ষায় এতো কম জিপিএ পেয়েও শেষ পর্যন্ত একটা সরকারি মেডিক্যালে পড়াশুনা করে এখন ডাক্তার হওয়ার পথে! সে আমার এই কথা গুল বেশ মনোযোগ দিয়েই শুনেছিলো বলে আমার ধারণা।

যেই স্কুলের ছেলেপেলেরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করত, সেই স্কুলের লোকজন এখন আমাকে নিয়ে গর্ব করে; নানান আলোচনা সভায় তারা আমার নাম বলে বেড়ায়। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ও আমাকে নিয়ে গর্ব করে!

আমি যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন বার বার’ই মনে হয়- পথ’টা এতো সহজ ছিল না। কঠিন পথ পার হতে হয়েছে। স্রেফ দমে না গিয়ে লেগে ছিলাম বলেই হয়ত আমার মতো মানুষ এতদূর আসতে পেরেছে!

আশপাশের মানুষ কে কি বলছে সেটা বড় কথা নয়, কারন দিন শেষে এরা কেউই পাশে থাকবে না। তাই নিজের লক্ষ্য স্থির করে ধীরে-সুস্থে যারা এগোয়; তারাই শেষ পর্যন্ত জীবন নামক যুদ্ধে জয়ী হতে পারে। আর এই জয়লাভের জন্য ভালো রেজাল্টের চাইতে অনেক বেশি জরুরী-দমে না গিয়ে লেগে থাকা!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।