তামিম কী ভুলই করলেন?

কার্যত মনে হচ্ছে, তামিম ইকবাল অনলাইন ক্রিকেট টকশো আয়োজন করে বড্ড ভুল করে ফেলেছেন। এই মহামারীর সময়ে, মানুষকে কিছুটা সময় চিন্তামুক্ত করে ব্যস্ত রাখার তাঁর এই অভিপ্রায় ভুলই ছিল।

তাঁর শো দারুণ বিনোদন দিয়েছে এতে কোন সন্দেহ নাই। বিরাট কোহলি, কেন উইলিয়ামসন, ওয়াসিম আকরামদের মত কিংবদন্তী ক্রিকেটারদের কাছ তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ যেমন আদায় করেছেন, তেমনি তাঁদের আড্ডা থেকে সেইসব ক্রিকেটারদের দারুণ ব্যক্তিত্বকেও তুলে এনেছেন।

এমনকি নবীন ক্রিকেটারদের জন্যেও উপকৃত হবার মত উপাদান সেখানে ছিল। তামিম দারুণ উপস্থাপনা করেছেন, যার জন্য ভবিষ্যতে অনেকেই তাঁকে ধারাভাষ্যকার বা বিশ্লেষক হিসেবে দেখতে চাচ্ছেন।

কিছু পর্বে ওই শো এবং অতিথি নিয়ে তাঁর হোমওয়ার্ক ভাল ছিল না। কখনও কখনও তিনি এভাবে কথা বলেছিলেন যা পেশাদারিত্বের চিহ্ন বহন করেনা। তবে তা অপ্রত্যাশিত ছিল না।

কারণ আর যাই হোক, তামিম এখনো পেশাদার উপস্থাপক না। তাঁর দক্ষতা তাঁর ব্যাটিংয়ে, সুনিপুণ উপস্থাপনায় নয়। যদি কেউ তামিমের শো মূল্যায়ন করেন তবে তিনি শতভাগ সফলতার দাবীদার। কিন্তু এই সাফল্য তাঁকে অধিনায়ক হিসেবে সাহায্য করবে কি?

তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করার আগে অন্যান্যদের তুলনায় অনেক বেশী পরিমাণে অভিজ্ঞদের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। স্থায়ী অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নামার আগেই অনেকেই তাঁকে ভবিষ্যৎ ক্যাপ্টেন ধরে রেখেছিলেন।
মহামারী না ছড়ানোর আগে তিনি ইতিমধ্যে নিজের অধিনায়কত্বের যাত্রা শুরু করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান করোনাসংকটে পাকিস্তান-আয়ারল্যান্ড সফর স্থগিত হয়ে গিয়ে সে যাত্রায় ছেদ পড়ল।

তিনি কীভাবে মাশরাফিকে নিয়ে সৃষ্ট ইস্যুটি সামলাতেন তা দেখার ব্যাপার ছিল। অধিনায়কত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেও মাশরাফি এখনও অবসর নেন নি। তবে তাঁর দলে থাকা নিশ্চিত ছিল না।

তামিমকে অবশ্যই তাঁর সিলেকশনের ব্যাপারে মত দিতে হত। করোনা সঙ্কট তাঁর অধিনায়কত্বে বিলম্ব ঘটাচ্ছে ঠিকই তবে এটি অন্তত তাঁকে এই শাঁখের করাতের হাত থেকে আপাতত উদ্ধার করেছে।

তবে তামিম তার অধিনায়কত্ব শুরু করতে পারেন ডিসেম্বরে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। মাশরাফি দলে থাকবেন কি থাকবেন না তা তিনি ধোঁয়াশাই রেখে দিবেন।

তামিমের শো-এর অন্তিম পর্বে,  তামিম যখন মাহমুদউল্লাহ, মুশফিক এবং মাশরাফিকে মজা করে জিজ্ঞাসা করলেন যে,
তারা একদিন যদি ডায়েটিংয়ের বিষয়ে কোন চিন্তা না করে যেকোন কিছু খাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় তবে তারা কী ধরনের খাবার গ্রহণ করতে পছন্দ করবেন, মুশফিক এবং মাহমুদউল্লাহ উভয়েই তাদের পছন্দটি খুব স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন।

মাশরাফি তখন মজা করে বলে বসলেন যে, তিনি এখনই তা করেন, ইফতারে যা মনে চায় খাচ্ছেন।  দর্শকদের জন্য এটা বেশ মজার ছিল। তবে তামিমের জন্য এটি ছিল একটি বার্তা।

হালকা চালে মাশরাফি জানিয়ে দিলেন যে তিনি এখন নিজের ফিটনেস ছেড়ে দিয়েছেন।  কোনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার তাঁর ফিটনেস নিয়ে সচেতন থাকলে নিয়মিত গরুর মাংস এবং সোডাপানের কথা ভাবতেও পারবেন না।

তবে পরে মাশরাফি জানিয়েছিলেন যে, তিনি কথাটা মজা করেই বলেছেন , এবং যেকোন সময়ের চেয়ে তাঁর ফিটনেস বর্তমানে ভাল।

তবে অধিনায়কত্বের শুরুতেই মাশরাফির মত খেলোয়াড়কে হারাতে চাইবেন না তামিমও। কারণ মাশরাফির মত অভিজ্ঞ ও সফল অধিনায়কের কাছ থেকে যে তামিমের এখনও অনেক কিছু শেখার আছে। এবং তামিম এটি ইতোমধ্যে তা করার চেষ্টা করছেন।

তার লাইভ শো-এর কথাবার্তা ইঙ্গিত দেয় যে, অধিনায়ক হিসাবে তামিম মাশরাফির রীতি অনুসরণ করার চেষ্টা করছেন।

তিনি সিনিয়র ও জুনিয়র ক্রিকেটারদের সম্মিলনে দলে একতা আনতে চেষ্টা করছেন।  এই গুণই মাশরাফির অন্যতম প্রধান এক্স ফ্যাক্টর ছিল।  তবে অধিনায়ক হিসাবে পাঁচ বছরে মাশরাফি যা সফলভাবে করেছিলেন, তা শুরুতেই করতে ব্যর্থ হন তামিম। এ কারণেই আমার মনে হচ্ছে যে তাঁর টক শোগুলি সম্ভবত তাঁর এবং তাঁর দলের জন্য ক্ষতিকারক ছিল।

মাশরাফি সবসময় তাঁর দলের সেরা খেলোয়াড় সাকিব আল হাসানকে খুশি রাখতেন এবং সাকিবের কাছ থেকে তাঁর সেরাটা বের করে আনতে পারতেন। আর তামিম ঠিক বিপরীত কাজ করলেন। সাকিব তাঁর শোতে যোগ দিতে অনীহা জানানোর পর তাঁদের মধ্যে এক ধরণের ফাটল ধরছে, যা তাঁদের জন্য ভাল হবেনা।

রিয়াদের সাথে খুনসুটির এক পর্যায়ে তামিম বলছিলেন যে, দলে তাঁর সেরা বন্ধু এখন মুশফিক।  তিনি বলতেই পারেন, তার বন্ধু কে এটা বুঝা তাঁর নিজস্ব মত। তবে সমস্যা হলো, সাকিব-তামিমের বন্ধুত্ব আগের মত নাই বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ দলের জন্য তাঁদের ‘বন্ধুত্ব’টা খুবই জরুরী।

তামিমকে স্থায়ী ওয়ানডে অধিনায়ক করা হলে সাকিব অসন্তুষ্ট হতেই পারেন।  তিনি যে বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক হিসাবে মাশরাফির যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন। এবং অন্তত ২০২৩ বিশ্বকাপ পর্যন্ত দলের দায়িত্ব নিয়ে ছক আঁটছিলেন।

কিন্তু তাঁর নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) বিপদে ফেলে দেয় এবং তাদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে বাধ্য করে। মনে করা হচ্ছিল, মাহমুদউল্লাহকে অন্তর্বর্তীকালীন অধিনায়ক করা হবে এবং নিষেধাজ্ঞার অবসান হলে সাকিব তার কাছ থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

তামিমকে একই রকম প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে তিনি অন্য কারও প্রক্সি হতে অস্বীকার করেছিলেন। বিসিবি তাকে দীর্ঘ মেয়াদেত গ্যারান্টি দেওয়ার পরেই এই চাকরি গ্রহণ করেছিলেন তামিম। তিনি এখন অন্তত পরের বিশ্বকাপ পর্যন্ত দলের নেতৃত্ব দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

২০২৩ এর পরও সাকিব ঐ বয়সে আর অধিনায়কত্ব পাবেন বলে মনে হয়না। পরের বিশ্বকাপের জন্য হয়ত দায়িত্ব পাবেন নতুন কেউ।

ভবিষ্যতে অধিনায়ক হিসাবে সাকিবের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা কমে গেলেও দলে তাঁর গুরুত্ব কমেনি। তাঁর নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটার পরে তিনি আবার দলে অবশ্যই ফিরবেন সেরার মতই।  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার তিনি ফিরছেন ঠিক তখন, যখন বাংলাদেশের অধিনায়ক হিসাবে তামিম তার যাত্রা শুরু করবেন।

তাই তামিমের উচিত সাকিবের সাথে সম্পর্কটা ঠিক করার চেষ্টা করা।

– নিউ এজ অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।