বাংলাদেশে আইপিএল আয়োজন: বাস্তবতা কি বলে?

বাংলাদেশে আইপিএল হতে পারে – এমন একটা খবরের সূত্রপাত হল বাংলাদেশেরই কিছু গণমাধ্যমের সুবাদে। খবরটা আদৌ সত্যি কি মিথ্যা সেই আলোচনায় একটু পরে আসি। আগে একটু ভুল ধরিয়ে দেই।

কিছু গণমাধ্যম ঢালাও ভাবে লিখে চলেছে, মূলত ভেন্যুগুলো আদৌ ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) কয়েকটা ম্যাচ আয়োজনের জন্য প্রস্তুতি কি না – সেটা দেখতেই বাংলাদেশে আসছেন ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির বর্তমান চেয়ারম্যান ও বোর্ড অব কনট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়ার (বিসিসিআই) সাবেক সভাপতি শশাঙ্ক মনোহর। তিনি নাকি সাথে কয়েকজন কিউরেটরও নিয়ে আসছেন।

কিন্তু, বাস্তবতা হল আইসিসির চেয়ারম্যানের আসলে আইপিএলের ভেন্যু নির্ধারণে কোনো প্রভাব নেই। প্রশ্ন উঠতে পারে, তিনি তো ভারতীয়, সাথে বিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতিও বটে। এমনটা যারা বলবেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলি বিসিসিআইয়ের বর্তমান ম্যানেজমেন্ট এই শশাঙ্ক মনোহরকে দুই চোখে দেখতে পারেন না বললেই চলে।

এবার বাংলাদেশে আইপিএল আয়োজনের যে চাপা গুঞ্জন, তার প্রেক্ষাপটটা নিয়ে একটু বলি।

বিষয় হল এবারের ভারতের জাতীয় নির্বাচনের সময়টাতেই আইপিএল মাঠে গড়াচ্ছে। কয়েকধাপের এই নির্বাচন চলবে মধ্য এপ্রিল থেকে মে অবধি। আর আইপিএল শুরু হওয়ার কথা মার্চের শেষে। ফলে, আইপিএলের অর্ধেকের বেশি অংশ পরে যাচ্ছে নির্বাচনের মৌসুমে।

এই একই ঘটনা ২০০৯ সালেও ঘটেছিল। সেবার দেশের প্রশাসন নিরাপত্তর দায়ভার নিতে নারাজ ছিল। ফলে, বিসিসিআই আইপিএল নিয়ে চলে যায় দক্ষিণ আফ্রিকায়। প্রথমবারের মত ভারতের বাইরে অনুষ্ঠিত হয় আইপিএল। এরপর ২০১৪ সালে আবারও নির্বাচনের সাথে আইপিএলের সংঘাত হলে কিছু ম্যাচ সংযুক্ত আরব আমিরাতে আয়োজিত হয়।

এবারো তাই নির্বাচনের কারণে ভারতের ভাবনায় এই দুটি দেশ ছিল। কিন্তু, দক্ষিণ আফ্রিকা অনেক ব্যয়বহুল। তাঁর ওপর দেশটির কন্ডিশনও একটা ‘ফ্যাক্টর’, দেশিদের আধিপত্ত দেখানোটা কষ্টকর। দুবাই-আবুধাবীতে খরচ তুলনামূলক কম। তবে, সেখানে বছরজুড়েই নানারকম টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের রমরমা আসর বসে। সেখানেও ভারতের আপত্তি আছে।

এরই সুবাদে আলোচনায় আসে বাংলাদেশের ম্যাচ। এখানে খরচও কম, দর্শক পাওয়ারও নিশ্চয়তা আছে, কন্ডিশনও ভারতের খুব কাছাকাছি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কিছুও সূত্রও জানালো তাঁদের সাথে বিসিসিআইয়ের ‘অনানুষ্ঠানিক’ একটা আলাপ চলছে। আইপিএলের কিছু ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতে পারে বাংলাদেশের তিনটি ভেন্যুতে। ম্যাচের সংখ্যাটা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) তিন ভেন্যুই, মানে মিরপুর, চট্টগ্রাম আর সিলেট।

এর পালে হাওয়া যোগাচ্ছে আরো একটা খবর। গেল সোমবার (৪ ফেব্রুয়ারি) আইপিলের সূচি প্রকাশের কথা থাকলেও কোনো এক ‘বিশেষ কারণ’-এ সেটা করা হয়নি। বিশেষ কারণটা যে অবশ্যই ভেন্যু সংক্রান্ত সেটা আর বলে না দিলেও চলে।

বিসিসিআইয়ের এক মুখপাত্র শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় গণমাধ্যম মুম্বাই মিররকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচন কমিশনের সাথে আলাপ করছি। সব কর্তৃপক্ষই বিষয়টা নিয়ে ভাবছে। আশা করি, এক সপ্তাহের মধ্যেই সূচি দিয়ে দেওয়া যাবে।’

জানা গেল, বাংলাদেশে আইপিএল আয়োজনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে ভারতের একটি কিউরেটর ও বিশেষজ্ঞদের দল সম্প্রতিই বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট ভেন্যু পরিদর্শন করবে। বিসিবি বা বিসিসিআই – কেউই এই ব্যাপারে এখনো আনুষ্ঠানিক ভাবে মুখ খোলেনি।

বাংলাদেশে বিপিএল আয়োজনের সম্ভাবনাটা এই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখন চ্যালেঞ্জটা হল কিউরেটরদের। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে যে বিস্তর রান আছে, সেটা বিপিএলের সুবাদে কম বেশি বোঝা হয়ে গেছে। বন্দর নগরীর অবকাঠামোগত সুবিধাও দারুণ। সব মিলিয়ে শহরটা বিসিসিআইয়ের হয়তো মনে ধরেই যাবে।

ঢাকা ও সিলেটের অবকাঠামোতে কোনো সমস্যা না থাকলেও উইকেট নিয়ে প্রশ্ন আসতে পারে। কারণ, বিপিএলে সবচেয়ে কম রান হয়েছে এই দু’টি উইকেট। টি-টোয়েন্টি রানের খেলা। ব্যাপারটা বিসিবি না বুঝতে পারে, দুশ্চিন্তা না করতে পারে। কিন্তু, বিসিসিআই ব্যাপারটা হাড়ে হাড়ে ‍বুঝে ফেলেছে। ফলে, এই জায়গাটায় তাদের ছাড় দেওয়ার কথা নয়।

এবার প্রশ্ন হল, দেশে যদি আইপিএল আয়োজন হয়েই যায় তাহলে তাতে দেশের ক্রিকেটের কোনো লাভ হবে কি? হ্যাঁ, হবে তো। প্রথম লাভটা অবশ্যই আর্থিক। বিসিবি বড় অংকের একটা টাকা পাবে। দ্বিতীয় লাভটা হাইপোথেটিক্যাল, তাকে ধরা বা ছোয়া যাবে না। মিনি বিশ্বকাপ নামে পরিচিত ১৯৯৮ সালের আইসিসি নক আউট টুর্নামেন্টেও বাংলাদেশ অংশ নেয়নি, কিন্তু তাতে বিসিবির সাংগঠিক দক্ষতা ও আয়োজক হিসেবে সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। এর সাহায্যে ও পরবর্তীতে মাঠের পারফরম্যান্সের সুবাদে বছরখানেক বাদেই চলে আসে টেস্ট স্ট্যাটাস। ফলে, বলতেই হয় সুযোগ থাকলে আইপিএল আয়োজনের চ্যালেঞ্জ নিতে পারলে ব্যাপারটা মন্দ হয় না!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।