অজেয় অজয়

বলিউডের পর্দায় তাঁর মত নাটকীয় সূচনা আর কারো হয়নি বললেই চলে!

সময়টা ১৯৯১ সাল। ‘ফুল ওউর কাঁটে’ সিনেমায় অভিষেক হয় লিকলিকে গড়নের এক যুবকে। শুরুতেই চমকে দিলেন। দুই নৌকায় এক সাথে পা না দেওয়া গেলেও, তিনি দুই মোটরসাইকেলে পা দিয়ে হাজির হলেন। ব্যস, ১৯৮৫ সালে শিশু চরিত্রে ‘প্যায়রি বেহনা’ ছবিতে কাজ করা অজয় দেবগনের এই দৃশ্যটা চিরতরে গেঁথে গেল দর্শকদের হৃদয়ে।

এরপর একটু একটু করে বিকশিত হয়েছেন তিনি। বলিউডের সেলুলয়ডের পর্দায় তিনি এসেছেন বিপ্লবী নেতা ‘ভগত সিং’ হয়ে, আবার কখনো এসেছেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন ‘সুলতান মির্জা’ হয়ে। গোলমাল সিরিজে কৌতুকাবহে যেমন মুগ্ধ করেন, তেমনি তেজদীপ্ত পুলিশ অফিসার ‘সিংঘাম’ করে দর্শকদের চমকে দেন।

সমসাময়িকদের মত সুদর্শন নায়ক ছিলেন না, এক বিখ্যাত পরিচালক তাকে দেখেই বলেছিলেন, ‘এই কালো ছেলে বলিউডে টিকতে পারবেন না’। অন্যদিকে আরেক বিখ্যাত নির্মাতা বলেছিলেন, ‘সে চোখ দিয়ে অভিনয় করেন’। আর ঠিক সেই কারণেই তিনি টিকে গেলেন বলিউড সাম্রাজ্যে। দুই যুগ পরেও তিনি সুপারহিট ছবি দর্শকদের উপহার দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন বলিউডের জনপ্রিয়দের একজন।

বাবা পরিচালক বীরু দেবগন। নায়ক হিসেবে প্রথম ছবি ‘ফুল ওউর কাঁটে’-তেই তিনি ব্যবসাসফল হন। এরপর শুরুর দিকে সুহাগ, বিজয়পথ, নাজায়েজসহ বেশকিছু ছবি করেন। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিল রাভিনা ট্যান্ডনের সাথে ‘দিলওয়ালে’। নব্বই দশকের শেষে এসে সঞ্জয় লীলা বনসালীর ‘হাম দিল দে চুকে সানাম’ ছাড়াও ‘পেয়ার হোনা হি থা’ ও ‘ঈশক’ দিয়ে বেশ আলোচিত হন। পাশাপাশি মহেশ ভাটের ‘জখম’ সিনেমাটি তাঁকে নিয়ে যায় অনন্য স্থানে।

ওই সময়ে তাঁর ক্যারিয়ারে কিছু আক্ষেপও আছে। রাকেশ রোশানের সিনেমা ‘করণ অর্জুন’-এ সালমান খানের চরিত্রের জন্য পরিচালকের প্রথম পছন্দ ছিলেন অজয়। এমনকি ‘ডর’ সিনেমায় শুরুতে আমির খান সিনেমাটি করতে না চাইলে প্রস্তাব দেওয়া হয় অজয়কে। যদিও, শেষ অবধি সিনেমাটি চলে যায় শাহরুখ খানের কাছে।

২০০২ সালে এসে বলিউডবাসীকে চমকে দেন দুটি সিনেমা দিয়ে। একটি বিপ্লবী নেতার জীবনী নিয়ে নির্মিত ‘দ্য লিজেন্ড অব ভগত সিং’। এই ছবিতে নিজেকে দুর্দান্তভাবে উপস্থাপন করেন। অন্যটি রামগোপাল ভার্মার ‘কোম্পানি’। আন্ডারওয়ার্ল্ডের গ্যাংস্টার চরিত্রে অভিনয় করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন।

এর পরের বছরেই প্রকাশ ঝার ‘গঙ্গাজল’ তাঁর ক্যারিয়ারকে আরো সমুজ্জ্বল করে। এর মাঝেই ডাক পেলেন ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবিতে অভিনয়ের জন্য। তাঁর শ্রী নিয়ে যে একটা আক্ষেপ ছিল, সেটা যেন ঘুচল এই ছবিতে। ঋতুপর্ণ ঘোষ তাকে ‘রেইনকোট’ সিনেমায় অন্যভাবে তাকে উপস্থাপন করেন। ভিলেন হিসেবেও তিনি দক্ষ, তাঁর অন্যতম প্রমাণ ‘খাকি’ ও ‘দিওয়াঙ্গি’।

চিরসবুজ দম্পতি

ক্যারিয়ারে অনেক ভালো ভালো ছবিতে অভিনয় করেছেন, তাঁর মধ্যে অন্যতম তিনটি যুবা, ওমকারা ও অপহরণ। স্ত্রী কাজলের সাথে তাঁর করা ‘ইউ মি ওউর হাম’ সিনেমাটা তিনি নিজেই পরিচালনা করেন। তাঁর পরিচালিত অন্য সিনেমাগুলো হল রাজু চাচা ও শিবায়।

আজকের তাঁর এই অবস্থানের জন্য অন্যতম অবদান ‘গোলমাল সিরিজ’। এই সিরিজের চারটি ছবিতেই তিনি অভিনয় করেছেন। চারটিই ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। এছাড়া ‘সিংঘাম’ ছবিটিও বাণিজ্যিক দিক দিয়েও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বক্স অফিস হিট নির্মাতা রোহিত শেঠির সাথে তাঁর রসায়ন যেন ‘মনি-কাঞ্চন’ জুটি। সেটা ফ্লপ সিনেমা ‘জমিন’ হোক, কিংবা হোক জনপ্রিয় সিনেমা ‘অল দ্য বেস্ট’ বা ‘বোল বচ্চন’।

অজয়-রোহিত জুটি

এছাড়া মিলন লুথারিয়ার ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন মুম্বাই’, ‘রেইড’ ছবিতেও নিজের জাত চিনিয়েছেন। অবশ্য ‘বাদশাহো’ খুব ভালো চলে নি। ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া থ্রিলার ‘দৃশ্যম’, ছবিটাও দর্শকদের কাছে বেশ প্রিয়। দুর্দান্ত করেছিলেন তিনি। এছাড়া ক্যারিয়ারে রয়েছে রাজনীতি, লজ্জা, অতিথি তুম কাব যায়োগে, আক্রোশ অন্যতম। ক্যারিয়ারে অবশ্য কিছু দুর্বল ছবিতেও অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে ‘হিম্মতওয়ালা’, ‘অ্যাকশন জ্যাকসন’, ‘তেজ’ কিংবা ‘রাসকেলস’ অন্যতম।

বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে পেয়েছেন দু’বার পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। পদ্মশ্রীতেও ভূষিত হচ্ছেন। এছাড়া একাধিক ফিল্মফেয়ার পেয়েছেন। ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী কাজলকে। সংসারে রয়েছে দুই সন্তান। ২০ বছরের সংসার তাঁদের। এই সময়ে স্ক্যান্ডাল তো দূরের কথা, তাঁদের সংসার নিয়ে কোনো গুজবও শোনা যায়নি!

অজয় দেবগনের সাথে বলিউডের খান, কুমার কিংবা কাপুরদের কোনো ‍তুলনা চলে না। তবে, সব মিলিয়ে ভিন্নধর্মী একজন অভিনেতা। তিনি এমন কিছু সিনেমা করেন, যা দেখে চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায় যে, চরিত্রগুলো অন্যকেউ এত ভাল ভাবে করতে পারবেন না। এখানেই অজয়ের স্বার্থকতা। এখানেই তিনি অজেয়!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।