আমজনতার নির্মাতা, সমালোচকদের প্রিয় মুখ

ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে দু’জন ‘এ আর’কে তাঁদের কাজ দিয়ে আলাদা করা যায়। প্রথম নামটার কথা সবাই জানেন। অস্কার জয় করা কালজয়ী সঙ্গীতকার এ আর রহমান। আর দ্বিতীয় জনের অবস্থানে এ আর রহমানের মত সপ্তম আকাশে না হলেও খুব দূরে নয়। তিনি হলেন মুরুগাদোস আরুনাসালাম। সংক্ষেপে তিনি হলেন এ আর মুরুগাদোস। তাঁর নামটা সিনেমার দর্শকদের মুখে মুখে ঘুরে না, কিন্তু তাঁর কাজগুলো হটকেকের মত চলে বক্স অফিসে।

মুরুগাদোসের পারিশ্রমিক ১২ কোটি রুপি। বোঝাই যাচ্ছে, প্রযোজকের বিরাট অর্থকড়ি আর বড় লক্ষ্য থাকলেই কেবল তাঁর ডাক পড়ে। থ্রিলার ছবি নির্মানের ক্ষেত্রে প্রযোজকদের পছন্দের তালিকায় ওপরের দিকেই থাকে তাঁর নাম। অনুমান নিশ্চয়ই করতে পারছেন যে তিনি আর ১০ জন সাধারণ নির্মাতা নয়।

মূলত দক্ষিণী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করেও যে নির্মাতারা গোটা ভারত বর্ষেই একই রকম স্টারডম, খ্যাাতি কিংবা সম্মান পান তার মধ্যে অন্যতম হল এই মুরুগাদোস। ‘গাজিনি’, ‘ঠুপাক্কি’ কিংবা ‘দরবার’-এর মত বক্স অফিস কাপিয়ে দেওয়া নির্মাতার এটুকু তো প্রাপ্যই।

মুরুগাদোস ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জন্ম নেন তামিল নাড়ুর কালাক্কুরিচিতে। নিজের জন্য ক্ষেত্রটা তিনি কলেজ জীবন থেকেই তৈরি করে আসছিলেন। তিনি ভারতীদশন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তখন থেকেই মঞ্চে নিয়মিত। গল্প লিখতেন, ছবি আঁকতেন, মিমিক্রি করতেন।

সাপ্তাহিক ‘আনন্দ বিকেতন’-এ তার লেখা গল্প ছাপা হতে শুরু হয়। মুরুগাদোস ভাবতে শুরু করেন যে, তার পক্ষে সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখা সম্ভব। সেটা প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে শিখতে মাদ্রাজ ফিল্ম ইন্সটিটিউটে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু, ব্যর্থ হন।

হাল ছাড়লেন না। চেন্নাইয়ে থেকে যান। স্ক্রিন রাইটার পি. কালাইমানি’র সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৯৩ সালের ছবি ‘মাদুরাই মিনাক্ষী’র গল্পে তাঁর অবদান ছিল।

মুরুগাদোস এরপর হন সহকারী পরিচালক। ১৯৯৭ সালের ছবি ‘রাচাগন’-এ তিনি প্রবীনকান্তের সহকারী হিসেবে অর্ধেকটা সময় কাজ করেন। এরপর ‘কুশি’ ছবিতে তিনি এস.জে সুরিয়ার সহকারী ছিলেন।

২০০১ সালে তিনি প্রথম নির্মানে আসেন। প্রথম ছবি ‘ধিনা’-তে কাস্ট করেছিলেন অজিত কুমারকে। অজিত তখন সুপারস্টার। নতুন পরিচালকের অধীনে কাজ করতে একটু নিমরাজি ছিলেন। কিন্তু, অজিতকে রাজি করান মুরুগাদোসের সাবেক বস এস জে সুরিয়া।

তামিল ইন্ডাস্ট্রিতে ‘ধিনা’ বিরাট হিট ছিল। ব্যস, সেই অবস্থান থেকে মুরুগাদোসকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপরই একের পর এক বড় বাজেট আর প্রযোজকদের সাথে কাজ করার সুযোগ পান তিনি।

পরের বছরই আসে দ্বিতীয় ছবি ‘রামানা’। আবারো বিরাট ব্যবসায়িক সাফল্য। আকাশে উড়তে শুরু করেন মুরুগাদোস। এরপর হলিউড ছবি ‘মেমেন্টো’র গল্প থেকে প্রভাবিত হয়ে তিনি ‘গাজিনি’ নির্মান শুরু করেন তামিল ভাষায়। ২০০৫ সালে ছবি মুক্তির পর নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়।

২০০৮ সালে গাজিনি রিমেক হয় বলিউডে। কেন্দ্রীয় চরিত্র করেন স্বয়ং আমির খান। ছবিটা প্রথম হিন্দি ছবি হিসেবে ১০০ কোটি রুপি আয় করা ছবির কাতারে নাম লেখায়।

মুরুগাদোসের আরেক বিরাট সাফল্য হল ‘ঠুপাক্কি’। বিজয় অভিনীত ছবিটি তামিল ইন্ড্রাস্ট্রির দ্বিতীয় ছবি যা ১০০ কোটির ঘরে নাম লেখায়। ছবিটি ‘হলিডে’ নামে মুক্তি পায় বলিউডে। অক্ষয় কুমার অভিনীত ছবিটিও বড় ব্যবসা সাফল্য পায়।

২০১৪ সালের দিওয়ালিতে মুরুগাদোস-বিজয় জুটি নিয়ে আসে ‘কাট্ঠি’। তামিল ইন্ড্রাস্টির ওই সময়ের ইতিহাসেরই এটা অন্যতম সেরা ব্লকবাস্টার। আর এই ছবি দিয়ে প্রথমবারের মত দক্ষিণী ফিল্মফেয়ারের বিবেচনায় সেরা পরিচালকের পুরস্কার পান মুরুগাদোস।

২০১৮ সালে মুক্তি পায় ‘সরকার’। বিশ্বব্যাপী ২৭০ কোটি রুপির ব্যবসা করে এই ছবি। শুধু তামিল নাড়ু রাজ্যেই ছবিটির আয় ছিল ১৪৬ কোটি রুপি। ২০২০ সালে তিনি নিয়ে আসেন স্বয়ং রজনীকান্তকে। দুই কিংবদন্তির জুটি বক্স অফিসে আগুন লাগিয়ে দেয়। ২০০ কোটি রুপির ওপর ব্যবসা করে এই ছবি।

সিনেমা বড় একটা শিল্প মাধ্যম। তবে, সিনেমার মূল উদ্দেশ্য হল ব্যবসা করা। আর ছবি দিয়ে ব্যবসা করার কাজটা খুব ভালভাবেই জানেন মুরুগাদোস। তিনি শিল্প বোঝেন, বোঝেন বানিজ্যও। বোঝেন কি করে ‘মাস’ ও ‘ক্লাস’ সবাইকে সন্তুষ্ট রাখতে হয়। আর এখানেই তিনি আলাদা অনেকের চেয়ে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।