ভুটান: রহস্যে ঘেরা সুখের স্বর্গে স্বাগতম

ভুটান দেশটা খুব ছোট্ট হলেও এর প্রাকৃতিক রূপশৈলির কোনো কমতি নেই। আবার একে ঘিরে রহস্যেরও কোনো শেষ নেই। চীন ও ভারতের মধ্যে অবস্থিত এই দেশটিতে ১৯৭৪ সাল অবধি ভিনদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। যদিও, আজকের দিনে বেশ কম খরচেই ভুটান ঘুরে আসা যায়।

তবে, মজার ব্যাপার হল, এখনো দেশটির রাজপরিবার নানা ভাবে ট্যুরিস্ট কমাতে ব্যস্ত থাকে।

  • ইন্টারনেট নেই, নেই টিভি

১৯৯৯ সাল অবধি ভুটানে টিভি ও ইন্টারনেট নিষিদ্ধ ছিল। তবে, এখন তো এসব আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া জীবন অসম্ভব। তাই, রাজারা এই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেছে। বিশ্বের শেষ দেশ হিসেবে টেলিভিশন ব্যবহার শুরু করে ভুটান।

  • সুখের মন্ত্রনালয়

মানুষের মানসিক শান্তির দেখভালের জন্য ২০০৮ সালে ভুটানে জাতীয় সুখ কমিটি গঠন করা হয়। দেশের মানুষ কতটা সুখী সেটা যাচাই করা ছিল এই কমিটির কাজ। এমনকি দেশটিতে একটি সুখ মন্ত্রনালয়ও আছে। গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্টের (জিডিপি) মত সেখানে গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেসও (জিএনএইচ) পরিমাপ করা হয়। এটা মাপা হয় মানুষের গড় আর্থিক স্বচ্ছলতা ও মানসিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে।

  • কেউ গৃহহীন নয়

ভুটানে রাস্তায় থাকা ভ্রাম্যমান কোনো লোক নেই। কেউ যদি কোনো কারণ নিজের বাড়ি-ঘর হারান, তাহলে তিনি রাজার কাছে চলে যান। রাজা নিজেই চাষাবাদের ও ঘর করার জন্য ও গৃহহীন ব্যক্তিকে জমি দিয়ে দেন। এখান থেকেই বোঝা যায়, কেন ভুটানিরা নিজেদের পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী জাতি বলে দাবী করেন!

  • বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা

সব ভুটানির বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে ভুটার সরকার। ভুটানে আধুনিক মেডিকেল ও প্রাচীন আয়ুর্বেদিক – দুই উপায়েই চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে। কে কোন চিকিৎসা নেবেন, সেটা রোগী নিজেই ঠিক করে নিতে পারেন।

  • জাতীয় পোশাক

ভুটানের আকর্ষণীয় ও ঐতিহ্যবাহী জাতীয় পোশাক আছে। ছেলেরা হাঁটু সমান লম্বা একটা রোপের মত পরে। আর মেয়েরা পরে লম্বা জামা। একজন ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা তাঁর পোশাকের রঙয়ের ওপর নির্ভর করে। সাধারণ মানুষ সাদা স্কার্ফ পরেন। আর একটু মর্যাদাবানরা হলুদ স্কার্ফ পরেন।

  • সব ধরণের তামাক নিষিদ্ধ

ভুটানে কোনো তামাক উৎপাদন, চাষ বা তামাকজাত পণ্য আমদানী বা বিক্রি নিষেধ। কোনো ট্যুরিস্ট যদি সিগারেট নিয়ে বর্ডারের ভেতরে ঢুকতে চান, তাহলে তাকে বিশাল অংক খরচ করতে হয়।

  • পশু ও প্রকৃতি

দেশটি নিজেদের পরিবেশ ও প্রকৃতির ব্যাপারে বেশ সচেতন। সরকার গাছ লাগানোয় বিশেষ মনোযোগ দেয়। ২০১৫ সালে ভুটান এক ঘণ্টার মধ্যে ৫০ হাজার গাছ লাগানোর বিশ্ব রেকর্ড গড়ে।

  • ভুটানের খাবার

ভুটানের মানুষ মূলত বৌদ্ধ। ফলে, নিজেদের ধর্ম মেনে জীব হত্যা এড়িয়ে চলে তারা। তাঁদের মূল খাবার হল ভাত। তবে, বেশি হয় লাল চালের ভাত।

এছাড়া ভুটানিরা চা খুব ভালবাসে। বিশেষ করে রঙ চায়ের সাথে লবন, মাখন ও মরিচ দিয়ে খায় তাঁরা।

  • ট্যুরিজম

যদিও, ভুটানের রাজারা ট্যুরিস্টদের জন্য দেশটি খুলে দিয়েছে, তবে এখানকার সব জায়গায় যাওয়ার অনুমতি ভুটানিরা পান না। এমনকি এখানে দল বেঁধে যাওয়া ভাল। আর সাথে সব সময় একজন গাইড রাখা ভাল। তবে, যত দিন যাচ্ছে, ভুটান ভ্রমন ততই সহজ হচ্ছে।

  • উত্তরাধিকার ঐতিহ্য

ভুটানে নারীরা বেশ সম্মান পান। এমনকি জমিজমা ও সম্পত্তির বণ্টনের ক্ষেত্রেও বড় অংশটা পান পরিবারের বড় মেয়ে, ছেলে নয়।

  • বাস্তুসংস্থানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

বাকি বিশ্ব যখন পরিবেশজনিত নানা সমস্যায় জর্জরিত, তখন ভুটানের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। কারণ, এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার মানা হয় বাস্তুসংস্থানকে। এমনকি এখানে কোনো কেমিক্যাল দ্রব্য আমদানী করে ফসলের ফলন বাড়ানোর কোনো আইনই নেই। তাই, এখানকার সবই প্রাকৃতিক ও খাঁটি।

  • বিয়ের অদ্ভুত রীতি

ভুটানে চাইলেই কোনো বিদেশিকে বিয়ে করা যায় না। একমাত্র রাজার ক্ষেত্রেই এই নিয়ম মানা হয় না। আর বিয়ের পর নিয়ম হল বরকে আসতে হয় কনের বাড়িতে। এরপর যখন তাঁদের যথেষ্ট অর্থ-কড়ি হয়, তখন তাঁরা আলাদা থাকতে পারেন।

  • ভুটানের পথে-পথে

ভুটানের রাজধানীতেও কোনো ট্রাফিক লাইট নেই। এটা ওখানকার মানুষদের জন্য কোনো সমস্যাও নয়। সব ধরণের সংকেত ওখানকার ট্রাফিক পুলিশরা হাত দিয়েই দেন।

  • ভুটানের বাড়ির নানা রং

ভুটানিরা নিজেদের বাড়ি সাজানে পছন্দ করে। নিজেরাই বাড়িতে পশু-পাখি ও বিভিন্ন রকম নকশাদার ছবি এঁকে রাখে। এখানকার ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলো সাধারণত তিন তলা হয়। নিচতলা গৃহপালিত পশুপাখিরা থাকে, দ্বিতীয় তলায় থাকে পরিবারের সবাই। তৃতীয় তলাটা স্টোররুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভুটানের মানুষ খুবই বন্ধুত্বপরায়ন ও শান্তিপ্রিয়।

  • ভুটানের অনন্য প্রধানমন্ত্রী

ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং নিজে একজন ডাক্তার। মজার ব্যাপার হল, তিনি ডাক্তারী পড়াশোনা করেছেন বাংলাদেশে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে এসে বিদেশি কোটায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন লোটে শেরিং। সেশনজট থাকায় লোটে শেরিং ১৯৯৮ সালে এমবিবিএস পাস করেন। থাকতেন বাঘমারার মেডিকেল হোস্টেলে।

এমবিবিএস পাশ করার পরে তিনি ঢাকায় এসে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. খাদেমুল ইসলামের অধীনে জেনারেল সার্জারি বিষয়ে এফসিপিএস করেন। ২০০৩ সাল অবধি তিনি বাংলাদেশে ছিলেন। এখনো ভুটানে ছুটির দিনে তিনি জনগনকে বিনামূল্যে ডাক্তারী সেবা দিয়ে থাকেন।

ব্রাইট সাইড অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।