চমৎকার চমৎকার…কত্তার মতে অমত কার!

তামুকে লম্বা দুইখানা টান দিয়া কর্তা কহিল, ‘দেখিয়াছ ভূপেন, কেমন খেলিয়া দিলুম? টেস্ট সিরিজ লইয়া আর কেহ কথা কহিতেছে না। বোর্ডের ইহা-উহা লইয়া নানাবিধ আলোচনা অন্য দিকে প্রবাহিত হইয়া গিয়াছে।’

খুশখুশ করিয়া একটু কাশিয়া ভূপেন নিচু স্বরে কহিল, ‘কিন্তু কত্তা, লোকে বলাবলি করিতেছে, সাকিব আল হাসানকে লইয়া তাহাদের বিস্ময় নাকি আরও বাড়িয়া গিয়াছে। আগে তাহাকে লোকে ভালোবাসিয়া ‘সুপার ম্যান’ বলিত, এখন বলিতেছে ‘সুপার ডুপার ম্যান!’

মুখ তুলিয়া কর্তা চোখ পাকাইয়া তাকাইল, ‘উজবুকের মতো কথা বলিয়া মেজাজখানা সপ্তমে না চড়াইলে কি চলিতেছে না?’

এইবার ভূপেনের কণ্ঠে আরেকটু ভয়ার্ত উচ্চারণ, ‘কত্তা, কথা সত্য। লোকে বলিতেছে, টেস্ট খেলিবার ইচ্ছা না থাকিবার পরও সাকিব দেশের টেস্ট ইতিহাসের সেরা পারফরমার। এমনকি সর্বশেষ টেস্ট ম্যাচেও দলে সর্বাপেক্ষা সেরা পারফরমার। ইচ্ছা না থাকিবার পরও যদি এইভাবে পারফর্ম করিতে থাকে, তাহার পর নাকি স্রেফ সুপারম্যান বলিয়া যথেষ্ট হইতেছে না। অতি দুষ্টু কিছু লোক বলিতেছে, বোর্ড আপিসের সম্মুখে তাহার আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা সময়ের দাবি!’

কর্তার ভ্রু কুঁচকিয়া গেল, ‘এত বেশি বোঝা ক্রিকেট জনতা লইয়া আমি কি করিব! তাহারা কি প্রান্তরে নামিবার পর সাকিবের শরীরী ভাষা দেখে নাই? উহাতেই তো ফুটিয়ে উঠিয়াছে তাহার খেলিবার আগ্রহ নাই! কোনো আগুন ছিল তাহার?’

কর্তার কথা মাটিরে পড়িবার আগেই লুফিয়া লইল ভূপেন, ‘কত্তা, লোকে তো বলিতেছে, আগুন টের পাহিয়াছে প্রতিপক্ষই। দেশের বাহিরে শ্রেষ্ঠ বোলিংয়ের রেকর্ড গড়িয়াছে, ব্যাটিংয়ের সময়ও নাকি লড়াই করিয়াছে।’

কর্তার হুঙ্কার, ‘এইসব রেকর্ড আস্তাকুঁড়ে ফেলিয়া দাও, তাহার দল কি করিয়াছে?’

ভূপেন এইবার স্পষ্ট কণ্ঠে কহিল, ‘শেষ টেস্টে তো প্রান্তরে তাহাকে যথেষ্টই সজীব মনে হইয়াছে। বোলিং পরিবর্তন, ফিল্ডিং প্রচ্ছাদন উত্তম ছিল। টেকনিকগত দিক হইতে উহার নেতৃত্ব ছিল অতি উত্তম। এখন ব্যাটিংয়ের সময় সবাই ব্যর্থ হইলে, তামিম-মুশফিকের ন্যায় দেশের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যানেরাও সামলাইতে না পারিলে অধিনায়কের কি করিবার থাকে!’, বলিতে বলিতে কর্তার রক্তচক্ষু দেখিয়া ভূপেন কণ্ঠের সুর বদলাইয়া ফেলিল, ‘আজ্ঞে ইয়ে, ইহা আমার কথা নয় কত্তা, ওই ফাজিল লোকেরাই বলিতেছে আর কী! তাহারা বলে কিনা, মাত্র কয়েক মাস আগেই সাকিব বলিয়াছিল, সে ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি পূর্বে ছাড়িবে। টেস্ট হইতে অবসর লইবে সবার শেষে…’

কর্তার গর্জন, ‘সে বলিলেই বিশ্বাস করিতে হইবে? তোমরা কি আমার কথায় আস্থা রাখিবা নাকি সাকিবের কথায়!’

কর্তা মনক্ষুন্ন হইয়াছে বুঝিতে পারিয়া ভূপেন ভাবিল, একটু মালিশ করিতে হইবে। একটু এদিক-সেদিক তাকাইয়া দু পা সামনে আসিয়া ফিশফিশ করিয়া বলিল, ‘হুজুর, আরেক কত্তা তো ঝামেলা পাকাইয়া ফেলিয়াছে। পরিচালনা দপ্তরের প্রধান সাহেব তাবত সাংবাদিকদিগকে পাল্টা প্রশ্ন করিয়াছেন, ‘সাকিব কি বলিয়াছে সে টেস্ট খেলিতে চায় না?’

কর্তা এইবার যার পর নাই বিরক্ত, ‘ওরে কত কথা বলে রে! সে কেন না জানিয়া কথা বলিতে যায়? আমি কি মরিয়া গিয়াছি না চলিয়া গিয়াছি? কথা বলিবার জন্য আমি তো আছিই!’

‘বদমায়েশ নিন্দুকেরা তো এইটা লইয়াও নানাবিধ কথা বলিয়া থাকে’, ভূপেন মনে সাহস সঞ্চার করিয়া বলিল, ‘চিত্রগাহী যন্ত্রের প্রতি কত্তার টান নাকি অতি প্রবল হইয়া ফুটিয়া ওঠে প্রায়ই! এই যন্ত্রের সামনে মুখমণ্ডল প্রদর্শন করিতে ও কথা বলিতে নাকি উদগ্রীব হইয়া থাকেন, ভূ-জগতের আর কোনো দপ্তর প্রধান মহোদয় নাকি এত কথা বলিয়া থাকেন না। পেশাদারী দপ্তরে ইহা নাকি মিডিয়া বিভাগের কাজ, ক্ষেত্রবিশেষে প্রধান নির্বাহী মহোদয়ের কাজ কিংবা কোনো মুখপাত্রের কাজ। প্রধান কর্তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাঝেমধ্যে কথা বলিয়া থাকেন বটে। তবে প্রান্তরের ক্রিকেট লইয়া এত অতিরিক্ত কথা, ক্রিকেটারদের নাম লইয়া এত ব্যথা, ম্যাচ বা সিরিজের আগে প্রিভিউ কিংবা ম্যাচ রিপোর্টের মতো করিয়া এত ব্যখ্যা-বিশ্লেষণ নাকি ইতিহাসের আর কোনো প্রধান কর্তা করিতে পারেন নাই।’

একটানে হড়হড় করে অনেক কথা বলিয়া ভূপেন বুঝিল ভয়ঙ্কর সব কথা বলিয়া ফেলিয়াছে। ভয়ে ভয়ে কর্তার দিকে তাকাইয়া দেখিল, কর্তার মুখে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি, ‘দেখিয়াছ, এই কারণেই তো এত কথা বলি! ইতিহাসে কেউ পারে নাই, আমি ইতিহাস গড়িয়া চলিয়াছি… হাহাহহাহাহা…।’

আচমকাই আবার হাসি থামাইয়া কর্তা কহিলেন, ‘শোনো ভূপেন, আমি অপরিপক্ক কার্য করিবার লোক নই। মুখপাত্র কেন কথা বলিবে? কার মুখে এত বড় পাত্র ধরিবে? রাজ্য আমার, মুখ আমার, পাত্রও আমার। জানো না, আমি অন্তর্যামী? ক্রিকেটারদের মনের কথাও আমি জ্ঞাত আছি।’

ভূপেন এবার কথা বাড়াইল না, ‘জ্বী কত্তা, আজ্ঞে ঠিকই কহিয়াছেন।’

কর্তার চঞ্চুতে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়া উঠিল, ‘জনতা কি জানে না, আমাদের কর্মতৎপরতা ও দক্ষতায় পাঁচশত-ছয়শত কোটি টাকা সিন্দুকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করিয়া রাখা সম্ভব হইয়াছে, ক্রিকেটের উন্নতি কল্পেই তো এইসব!’

“জনতার ছোট মুখ বড় বড় কথা বলিয়া ওঠে কত্তা। বলে কিনা, টাকা রাখিয়া দিলে শুধুই বাচ্চা প্রসব করিবে। দেশের ক্রিকেট বংশ বিস্তার করিবে না। ‘এ’ দলের খেলা নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয় না, তাহাদের সফরের প্রতিও দৃষ্টি নাই, বৎসরের পর বৎসর কিছু উইকেট সবুজ রাখিবার প্রতিশ্রুতি দিলেও নাকি রাখা হয় না, ঘরোয়া ক্রিকেটে ক্রম অধোগতি, নিচের স্তরের ক্রিকেট লিগসমূহকে ধ্বংসের পানে ঠেলিয়া দেওয়া, মিরপুরের বাইরে ভালো অনুশীলন সুবিধাসমূহর প্রকট অভাব … ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যা থাকিলেও টাকার অভাবে নাকি এসব করা যাইতেছে না। তাহলে সিন্দুকে রাখিয়া দেওয়া টাকা আর তাহাদের বাচ্চাদের লালন করিয়া লাভ কিসে?’

‘ভূপেন, পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে টেস্ট সিরিজে ব্যর্থ হইবার কারণ কি এইসব?’

‘আজ্ঞে, তাহা নয় কর্তা। মূল কারণ ইহা নহে অবশ্যই। তবে ইহা দেশের ক্রিকেটের সামগ্রিক চিত্র আর দলের ব্যর্থ হইবার দূরবর্তী কারণ। মৌলিক কারণ তো খান সাহেব তামিম ইকবাল বলিয়াই দিয়াছেন, তাহাদের ব্যর্থতা। কোনো অজুহাত দেখান নাই। তাহারা পারেন না, ব্যর্থ হইয়াছেন, অকপট স্বীকার করিয়াছেন।’

‘খান ব্যাটাও বেশি বুঝিতে চায়, সে স্বীকার করিলেই কি হইবে নাকি? সাকিব তো করে নাহি! তাহারই দায়। সে শুভ্র পোশাকে কাঁদা লাগাইয়াছে। সে খেলিতে চায় না বলিয়াই দল ভুগিয়াছে’ কর্তা বলিতেই থাকেন, ‘আরে সমঝদারকে লিয়ে ইশারা হি কাফি হ্যায়… আগেই তো দেখিয়াছ, পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে সফরের পূর্বে আমাদের নিজ ভূমে তিন দিনে অনুশীলন ক্যাম্পে সাকিব যোগদান করে নাই, তাতেই তো বোঝা যায়, তাহার টেস্ট খেলিবার আগ্রহ নাই বলিলেই চলে।’

‘কত্তা, তাহার ছুটি তো আপনাদের দপ্তর, তথা আপনারা বড় কত্তারাই অনুমোদন করিয়াছেন!’

‘আরে এইবারই কি প্রথম নাকি? আগেও তো দেখিয়াছ, সে টেস্ট খেলিতে আফ্রিকা যাইতে চাহে নাই!’

‘কত্তা, সেই বারও তো তাহার নিষ্কৃতি আপনারা অনুমোদন করিয়াছিলেন।’

‘তুমি তো বড্ড বেশি কথা বলিতে শিখিয়াছ ভূপেন। লোকে কি দেখিতে পায় নাই, তাহার মতিগতি ভালো নয় বুঝিয়া তাহাকে আমি টেস্টের অধিনায়কত্ব গছাইয়া দিলাম!’

‘অভয় দিলে বলিতাম, কত্তা’, অভয়ের অপেক্ষা না করিয়াই ভূপেন বলিয়া চলিল, ‘মন্দ লোকেরা বলিতেছে, যদি সে টেস্ট খেলিবার না চাইত, তাহা হইলে তাহাকে মাত্র ৭ মাস পূর্বে কেন অধিনায়ক করা হইল? সত্যিই খেলিতে না চাইলে এমন একজনকে জানিয়া শুনিয়া অধিনায়ক করিবার দায় নাকি আপনারই, দেশের ক্রিকেটের সঙ্গে নকি মশকরা করা হইয়াছে, ইহা নাকি আপনাদেরই ব্যর্থতা! বলেন দেখি লোকের কেমন বাড় বাড়িয়াছে কত্তা! কত্ত বড় সাহস, আপনার কথাতেই আপনাকে ফাঁসাইতে চাহিতাছে! অনেকেরই শঙ্কা, অভিমান করিয়া সাকিব সত্যিই যদি টেস্ট ক্রিকেট ছাড়িবার ঘোষণা দিয়া বসে!’

ফাঁসানোর কথা শুনিয়া কর্তা ফুঁসিতে লাগিলেন। এইবেলা শেষ বোমাখানা নিক্ষেপ করিল ভূপেন, ‘এই বেয়াদব সম্প্রদায়ের কথা আর বলিবেন না কত্তা, তাহারা বলে কিনা, সত্যিই যদি সাকিবরা টেস্ট খেলিতে না চাহে, দলের কারও মনোজগতে কিংবা অভ্যন্তরে কোনো ধরণের সমস্যা থাকিয়া থাকে, তাহা জনসম্মুখে বারবার এইভাবে প্রকাশ করিয়া দেওয়া নাকি সত্যিকারের প্রধান কত্তার জন্যও লজ্জার। সাংবাদিকগণকে এইসব বেফাঁস কথা আনুষ্ঠানিক ভাবে বলিলে তাহারা লুফিয়া লইয়া সংবাদ করিবেই। কিন্তু একজন প্রধান কত্তা, পরিবারের মাথার নাকি কর্তব্য ভেতরে ভেতরেই ঝামেলা মিটাইয়া ফেলা, পরিবারের সদস্যদের বোঝাইয়া পথে আনা, তাহাদেরকে আগলাইয়া রাখা, আর তাহাতেও কাজ না হইলে, প্রয়োজন পড়িলে ব্যবস্থা লওয়া। পরিবারের কত্তা কেন আপনজনদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করিবেন? ইহাকে-তাহাকে আসামী করিয়া কাঠগড়ায় দাঁড় করাইলে নাকি আখেরে পরিবার প্রধানের ব্যর্থতাই প্রকাশ পাইয়া যায়। দায় এড়াইয়া চলার চেষ্টাসমূহ নাকি কুৎসিত ভাবে প্রকাশ্য হইয়া ওঠে।’

“ভূপেন..ন.ন.ন.ন.ন.ন.ন…’ কর্তার বজ্র হুঙ্কারে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়া ওঠে। বৃক্ষের পত্রমালা দুলুনি বন্ধ করিয়া দেয়, পক্ষিকূল ওড়াউড়ি বাদ দিয়া মধ্য আকাশে থমকাইয়া থাকে…ছাদ নামিতে চায় মেঝেতে, মেঝে উঠিবার চায় ছাদে… কর্তা চিৎকার করিতে থাকেন, ‘আমি যাহা বলিয়াছি, তাহাই সত্যি.. এক সত্যি দুই সত্যি তিন সত্যি… ধ্রুব সত্যি, চিরন্তন সত্যি… সাকিব টেস্ট খেলিতে চায় না… চায় না…চায় না…।’

ভূপেন কহিল, ‘চমৎকার চমৎকার…কত্তার মতে অমত কার!’

[ এই শব্দমালা অলস মস্তিষ্ক নামক শয়তানের কারখানায় উৎপাদিত। বাস্তবের সহিত কোনো মিল নাই। কাহারও সহিত মিলিয়া গেলে তাহা অনভিপ্রেত কাকতাল মাত্র! ]

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।