ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড: ৩৩ টি বুলেট ও একটি ষড়যন্ত্র

ভারতের ‘আয়রন লেডি’ খ্যাত শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর পরিচয় নি:সন্দেহে এই উপমহাদেশের মানুষকে নতুন করে দেওয়ার কিছু নেই। বাকিদের কাছে তিনি হলেন ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। যদিও, বাংলাদেশের কাছে তাঁর পরিচয়টা একটু অন্যরকম।

তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে গোড়া থেকেই সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এক কোটি বাঙালি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়া থেকে শুরু করে বিশ্বমহলে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ের সার্বিক প্রচেষ্টাসহ নব্য উত্থিত রাষ্ট্রটির জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক লড়াইয়ে সদর্পে অগ্রসর হয়েছিলেন তিনি।

নিজের দেহরক্ষীর বন্দুকের গুলিতে তিনি নিহত হয়েছিলেন। ২০১১ সালের ২৫ জুলাই মরণোত্তর ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা’য় ভূষিত বাংলাদেশের এই অকৃত্রিম বন্ধু। আজ ইন্ডিরা গান্ধীর সেই ট্র্যাজেডিক, প্রতিশোধপরায়ন ও ষড়যন্ত্রমূলক হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিচারণা করবো।

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহরলাল নেহরুর একমাত্র সন্তান ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহরু। ১৯৪২ সালে ইন্দিরা বিয়ে করেন ফিরোজ গান্ধীকে। ফিরোজ জাহাঙ্গীর গান্ধী ছিলেন পার্সী বংশোদ্ভূত প্রখ্যাত ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক। তিনি ভারতীয় পার্লামেন্টের সদস্যও ছিলেন।

ফিরোজ গান্ধী কে বিয়ে করার পর থেকেই ইন্দিরা নেহরু থেকে ইন্দিরা গান্ধী তে পরিণত হন তিনি। ১৯৮৪ সালের জুন মাসে পাঞ্জাবের স্বর্ণমন্দিরে ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে এক সেনা অভিযান পরিচালিত হয়।

১৯৮৪ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী স্বর্ণমন্দিরে অপারেশন ব্লু-স্টার পরিচালনা করে। বিদ্রোহী দমনের এই অভিযানে নেতা ভিন্দ্রানওয়ালেসহ ভারতীয় সেনাদের হিসাব অনুয়ায়ী প্রায় ৪৯৩ জন শিখ বিদ্রোহী নিহত হয়। কিন্তু অন্যান্য নথি অনুযায়ী বেসামরিক মানুষসহ মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি ছিল।

সেনাবাহিনীর ৪ অফিসারসহ ৮৩ জন নিহত হন। স্বর্ণমন্দিরের অনেক ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই অভিযানে। শিখদের উপর এই হামলার কারনেই তাঁর দুই শিখ দেহরক্ষীর হাতে প্রান হারান তিনি। তদন্তে সেই  তথ্যই উঠে আসে। দু’জন দেহরক্ষীর একজনের নাম বেওয়ান্ত সিং, আরেকজনের নাম সাৎওয়ান্ত সিং।

সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, স্বর্ণমন্দিরে অভিযানের পরের মাসে গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’এর ডিরেক্টর মিসেস গান্ধীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন তার নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যে থেকে শিখদের অপসারণ করতে। বিশেষ করে বেওয়ান্ত সিং এবং সাৎওয়ান্ত সিং!

তিনি একবাক্যে না করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘তাহলে কী করে আমরা নিজেদের সেক্যুলার বলবো?’

৩১ অক্টোবর ১৯৮৪, সেই দিন! ভারতের ইতিহাসের কালো এক অধ্যায়।

বেয়ান্ত সিংকে মিসেস গান্ধী ১০ বছর ধরে চিনতেন। এই ১০ বছরের পরিচিত বেয়ান্ত সিং মাত্র সাত ফুট দূর থেকে তার পয়েন্ট থার্টি এইট রিভলভার দিয়ে মিসেস গান্ধীর তলপেটে তিনটি গুলি চালায়।

তিনি মাটিতে পড়ে যেতেই সাৎওয়ান্ত সিং তার অটোমেটিক স্টেনগানের ত্রিশ রাউন্ড খালি করে দেয় তার উপর। অন্তত সাতটি গুলি মিসেস গান্ধীর পেটে লাগে, তিনটি তার বুকে আর একটি হৃৎপিণ্ডে। মোট ৩৩ টি বুলেট এসে বিদ্ধ হয় ইন্দিরার শরীরে।

প্রধানমন্ত্রী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তেই দুই ঘাতক দেহরক্ষী শান্তভাবে তাদের অস্ত্র ফেলে দেয়। অন্য নিরাপত্তাকর্মীরা তৎক্ষণাৎ তাদের ধরে ফেললে বেয়ান্ত সিং নির্লিপ্তভাবে বলে, ‘আমার যা করার দরকার ছিল আমি করেছি, এখন তোমরা যা করতে চাও কর।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তাদের দুজনকে একটি গার্ডহাউসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অকস্মাৎ বেয়ান্ত সিং লাফ দিয়ে এক নিরাপত্তারক্ষীর বন্দুক ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করে। একইসাথে সাৎওয়ান্ত সিং তার পাগড়ির ভেতর থেকে একটি ছোড়া বের করে।

রক্ষীরা তৎক্ষণাৎ দুজনকেই গুলি করতে বাধ্য হয়। বেয়ান্ত সিং সাথে সাথেই মারা যায়। সাৎওয়ান্ত সিংকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে সে স্বীকারোক্তি দেয় যে, সে একটি বড়সড় ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল।

এই ষড়যন্ত্রে একজন উচ্চপদস্থ সেনা অফিসারও জড়িত ছিল। আর এটাও জানায় যে, তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হল রাজীব গান্ধী।

মিসেস গান্ধীর নিথর দেহটি অল-ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস হসপিটালে নেয়া হয়। গাড়িতে তার মাথাটি কোলে করে বসে অঝোরে কেঁদে চলেছিলেন পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধী।

হাসপাতালে পৌঁছার পর তার দেহে জীবনের কোনো লক্ষণ না থাকলেও ১২ জন ডাক্তারের একটি দল অসম্ভবকে সম্ভব করার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যান।

ইন্দিরার দেহ থেকে সাতটি বুলেট বের করা হয়, একটি কৃত্রিম ফুসফুস সংস্থাপন করা হয়, ৮৮ বোতল ও-নেগেটিভ রক্ত দেয়া হয়। এর কোনোটাই কোনো কাজে আসেনি! দুপুর পৌনে দুইটায় ভারতের সরকারী প্রচারমাধ্যম দূরদর্শনে সংবাদ আসে – ইন্দিরা গান্ধী আর নেই!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।