বাংলাদেশের জন্য ‘ওল্ড বিচ’ গালি হজম করেছিলেন যিনি!

আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেণ্ট রিচার্ড নিক্সন। ফোনে কথা বলছেন চীন সফররত তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের সাথে। এক পর্যায়ে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের এক দেশের এক প্রধানমন্ত্রীর প্রসঙ্গ আসতেই গালি দিলেন- ‘কুকুর’ বলে।

ইংরেজিতে পুরো লাইনটা ছিল – ‘We really slobbered over the old bitch.’

সেদিনের টেলিফোন আলাপে নিক্সনের গালি খাওয়া নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। ইন্দিরা গান্ধী এই নোংরা গালিটা খেয়েছিলেন, লাল-সবুজের একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের জন্মলগ্নে সমর্থন দিতে গিয়ে।

সময়: ৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১; সকাল ১০টা ৪৫ মিনিট।

এর আগে ২৫ নভেম্বর, মিটিং-এ ইন্দিরা গান্ধী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বলে এসেছেন, ‘পূর্ব বাংলায় মানুষ মরছে। সারাবিশ্ব ঘুমে থাকলেও আমি চুপ থাকবো না।’

চীনা মার্কিন প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী – ‘পাকিস্তানের অভ্যন্তরীন বিষয়ে নাক গলানো যাবে না’ এই শর্তে তিনি রাজি হননি।

উল্টো সারাবিশ্বের ২৪টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে মানুষ হত্যার বিবরণ দেখিয়েছেন; সমর্থন চেয়েছেন।

খাবার দিয়ে গেছেন ০৮ মাস; নব্বই লাখ ক্ষুধার্থ শরণার্থী মানুষদের। অথচ নিজের দেশের উত্তরাঞ্চলে তখন ফসল হয় নি; লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে ছিল।

বিরোধী দলের মোররাজি দেশাইরা আন্দোলন করছেন। কেবল হিন্দু দেখে দেখে আশ্রয় দেয়া হউক খাবার দেয়া হউক। ‘মোসলেম কা বাচ্চা, কভি নেহি আচ্ছা’।

ইন্দিরা গান্ধীর শক্ত অবস্থান, ‘মানুষ মরছে। কে কোন ধর্মের তা না! আমরা মানুষকে বাঁচাতে চাই।’ এই আলোচিত টেলিফোন আলাপের- সপ্তাহখানেক আগেই; কিসিঞ্জার বলছেন, ‘এটা তো পাকিস্তানের ঘরের ঝগড়া। আমরা কি ‘নিরপেক্ষ’ থাকতে পারি না, মিসেস গান্ধী?’

হেনরি কিসিঞ্জার

ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘এরকম নিরাপরাধ লোকদের গণহত্যা, ধর্ষণ আর লুটতরাজ দেখে যে নিরপেক্ষ থাকে; সেও আরেকজন অপরাধী, মি. কিসিঞ্জার।’

যাই হোক, নিক্সন আর কিসিঞ্জারের গোপন সেই নোংরা টেলিফোন আলাপ এতদিন কেউ জানতো না।

৪৫ বছর পর সিআইএ পুরো বক্তব্যটা রিলিজ করেছে। ডিক্লাসিফাইড ফাইল আকারে।  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সবচেয়ে ভালো বইগুলোর একটি “The Blood Telegram: Nixon, Kissinger, and a Forgotten Genocide”। এটাতেও এসেছে প্রসঙ্গটি।

তাছাড়া, উইকিলিকসের মাধ্যমে সারা বিশ্ববাসী শুনেছে। এখন ইউটিউবেও আছে পুরো আলাপটা। গত কয়েক বছর ধরে। আছে সেই সাথে অসভ্য গালিটাও।

কুখ্যাত প্রেসিডেন্ট নিক্সন বেঁচে নেই। প্রায় বুড়ো কিসিঞ্জার ক্ষমা চেয়েছেন, ভারতের লোকজনের কাছে।

তিনিও ক্ষেপে গিয়ে ‘বাস্টার্ড ইন্ডিয়ানস’ বলেছিলেন। সেদিন একটা সদ্য ভূমিষ্ঠ মানচিত্রকে সমর্থন দিতে গিয়ে ‘ওল্ড বিচ’ হয়েছিলেন যে ইন্দিরা গান্ধী।

ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথ তার নাম রেখেছিলেন; প্রিয়দর্শিনী। ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী। তখনকার সম্প্রসারণবাদী স্বার্থ, ভূরাজনৈতিক খেলুড়েপনা। আজকের ভারত রাষ্ট্রটির নিপীড়ক পড়শিগিরি; আধিপত্যবাদী গুন্ডামি। এসব স্বীকার করি। বিশ্বাসও করি।

তবুও, এই ভদ্রমহিলার কাছে ঋণ স্বীকারে ত্রুটি করতে চাই না। এই ভদ্রমহিলার ত্যাগ আর তিতীক্ষার ঋণ কোনদিন শোধ হবে না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।