ভারতীয় রিয়েলিটি শো: মিথ্যার আশ্রয়ে আবেগের রমরমা ব্যবসা

নিন্দুকেরা বলেন, রিয়েলিটি শো’র সব কিছু আসলে রিয়েল নয়। আসলে নিন্দুক নয়, রিয়েলিটির সাথে জড়িত অনেকেই এমন নিন্দা করে থাকেন। টেলিভিশনের জগতে রিয়েলিটি শো যেমন জনপ্রিয়, নিয়ে অনেক রকমের তর্ক বিতর্ক প্রচলিত আছে।

এর পুরোটাই নির্মিত হয় একটা স্ক্রিপ্ট ধরে, এখানে প্রতিযোগীদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ বাঁধানোও ওই স্ক্রিপ্টের অংশ। টেলিভিশন গবেষকরা বলেন, এসব না করলে নাকি টিআরপি পাওয়া যায় না রিয়েলিটি শো থেকে। আর এই টিআরপি বাড়ানোর লড়াইয়ের দর্শকের আবেগকে নাড়া দেওয়ার প্রয়োজন হয়। সেজন্য অনেক প্রযোজক অসততা করতেও পিছ-পা হন না।

এই কথাগুলো ভারতীয় রিয়েলিটি শো’র ক্ষেত্রে আরো বেশি প্রযোজ্য। প্রযোজকরা দর্শকদের আবেগ নিয়ে খেলতে পছন্দ করেন। তাই তো তারা এমন কিছু মানুষ সব সময়ই খুঁজেন যার কোনো শারীরিক সমস্যা আছে বা এমন কোনো ব্যক্তিগত অতীত আছে যা সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে তুলতে হবে।

বহুবার দেখে দেখে ব্যাপারটা এখন মোটামুটি বোঝাশোনারা ধরে ফেলতে পারেন। প্রতিযোগীরাও কম যান না। দর্শক ও বিচারকদের সহমর্মীতার জন্য তাঁরা নিজেরাও প্রায়শই উদ্ভট সব গল্প ফাঁদেন। নিজের স্বাভাবিক জীবনটাকেও অনেক কণ্টকপূর্ণ দেখাতে এখানে অনেকেই মিথ্যার আশ্রয় নেন।

একটু খেয়াল করে দেখবেন, এখানে যেসব প্রতিযোগীকে নিয়ে দর্শকরা ‘আহা-উহু’ করেন, তাঁদের কারো বাবা অটো চালান, বা গায়ক বা নাচিয়ে হওয়ার সংগ্রামকে তারা পরিবারকে পাশে পাননি, রিয়েলিটি শো-তে অংশ নিচ্ছেন যাতে করে পরিবারের সামনে নিজের প্রমাণ দিতে পারেন – ইত্যাদি। মানে ‍ঘুরে ফিরে সবার গল্পটাই মোটা দাগে একইরকম, একই ছকে বাঁধা।

একেকটা রিয়েলিটি শো গড়ে ওঠে দারুণ সব সম্পাদনার কাজ, সহমর্মীতা, আবেগের ঝড় ও সামান্য একটু প্রতিভার দিয়ে। এটুকুতেই রেহাই মিললে ঠিক ছিল, কিন্তু তা আর হচ্ছে কোথায়। এখন আবেগের গল্পগুলোও হয় স্ব-নিয়ন্ত্রিত। যার কারণে, দর্শকরা অনুষ্ঠানটির প্রতি একধরণের নৈকট্যবোধ অর্জন করেন। অনুষ্ঠানকে জনপ্রিয় করতে নাকি এখন আর আর কোনো বিকল্প নেই। এখানে হয় প্রতিযোগী বাছাই করা হয়, না হয় প্রয়োজনে বানানো হয়।

রিয়েলিটি শোয়ের ব্যাপারে ‘দাঙ্গাল’ কিংবা ‘বাধাই হো’-তে নিখুঁত অভিনয় করা সানিয়া মালহোত্রার বক্তব্যটা চোখ কপালে তুলতে বাধ্য। একাধারে তিনি তুখোড় একজন ড্যান্সারও বটে। অংশ নিয়েছিলেন ‘ড্যান্স ইন্ডিয়া ড্যান্স’-এও। বাদ পড়েছিলেন সেরা ১০০ জনে যাওয়ার পর।

এক অনুষ্ঠানে এসে দাঙ্গাল কন্যা বলেন, ‘আমি সেরা ১০০ জনের মধ্যে চলে এসেছিলাম। কিন্তু এর চেয়ে বেশি আগে যেতে পারিনি। কারণ, তাঁদেরকেই বাছাই করা হয়েছিল যাদের জীবনে করুণ কোনো গল্প ছিল। কয়েকজনকে তো আমি রীতিমত মিথ্যা বলতেও শুনেছি।  মঞ্চে দিব্যি বলে দিল যে, ওদের বাবা-মা তাদের নাকি নাচতে বাড়ণ করতো, অথচ প্রতিযোগীতায় অংশ নিতে সেই বাবা-মাই তাদের নিয়ে এসেছে।’

সানিয়া মালহোত্রা

‘ড্যান্স ইন্ডিয়া ড্যান্স’ এর মত যেকোনো রিয়েলিটি শো-তেই প্রতিযোগীদের বাছাই করা হয় খুবই সতর্কতার সাথে। প্রত্যেকের জীবনেই এমন কিছু গল্প থাকতে হয় যেটা কি না সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মানুষকে ‘খাওয়ানো’ সহজ হয়।

টেলিভিশন গবেষকরা বলেন, রিয়েলিটি শো হল অনেকটা অভিনয় খেলার মত। অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকেই এখানে সুনিপুণ ভাবে অভিনয় করেন। বরং বলা উচিৎ, অভিনয় দিয়ে দর্শকদের ভাবনা নিয়ে খেলে জমজমাট ব্যবসা ফাঁদার নাম হল রিয়েলিটি শো।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।