‘অধারাবাহিক’ দল নির্বাচন প্রক্রিয়া ও নিরাশার দোলাচল

গেল শ্রীলঙ্কা সফরের আগে সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা এখন থেকেই তরুণদের যথেষ্ট সমর্থন দেবার ব্যাপারে জোর দিয়েছিলেন। এর খানিক বাদে তিনি চোটে আক্রান্ত হলে এবং সেই সাথে চোটের কারণে সাইফউদ্দিন দল থেকে বাদ পড়লে সুযোগ মেলে তাসকিন আহমেদ ও অভিজ্ঞ ফরহাদ রেজার। যদিও তাঁদের কেউই শ্রীলঙ্কা সিরিজে মাঠে নামতে পারেননি।

দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনায় মিনহাজুল আবেদীন ও হাবিবুল বাশারের সমন্বয়ে গঠিত দুই সদস্যের নির্বাচক প্যানেলের ব্যর্থতার বেশ কয়েকটি নিদর্শনের এটি একটি।

ইয়াসির আলীর কথাই ধরা যাক। বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে দলের সঙ্গে থাকলেও কোন ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি তিনি। এসব ক্ষেত্রে নির্বাচকরা সাধারণত যুক্তি দেন যে তারা ইয়াসির আলির মত সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারদের দলের সাথে রেখে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করছেন।

তাই যদি হয় তবে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে এবং সদ্য সমাপ্ত শ্রীলঙ্কা সিরিজে ফরহাদ রেজাকে দলে রেখেও ম্যাচ না খেলানোটা কোন ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। কেননা ফরহাদ রেজা একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার যিনি সাকিব আল হাসান এমনকি মুশফিকুর রহিমেরও আগে বাংলাদেশের হয়ে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলেছেন।

ইয়াসির আলী রাব্বি

ঘরোয়া ক্রিকেটের পরীক্ষিত পারফর্মার ফরহাদ রেজার অভিষেক ঘটে ২০০৬ সালে। অদ্যাবধি ৩৪টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও ১৩টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলেছেন তিনি। ২০১৪ সালে শেষবার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে খেলতে দেখা যায় তাঁকে।

দীর্ঘ সময় পর আবারো তার জাতীয় দলে ফেরাটা অন্যান্যদের জন্য স্বস্তির সুবাতাস বয়ে আনতে পারে এই ভেবে যে নির্বাচকরা এখন আর ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফর্মারদের উপেক্ষা করছেন না। আদতে এটা চোখে ধুলো দেয়া ছাড়া আর কিছুই না। বার বার দলে নিয়েও ফরহাদ রেজাকে কোন ম্যাচ না খেলানোটা যে তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে!

ফরহাদ রেজা হতাশাচিত্তে বলেন, ‘দলে সুযোগ পাওয়ার অপেক্ষাটা হজম করা খুবই কঠিন। এর ফলে কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনাও জাগে। জাতীয় দলে ফেরার আগের সময়টায় আমার প্রধান কাজ ছিল নিজেকে সুস্থ রাখা এবং আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে পারফর্ম করার ক্ষুধা বজায় রাখা যা সত্যি করে বলতে গেলে মোটেও সহজ ছিল না।’

সেই সাথে ফরহাদকে নিশ্চিত করতে হয়েছিল যে তিনি তার প্রশিক্ষক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কর্মচারী তুষার কান্তি হাওলাদারের নকশাকৃত একটি কার্যক্রম সঠিকভাবে অনুসরণ করছেন।

তিনি বলেন, ‘একমাত্র খেলা থাকলেই আমি ঢাকায় আসি। তা ছাড়া অধিকাংশ সময় রাজশাহীতে থাকি। তখন বেশিরভাগ সময় বিভাগীয় স্টেডিয়ামে আমার নিজেকেই নিজেকে নিয়ে কাজ করতে হয়। তুষার দা আমার জন্য একটি কার্যক্রম পরিকল্পনা করে দেন এবং আমি তা অনুসরণ করি যা পরবর্তীতে আমাদের বিভাগে নিজস্বভাবে কাজ করে এমন অনেক খেলোয়াড়ের মধ্যে বিতরণ করে দেয়া হয়।’

‘আমি বেশ কিছুদিন ধরে এ উপায়ে কাজ করে যেতে থাকি শুধু ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের ভাল  পারফরম্যান্স নিশ্চিত করার জন্য যেহেতু এটাই নির্বাচকদের কাছে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করার একমাত্র পথ। এবং সম্ভবত ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফরম্যান্সের কারণেই আমি জাতীয় দলে পুনরায় ডাক পাই। কিন্তু আমি যদি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগই না পাই তবে কিভাবে বুঝব যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আমার সফল হওয়ার সামর্থ্য আছে কি নেই?’ – প্রশ্ন রাখেন ফরহাদ।

তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিগত পাঁচ বছর ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটের সংস্করণগুলোতে আমি বেশ ধারাবাহিক। কিন্তু দিনশেষে জাতীয় দলে একটিবারের জন্যও সুযোগ পাই নি। সুতরাং আপনি কিভাবে বলবেন যে আমি ভালো করতে পারব না? আসলে আমি তো কোন সুযোগই পাইনি। তাহলে নিজেকে প্রমাণ করব কিভাবে! আমাকে প্রথমে খেলতে হবে। আমি ঘরোয়া পর্যায়ে ক্রিকেট খেলে থাকি। আমার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার সুযোগটা দরকার। তবেই আমি প্রমাণ করতে পারব যে পারফর্ম করতে আমি সমর্থ নাকি ব্যর্থ।’

জাতীয় দলের নির্বাচক হাবিবুল বাশার তাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলেন যে ফরহাদ ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নন বরং আপৎকালীন সমাধান। যদিও এতে তার মেধা প্রমাণ করার যে সুযোগ তা পাবার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

হাবিবুল বাশার বলেন, ‘সে খেলার সুযোগ না পেলেও আমরা তাকে প্রস্তুত রাখছি। যেহেতু সে ঘরোয়া ক্রিকেটে ভাল করছে তাই তাকে প্রস্তুতি ক্যাম্পে রেখে তৈরি করছি আমরা। হাই পারফরম্যান্স দলে কিছু খেলোয়াড় আছে যাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা হিসেবে আমরা বিবেচনা করছি।আমরা ফরহাদের মত খেলোয়াড়দেরও রাখছি যাতে দলের প্রয়োজনে তাদের ব্যবহার করতে পারি।’

ফরহাদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে যদি বিতর্ক সৃষ্টি হয় তবে ৩৫ সদস্যের প্রাথমিক ক্যাম্পে নির্বাচকদের নুরুল হাসানকে অন্তর্ভুক্ত না করার বিষয়টি অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। তিনি যে ভবিষ্যত সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচনায় আছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। আফগানিস্তানের বিপক্ষে দুই দিনের অনুশীলন ম্যাচে বিসিবি একাদশের অধিনায়ক হিসেবে নুরুল হাসানকে মনোনীত করার পর সে সন্দেহের কোন সুযোগও নেই। তর্কসাপেক্ষে নুরুল বাংলাদেশের সেরা উইকেটরক্ষক। ব্যাটসম্যান হিসেবে তার যে মেধা তাতে করে তাঁকে বাংলাদেশের ‘নেক্সট বিগ থিং’ হিসেবে বিবেচনায় দ্বিমত পোষণ করার লোক কমই আছেন।

খালেদ মাহমুদের ভাষ্যমতে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) চিটাগং কিংসের পরামর্শক হিসেবে থাকাকালীন সময়ে উইন্ডিজ কিংবদন্তি ব্রায়ান লারা নুরুল হাসানের পায়ের কাজে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সেটি ছিল বিপিএলে নুরুলের প্রথম আত্মপ্রকাশ যেখানে চিটাগং কিংসের প্রধান কোচ ছিলেন খালেদ মাহমুদ।

এমনকি নুরুল হাসান তার প্রাপ্য সমর্থন না পাওয়ায় বেশ কয়েকবার আফসোস করেছেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। বর্তমানে নির্বাচকদের ভাবনায় নেই নুরুল।  তাই আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট এবং বাংলাদেশ, আফগানিস্তানের সাথে তৃতীয় দল হিসেবে জিম্বাবুয়েকে নিয়ে আয়োজন করতে যাওয়া ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজের জন্য গঠিত ৩৫ সদস্যের প্রাথমিক দলে জায়গা মেলেনি তার। ভারতের আলুরে ড. কে থিম্মাপ্পিয়াহ মেমোরিয়াল টুর্নামেন্টে বিসিবি একাদশের প্রতিনিধিত্ব করার পরও ৩৫ সদস্যের প্রাথমিক দলে তাকে না রাখাটা বেশ অবাক লেগেছে। ছন্দে থাকা নুরুল টুর্নামেন্ট চলাকালে ৬ ইনিংসে দু’টি অর্ধশতক হাকিয়েছেন।

তিনটি টেস্ট, দুটি ওয়ানডে এবং নয়টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা নুরুলের অন্তর্ভুক্তি তার অনুপ্রেরণার জন্য দরকার ছিল। সেইসাথে পূর্বে নির্বাচকদের বলা এ কথার বৈধতার জন্যও, ‘আমরা আমাদের দ্বিতীয় সেরা দলকে ভারত পাঠাচ্ছি।’

এ ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে ফরহাদের অনুভূতিই প্রতিধ্বনিত হয় নুরুলের কন্ঠে, ‘এরকম পরিস্থিতিতে অনুপ্রাণিত হওয়া খুবই কঠিন যখন আপনি জাতীয় দলের ক্যাম্পে থেকেও ৩৫ সদস্যের প্রাথমিক দলে সুযোগ পান না এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো ভালো ছন্দে থাকা সত্ত্বেও। আমি সর্বদা নিজেকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করি। আমি মনে করি একজন বড় মাপের খেলোয়াড় হতে হলে মানসিকভাবে দৃঢ় থাকতেই হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি এগুলো মাথায় না রাখার চেষ্টা করে থাকি।’

তিনি যোগ করেন, ‘আমি গত তিন-চার বছর জাতীয় দলের সাথে ছিলাম। আমি সবসময় ভাবি যেকোন সময় আমাকে দল থেকে বাদ দেয়া হতে পারে। যদি এসব নিয়ে বেশি বেশি চিন্তা করি তবে হয়ত মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারি। তাই এগুলো নিয়ে আমার ভাবা উচিত নয়। তবে আমি যেকোন মুহূর্তে বাদ পড়তে পারি এবং এটা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। এমনকি ভাল খেলেও দলে ফেরার কোন নিশ্চয়তা নেই।’

নুরুল আরও বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে একজন প্রশিক্ষক নিযুক্ত করেছি। ব্যাটিং ও উইকেটরক্ষকের আলাদা প্রশিক্ষক বেছে নিয়েছি। আমার ক্যারিয়ার ঠিক করার জন্য আমাকেই উদ্যোগ নিতে হবে। তাই আমি এগিয়ে যাচ্ছি। আমার মনে হয় আমার কোথায় খেলা উচিত তা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তিত না হয়ে বরং আত্মসন্তুষ্টি অর্জনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনুশীলনের সময় আমাকে শুধু শতভাগ উজাড় করে দিতে হবে। তাই আমি যদি সুযোগ নাও পাই তবে অন্তত বলতে পারব আমি আমার সেরা চেষ্টাটাই করেছি।’

প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন জানিয়েছেন যে প্রাথমিক দলে নুরুলকে না রাখা হলেও আসন্ন শ্রীলঙ্কা ‘এ’ দলের বিপক্ষে সিরিজে তার অংশগ্রহণ আশা করা যাচ্ছে। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তাকে (নুরুল হাসান) শ্রীলঙ্কা ‘এ’ দলের সাথে খেলাব যেখানে তার জন্য আরও কিছু সুযোগ থাকবে।’

ব্যাখাটি তাঁদের পরিকল্পনা সম্পর্কে কেবল আরও প্রশ্ন উত্থাপন করছে। যদি কেউ ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য বিবেচিত হয় কিন্তু ৩৫ সদস্যের প্রাথমিক দলে অন্তর্ভুক্ত না হয় তবে তারা কিসের ওপর ভিত্তি করে  বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য ‘রোডম্যাপ’ আঁকছেন?

আমাদের নির্বাচকদের একটি ভাল কর্মপ্রক্রিয়া সামনে নিয়ে আসা উচিৎ। এটা এমন হওয়া ‍দরকার, যার ফলে কোনো অভিজ্ঞ ক্রিকেটার নিজেকে অবাঞ্ছিত মনে না করেন। আর তরুণরা যেন পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে রূষ্ট না হন।

– ক্রিকবাজ অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।