ইঞ্চি ইঞ্চি ভিঞ্চি

সে কলকাতা শহরের এক মেকআপ আর্টিস্ট। কিন্তু শিল্পের নেশা তাকে এমনভাবে পেয়ে বসেছে যে, মেক-আপ শব্দটি হারিয়ে অন্য পরিচয়টি রয়ে গিয়েছে- আর্টিস্ট। আসল নামে কেউ এখন আর তাকে চেনে না, সবাই জানে ভিঞ্চি দা বলে। তার সাথে এসেছে জুটলো আদি বসু নামের এক সিরিয়াল কিলার। সেও নিজেকে শিল্পী বলে ভাবে। আইনের ফাঁক গলে যারা বেরিয়ে যায়, তাদের ন্যায়ের চৌকাঠে পৌঁছে দেওয়ার শিল্পে নিয়োজিত আদি।

এই বাঙাল মুলুকের দর্শকেরা সৃজিত মুখোপাধ্যায় নাম শোনা মাত্র মূর্ছা যান। তখন তাদের কানের কাছে তিনবার ‘জাতিস্মর’ শব্দটি আওড়ালে, সে সকল লোকের জ্ঞান ফিরে। হয়তো আগের জনমের দুয়েকটি কথাও তাদের মনে পড়ে যায়। যাদের টুকটাক রায়-ঘটক-সেন-সিনহা-ঘোষ অ্যান্ড ঘোষ কোং-এর ছবি দেখা আছে, তাদের দুর্গতি বোধকরি ততটা নয়। আমি সৃজিত বাবুর ভক্ত নই। তার চতুষ্কোণ ভালো লেগেছিলো আর ২২শে শ্রাবণ ইন্টারেস্টিং। মিশর রহস্য দু’বার চেষ্টা করেও, শেষ করতে পারিনি। বাস্তবতা হলো, উনি যে গতিতে মুভি বানান, আমি দর্শক হিসেবে দেখেও তার সাথে কুলিয়ে উঠতে পারি না। যেমন: এই বছরের প্রথম চার মাসে তার দুটো ছবি রিলিজ পেয়েছে। কিছুদিন পর আরেকটি পাবে।

সৃজিতের মতো বাঙালিদের একই সাথে এতটা সম্মান আর অপমান কেউ করেনা। তিনি দারুণ স্মার্ট একটা কনসেপ্ট নিয়ে কাজ শুরু করেন, যেগুলো সচরাচর এই ভাষার দর্শকেরা দেখার সুযোগ পায় না। কিন্তু শেষ অঙ্কে এসে তার মনে হয়, ‘ধ্যাত, বাঙালির ঘটে এতো মাল নেই’। তাই পানি ঢেলে পুরোটা জলবৎ তরলং নয়, পুরো জোলো করে ফেলেন। কোথায় যেন পড়েছিলাম, বাইশে শ্রাবণের গল্পটা এত প্রেডিক্টেবল ছিলো যে, অঞ্জন দত্ত ছবিটা ছেড়ে দেন। পরে সেই ক্যারেক্টারটা গৌতম করেন আর সৃজিতও প্রসেনজিতের টুইস্টটা যোগ করে দেন। নির্বাক সম্ভবত একমাত্র মুভি, যেটা সৃজিত মনোমতো বানিয়েছেন।

আর থাকে স্টারের ছড়াছড়ি। এতে করে অনেক সময় মানুষগুলো শুধু পোস্টারের শোভা বাড়ায়। এই মুভিতে যেমন সবাই ভালো করলেও, অনির্বাণের চরিত্রটা বেশি গুরুত্ব পায়নি। তবে সবচে মজা পেয়েছিলাম জুলফিকার দেখে। যেখানে বিশাল ভারদ্বাজ দশ বছরে তিনটি মুভিতে শেক্সপীয়ারের তিনটি নাটক অ্যাডাপ্ট করেছেন, সেখানে জুলফিকারে ছিলো শেক্সপিয়ারের দুটো নাটকের মিশ্রণ। তার ওপর দিয়েছেন এক চিমটি গডফাদার।

এই সিনেমার একটি চরিত্রের নাম জয়া, যাকে বিয়ে করতে শিল্পী উন্মুখ হয়ে আছে। সাটলটি (subtlety)-এর প্রতি সৃজিতের আগ্রহ বরাবরই কম। ছবির নামে ভিঞ্চি থাকলেও, বিষয়টিকে মুভির সাথে কো-রিলেট করতে পারেননি। কারণ ভিঞ্চিদা ছবির মুখ্য চরিত্র নয়, আদি বসু সমান গুরুত্বপূর্ণ। থার্ড অ্যাক্টে এসে ভিঞ্চির দ্বারা ইন্সপায়ার্ড হয়ে, ক্যারেক্টারে কোন পরিবর্তন আসলেও মানা যেত। কিন্তু সেটাও হয়নি। ভিঞ্চির ফ্যান নিজেও ছবিতে আর ভিঞ্চির নাম মুখে আনেনি। তাই ভিঞ্চিদা নামটা ছবিতে কোন পারপাজ সার্ভ করে না (কুলনেস ফ্যাক্টর যোগ করা ছাড়া)।

কিছু কিছু জায়গা ভালো লেগেছে। যেমন: আদি বসু বেশিরভাগ সময় শাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পড়ে। মানব চরিত্রের আলো আর আঁধার তুলে ধরতেই মনে হয় এমনটি করা হয়েছে (চপস্টিকস সিনেমাতেও অভয় দেওল সব সময় শাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পড়ে আর নিজেকে ডাকে আর্টিস্ট বলে। একটু বাড়াবাড়ি রকমের কাকতাল হয়ে গেলো)। ভিঞ্চি আর জয়া সব সময় ভাঙা বাড়িতে দেখা করে। বাড়িটা যেন দুই ব্রোকেন হিউম্যান বিঙের প্রতিরূপ। জয়ার পরিণতি একটু ফোর্সড লাগতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে ভিঞ্চি যে কাজটিতে নীরবে সহায়তা করছিলো, সেই ‘সার্কেল অফ সিন’ পূর্ণতা পায়। একসময় আদি বসুর চেয়ারে আদি বসুর চেহারায় ভিঞ্চিকে আমরা বসে থাকতে দেখি। পরিচালক বলতে চেয়েছেন, অন্যায় যে করে আর যে সহে, একসময় তাদের মাঝে কোন পার্থক্য থাকে না।

ছবিতে গান বিশেষ নেই। নোবেলের গানটি ভালো লেগেছে। অনুপমের গানের কথা খুব ভালো হয়। কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত হওয়ার ফলে, তার বেশিরভাগ গানের সুর শুনতে একইরকম লাগে। আ বিগ শাউট আউট টু দ্য প্রোডাকশন ডিজাইনার। সৃজিত আর অরিন্দম শীলের সিনেমার প্রোডাকশন ডিজাইন মুগ্ধ করে। কারণ, রিজিওনাল ফিল্মের লিমিটেড বাজেট নিয়ে তারা দুর্দান্ত আউটপুট দিচ্ছেন। একবার ভিঞ্চির রুমের পোস্টারগুলো খেয়াল করে দেখুন। ফেইসঅফ, চাচি ৪২০-সহ এমন কিছু সিনেমার পোস্টার রয়েছে যেগুলোয় প্রস্থেটিক্সের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য।

তামিল মুভি রাতসানান-এও ভালো প্রস্থেঠিক মেক-আপ দেখেছি (ঐ মায়ের মেক-আপ দেখলে, বিগ ব্যাং থিওরির এমি’র কথা মনে পড়ে যায়)। ভিঞ্চিতে পুরোটা সময় প্রস্থেটিক মেক-আপ বলে, আসল অভিনেতাটিকে দেখানো হয়েছে। আচ্ছা মেনে নিলাম ভিঞ্চিদা ইজ দ্যাট গুড। আমার সকল ডিজবিলিফের প্রদীপকে সাসপেন্ড করলাম। কিন্তু ট্রেনের দুই মাস্ক, যেটার সাথে কিনা তাদের জীবন-মৃত্যু জড়িত, সেটা এত প্যাথেটিক কেন! দুজন বয়স্ক মানুষকে কাস্ট করে, ভয়েস ডাব করলেই তো হতো। তার বদলে এমন মাস্ক দেখলাম, যেটার চেয়ে উন্নতমানের মাস্ক শ্যামলীর শিশুমেলার সামনে পাওয়া যায়।

Friedrich Nietzsche (নিচ্চা বললে ভাববেন মশকরা করছি)-এর ubermensch তত্ত্বের কথা এই মুভিতে এসেছে। অ্যালফ্রেড হিচককের ‘রোপ’ মুভিতে দুই ‘বন্ধু’ এই মতাদর্শে বলীয়ান হয়ে একজনকে খুন করে বসে। আর সেটা ধরে ফেলেন তাদের শিক্ষক জিমি স্টুয়ার্ট (আমার মনে হয়েছে হুমায়ূন আহমেদ মিসির আলির ডিজাইন করেছেন এই চরিত্রটির আদলে)। যারা বার্ডম্যানের কন্টিনিউয়াস শটের আইডিয়াতে বিস্মিত তারা এই সিনেমাটি দেখতে পারেন।

রোপ এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে, দেখলে মনে হয় সিনেমায় কোনো কাট নেই। যদিও বাধ্য হয়ে, দশ মিনিট পর পর হিচকককে কাট করতে হয়েছে। কারণ তখনকার ক্যামেরায় একটানা এর চে বেশি সময় শ্যুট করা যেত না। মুখুজ্জে মশাইয়ের আগে হিচককের মতো দুয়েকজন থ্রিলার বানানোর ‘চেষ্টা’ করেছেন। একবার না হয় তাঁদেরও সুযোগ দিয়ে দেখলেন।

 

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।