হার না মানার অভঙ্গুর দৃঢ়তা

২২ গজে যেমন, তেমনি কাল ম্যাচ শেষে প্রেস কনফারেন্সেও সেঞ্চুরি করেছেন ইমরুল কায়েস। মাইক্রোফোন-ক্যামেরা-রেকর্ডারের সামনে খুব ভালো বক্তা হিসেবে তার পরিচিতি কখনোই ছিল না। কাল খানিকটা অন্যরূপেই আাবির্ভুত হলেন।

তার একটি কথা আলাদা করেই বলছি। বারবার দলের বাইরে যাওয়ার আর ফিরে আসা নিয়ে ইমরুল বললেন, ‘আমার সঙ্গে অনেক ক্রিকেটারের অভিষেক হয়েছে, খেলেছে। তাদের অনেকে এখন দৃশ্যপটেও নেই। আমার কাছে মনে হয় যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি বিশ্বাস করি যে আমার ক্যারিয়ারে এত কম সময়ে শেষ হতে পারে না। আমি সবসময় নিজেকে প্রস্তুত রাখি। যতদিন খেলব, জাতীয় দলে খেলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখি। যেদিন জাতীয় দলে খেলার চান্স থাকবে না, নিজেই বলব থ্যাংক ইউ।’

হিউম্যান সাইকোলজির ব্যাপারটা অদ্ভূত। এটি নিয়ে আমাদের ধারণাও। অনেকের মধ্যেই অভাবনীয় সব বৈপরীত্য থাকে। ক্রিকেট ভীষণরকম সাইকোলজিক্যাল খেলা বলে এই জগতটা মানুষের মন গবেষণার আদর্শ জায়গাও। মুশফিকের কথাই ধরুণ। যতবার দলকে বিপদ থেকে টেনে তুলেছেন, যতবার চোট-টোট নিয়ে লড়াই করেছেন, মাঠের ভেতরে-বাইরে যেভাবে শৃঙ্খলাদ্ধ জীবন কাটান, তার মানসিক দৃঢ়তা দুর্দান্ত, বলতেই হবে। আবার এই মানুষটিই বেশ কবার আবেগের বশ হয়ে গেছেন, ছেলেমানুষি করেছেন।

ইমরুল কথায়, স্বভাবে নরম-সরম। মাঠেও তার শরীরী ভাষা, তার মানসিক দৃঢ়তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে অনেকবার। হয়তো চাপে ভেঙে পড়েছেন, কাজ শেষ করে আসতে পারেননি, পরিস্থিতির দাবি মেটাতে পারেননি। এসব কারণেই এত বছর খেলেও দলে থিতু হতে না পারেননি, সমসাময়িক হয়েও ওই ৫ সিনিয়রের মতো ‘সিনিয়র’ হতে পারেননি। কিন্তু এখানেও দারুণ উজ্জ্বল এক উল্টোপিঠ আছে!

ইমরুল যেমন বলেছেন, তার সময়ের অনেকে ঝরে গেছেন। তিনি টিকে আছেন। আমরা তার বারবার দলে ফিরে আসার কথা অনায়াসেই কয়েক লাইনে বা কয়েক শব্দে বলে ফেলি। কিন্তু এটির পেছনে কত শ্রম-ঘাম, কত মানসিক যুদ্ধ জয়ের গল্প আছে, সেটা গভীর ভাবে ভাবি কমই। যতবার বাইরে গিয়েছেন, নিজেকে বলেছেন, ‘আমার ক্যারিয়ার এত কম সময়ে শেষ হতে পারে না’ – এটা তো মেন্টাল টাফনেসের দুর্দান্ত এক উদাহরণ। আপাত ‘সফট’ ইমরুলের ভেতরটায় আছে প্রতিজ্ঞা জয়ের কাঠিন্য, হার না মানার অভঙ্গুর দৃঢ়তা।

আবার, তার আবেগের ‘ছোট্ট’ একটি নমুনাই দেই। ক্রিকেটারদের হেলমেটে ক্রিকেট বোর্ডের মনোগ্রাম থাকে। ইমরুলের একদিন মনে হলো, এখানে দেশের চিহ্ন কেন থাকবে না? ব্যস, হেলমেটে বোর্ডের মনোগ্রামের ওপর দেশের পতাকা লাগিয়ে মাঠে নামতে শুরু করলেন। বেশির ভাগ সময়ই চেষ্টা করেন এটি করতে। তাতে নিজেকে অনুপ্রাণিত করা যায়। দেশের প্রতি নাকি তার অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করে।

ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বললে, গতকালকের আগেও কয়েকবার টুকটাক চমকে দিয়েছেন ইমরুল। মুশফিক চোট পাওয়ায় ১২০ ওভার কিপিং করে পরে আবার ১৫০ রানের ইনিংস খেলেছেন ৬ ঘণ্টা ব্যাট করে। ক্রিকেট স্কিল আর ফিটনেসের প্রমাণ তো বটেই, তার মেন্টাল টাফনেসেরও প্রমাণ ছিল সেটি। দুই বছর আগে এই মিরপুরেই ইংল্যান্ডের সঙ্গে দারুণ এক সেঞ্চুরি করেছেন।

কদিন আগে এশিয়া কাপের মাঝপথে হুট করে ডাক পেয়ে, ম্যাচের আগের দিন মাঝরাতে দুবাই পৌঁছে, সকালে আবু ধাবি গিয়ে জীবনে প্রথমবার তিনের নিচে ব্যাট করে যে ইনিংস খেললেন, সেটিও তার স্কিল ও মেন্টালিটির বড় প্রমাণ। তার পরও কালকে ইনিংসটি আমার কাছে অন্যরকম।

প্রতিপক্ষ ভুলে যান, পরিস্থিতি ভাবুন। চাপটা ভাবুন। বোলিং আক্রমণ যেমনই হোক, শুধু ভাবুন যে ইমরুল টিকে না থাকলে দল দুইশও করতে পারত না। তাহলে মাহাত্ম্য কিছুটা বোঝা যাবে। এক প্রান্ত আগলে রেখেছেন, দলকে টেনেছেন, সময় মতো ঝড় তুলেছেন। যখন যা দরকার ছিল, কাল সব করেছেন ইমরুল, সব। শুরুর দিকে লাইফ মতো পেয়েছিলেন বটে। সেটুকু ছাড়া নিখুঁত ও প্রায় আদর্শ ওয়ানডে ইনিংস।

তার শরীরী ভাষা, ব্যাটিংয়ে আরেকটু অভিপ্রায়ের ছাপ রাখা, এসব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে নানা সময়ে। এ দিন তার ব্যাট দিয়েছে শুধু উত্তর। ক্যারিয়ারে অনেকবারই তিনি এক প্রান্ত আগলে রেখেছেন। কিন্তু শেষ করতে পারেননি কাজ। অনেকবারই দারুণ শুরু করেছেন। বড় করতে পারেননি ইনিংস। অনেকবারই দলকে আশা দেখিয়েছেন। পূরণ করতে পারেননি পুরোটা। এই ইনিংসে সবকিছু মিলিয়েছেন এক বিন্দুতে।

নিজের প্রিয় শটগুলো যেমন খেলেছেন, ইনিংসটির পথে উদ্ভাবনী কিছু শটও দেখিয়েছেন ইমরুল। পেসারকে মাথার ওপর দিয়ে যেমন উড়িয়েছেন, তেমনি শাফল করে সুইপের মতো খেলে পাঠিয়েছেন বাউন্ডারিতে, জায়গা বানিয়ে গুলির বেগে চার মেরেছেন এক্সট্রা কাভার দিয়ে। স্পিনারদের স্লগ সুইপে উড়িয়েছেন, আবার রিভার্স সুইপে গুঁড়িয়েছেন।

আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, এই ইনিংসটি ইমরুলকে পরের ধাপের পথে নিয়ে যেতে পারে। যেভাবে খেলেছেন, তাতে নিজের সামর্থ্যের সীমানাটা নতুন করে জানতে পেরেছেন ইমরুল। এখন সাহস পাবেন আরও উচ্চতায় ওঠার, আরও বড় স্বপ্ন দেখার। নির্বাচক, টিম ম্যানেজমেন্ট বা দল সংশ্লিষ্টদের কারও যদি তার সামর্থ্য বা উপযোগীতা নিয়ে কোনো রিজার্ভেশন বা অস্বস্তি থাকে, এই ইনিংসের পর তাদের ভাবতে হবে নতুন ভাবে। শঙ্কা শুধু একটিই, একটু থিতু হওয়ার পর আত্মতৃপ্তি তাকে পেয়ে না বসলেই হয়।

সামনের দিকে তাকিয়ে, বিশ্বকাপের কথা ভেবে, ইংল্যান্ডের উইকেটে ইমরুল কতটা কার্যকর হবেন, সঙ্গী হিসেবে তামিমকে কতটা কমপ্লিমেন্ট করতে পারবেন, একজন লিটন বা সৌম্য আরও বেশি বিস্ফোরক বা কার্যকর হবেন কিনা, এসব ভাবনা থাকতে পারে অনেকের। লিটন বা সৌম্য তিনি নন, তবে ইমরুল কিন্তু ঠিকই নিজের মধ্যে থেকেই নিজেকে ভেঙে-গড়ে নিজের পথ ঠিকই বের করে নিচ্ছেন।

ক্রিকেটার হিসেবে কতটা উচ্চতা শেষ পর্যন্ত ছুঁতে পারবেন বা কোথায় থাকবেন, সেটি বলে দেবে সময়। তবে একটি বাস্তবতা তিনি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। আমি-আপনি তাকে পছন্দ করি বা না করি, নায়ক হিসেবে দেখি বা না দেখি, সম্মান করি বা না করি, তাকে অগ্রাহ্য করা যাবে না কখনোই। ভাবনার দুয়ারে তিনি টোকা দিয়েই যাবেন!

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।