জ্যাকি শ্রফ: বস্তির বড় ভাই, জনগণের নায়ক

নেপোটিজম কিংবা স্বজনপ্রীতি নিয়ে বলিউডে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক হয়। এখানে স্টারকিডরা তাদের যোগ্যতার চেয়ে অনেক বেশি সুযোগ পান। প্রথম সিনেমায় ব্রেক, টিকে থাকার জন্য একের পর এক সিনেমা পাওয়া – সবই বেশ আরামেই মিলে যায়।

এই নিয়ে যখন সমালোচনায় চলে, তখন এটাও বলে দেওয়া দরকার যে এমনও অনেক অভিনেতা এই ইন্ডাস্ট্রিতে আছেন যারা প্রচণ্ড দারিদ্রতা থেকে উঠে এসে বিচরণ করছেন লাল গালিচায়। তেমনই একজন হলেন জ্যাকি শ্রফ।

জ্যাকি শ্রফের আসল নাম জ্যায়কিশান কাকুভাই শ্রফ। বড় হয়েছেন দক্ষিণ মুম্বাইয়ে। মালাবার হিলের তিন বাত্তিতে একটা চওলে (বস্তির আধুনিক সংস্করণ) ছিল তাদের বসবাস। বাবা ছিলেন জ্যোতিষী, ভবিষ্যদ্বানী করে বেড়ান। ছেলের জন্মের পরই বলেছিলেন, বড় হয়ে অভিনেতা হবেন জ্যাকি।

মা ছিলেন কাজাখস্তানের। বস্তি এলাকায় জ্যাকিকে সবাই জাগ্গু দাদা বলে চিনতো। পানিতে ডুবে বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর আক্ষরিক অর্থেই তিনি বড় ভাইয়ের মত বস্তির বাসিন্দাদের পাশে থেকেছেন। ঠিক সিনেমার মত গল্প।

স্ত্রী আয়েশা দত্ত ও ছোট্ট টাইগার শ্রফের সাথে

জ্যাকির মায়ের গল্পটা অনেক বেশি নির্মম।  জ্যাকি শ্রফের নানি ছিলেন সুদূর চীনের মানুষ। আদিবাস কাজাখস্তানে ১৯০০ শতকের শুরুতে সামরিক বাহিনীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তিনি সাত মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে চলে আসেন লাদাখে। সেখানে তাঁরা মুক্তা সংগ্রহ করে বিক্রির কাজ করতেন।

ছোটাছুটি চলেছিল এর মধ্যেও। লাদাখ থেকে লাহোর যান, সেখান থেকে দিল্লী আসেন। এরপর গন্তব্য হয় মুম্বাই, তখনকার বোম্বে। এই শহরেই জ্যাকির বাবার সাথে পরিচয়। সেখান থেকে প্রেম, অত:পর বিয়ে।

এবার আবার জ্যাকির গল্পে ফিরি। বস্তির বড় ভাই জ্যাকি কি করে অভিনেতা বনে গেলেন? – এই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে তিনটি গল্পে।

প্রথম গল্পটা হল জ্যাকির মডেলিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ার। জ্যাকি শ্রফ কাজ করতেন একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে। একদিন মডেলিং এজেন্সির এক কর্মকর্তা তাকে বাস স্টপেজে দেখে পছন্দ করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘মডেলিং করবে?’ জ্যাকির পাল্টা প্রশ্ন, ‘টাকা-পয়সা দেবে তো?’ ব্যস, বনিবনা হওয়ায় সেখান থেকে শুরু হয় জ্যাকির মডেলিং ক্যারিয়ার।

আর সেই ক্যারিয়ারটাই অভিনয় জগতে জ্যাকির প্রথম পদক্ষেপ। দ্বিতীয় সুযোগটা তাঁকে দিয়েছিলেন আশা কে চন্দ্র। আশা বুঝেছিলেন, জ্যাকির মধ্যে প্রতিভা আছে।  তাই বলেছিলেন, তাঁর কাছে গিয়ে অভিনয়ের তালিম নিতে। একই সাথে  অভিনয় শিখতে আসা তরুণদের ক্লাসও নিতে থাকেন জ্যাকি। এই আশার কাছে এর আগে অভিনয়ের তালিম নিয়েছেন ডিম্পল কাপাডিয়া, নাগমা, সানি দেওল, অক্ষয় কুমার থেকে শুরু করে অনেকেই।

সেখান থেকে জ্যাকি শ্রফ তৃতীয় সুযোগ পান যখন তাঁরই ছাত্র হয়ে আসেন কিংবদন্তিতুল্য অভিনেতা দেব আনন্দর ছেলে সুনীল আনন্দ। নিজের ছাত্রর কাছে তিনি দেব আনন্দ’র সাথে দেখা করার আবাদ করেন। সুযোগও মিলে যায়।  জ্যাকিকে দেখে চিরসবুজ দেব আনন্দ বলেন, ‘আজ সকালেই তোমার মত একজনকে খুঁজছিলাম, আর সন্ধ্যায় তুমি আমার চোখের সামনে চলে আসলে।’

দেব সাহেব জ্যাকিকে ‘স্বামী দাদা’ সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দিলেন। প্রস্তাব লুফে নিলেন জ্যাকি। তরুণ হিসেবে এটা ছিল তাঁর জন্য বিশাল একটা সুযোগ। তবে, এরচেয়েও বড় সুযোগ তিনি পান এরপরের বছর, ১৯৮৩ সালে। সুভাষ ঘাইয়ের সিনেমা ‘হিরো’র লিড হিরোর চরিত্র। ছবিটি আকাশচুম্বি সাফল্য পেল।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকানো নয়। বলিউডে গোড়াপত্তন হল স্মরণীয় আর সাফল্যমণ্ডিত এক যাত্রার। একটা সময় গিয়ে অনিল কাপুরের সাথে জমে গেল জ্যাকি শ্রফের জুটি। দু’জনে মিলে ‘আন্দার বাহার’, ‘যুদ্ধ’, ‘রাম লাখান’, ‘১৯৪২ লাভ স্টোরি’ ও ‘পারিন্দে’র মত সিনেমা উপহার দিলেন। পারিন্দে সিনেমার জন্য ১৯৯০ সালে ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান জ্যাকি শ্রফ।

দীর্ঘদিনের প্রেমিকা অভিনেত্রী, মডেল ও প্রযোজক আয়েশা দত্তকে বিয়ে করেছেন ১৯৮৭। দুই সন্তান তাঁদের – টাইগার শ্রফ, কৃষ্ণা শ্রফ। ড্যান্সিং ও অ্যাকশন হিরো হিসেবে সম্প্রতি বেশ সুনাম কুড়াচ্ছেন টাইগার।

জ্যাকি শ্রফ আজো ধরে রেখেছেন তাঁর আগের আবেদন। এখনো যখন কোনো সিনেমা ভিলেন বা সহকারী অভিনেতার চরিত্র করেন, মনে হয় এই চরিত্রটা অন্য কাউকে দিলে জ্যাকির মত ভাল হত না!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।