আমি ক্রিকেট বলছি…

আমি ক্রিকেট।

বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা। বিভিন্ন রেটিং আমাকে বিশ্বের দ্বিতীয় জনপ্রিয় খেলা বলে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবে আমার প্রবল জনপ্রিয়তা রয়েছে এশিয়ার কিছু দেশ, আফ্রিকার কিছু দেশ, ইউরোপের কিছু দেশ, ওশেনিয়ার দুটিদেশে।

লোকে আমাকে অন্য খেলাদের থেকে আলাদা করে দেখে,

আমাকে তারা ডাকে, ‘খেলার রাজা’।

বলবেই না কেন বলুন?

ক্রিকেট খেলতে যতগুলো স্কিল দেখাতে হয়, অন্য কোন খেলায় এতগুলো স্কিলের চিন্তাভাবনা আছে বলুন তো?

এনাফ ফিটনেস, স্ট্রেন্থ, ডেলিকেসি অফ টাচ, ফ্লেক্সিবিলিটি, সুপারভ রিফ্লেক্সেজ, বিড়ালের মত ফুটওয়ার্ক,বাজপাখির মত চোখ, পাকা জহুরির মত একুরেসি, তীব্র মনোযোগ আর স্পষ্টতা ছাড়া আপনি ক্রিকেট খেলার কথা কল্পনা করতে পারবেন না। একটা টপ ক্লাস ক্রিকেট ম্যাচ হলো সাহস, স্পর্ধা, ধৈর্য, আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ , বিচারবুদ্ধি, কল্পনা, অভিজ্ঞতা আর দূর্দমনীয় প্রতিরক্ষার মিশ্রণ। দুনিয়ায় আর কোন খেলা নেই যেখানে আপনাকে এতগুলো টার্ম নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে। ক্রিকেট বিজ্ঞানের সূত্রের বাহ্যিক প্রয়োগ ঘটায়। ক্রিকেট একনায়কতন্ত্রে বিশ্বাসী না, তাই একদম একা কোন ম্যাচ কেউ আজ পর্যন্ত জেতায়নি। তাই ক্রিকেট আলাদা, ক্রিকেটের মহীমা বিশুদ্ধ, ক্রিকেট সেরা, ক্রিকেটের আবেদন কখনো কমার নয়।

তাইতো বিখ্যাত ক্রীড়া লেখক ইয়ান ম্যাকডোনাল্ড লিখেছিলেন, ‘আমাকে যদি উইম্বলডন জেতা আর লর্ডসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে একটা টেস্ট সেঞ্চুরির ভেতর যেকোন একটা বেছে নিতে বলা হতো তাহলে আমি নিশ্চিতভাবে সেঞ্চুরিটাকেই বেছে নিতাম।’

একটা সেঞ্চুরি কিংবা পাঁচ উইকেট যে অপরিসীম ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস, দক্ষতা, পরিকল্পনা এই সবকিছুর মিলিত চেষ্টার ফল হিসেবে আসে।

আর্ন্তজাতিক আঙিনায় আমার শুরুটা ১৮৭৬ সালে। দুটি জাতি মুখোমুখি হয়েছিল এমসিসি মাঠে, ইংল্যান্ড বনাম অস্ট্রেলিয়া। সবাই অবাক চোখে দেখল উপনিবেশ একটি দেশ শাসকদের হারিয়ে দিল! আমার শুরুটাই হলো চমক দিয়ে।

তার আগে বলি আমার জন্মের সময়কার কিছু ইতিহাস। অন্যান্য অনেক খেলার মতই আমার জন্ম ইংল্যান্ডে।  আমার জন্মের সময় নিয়ে অনেকেই করেছেন বিতর্ক।

১৫৯৮ সালে একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছিল এবং সেটি অনুসারে ১৫৫০ সালের দিকেও ক্রিকেট প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু ক্রিকেটের আসল উৎপত্তি কবে কোথায় হয়েছিল, তা এখনও এক রহস্য। তবে মোটামুটি দৃঢ়ভাবেই বলা যায় যে ১৫৫০ সালের আগেও দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের কেন্ট, সাসেক্স ও সারি কাউন্টিগুলিতে, বিশেষ করে ওয়েল্ড নামের অঞ্চলটিতে, ক্রিকেটের প্রচলন ছিল। অন্যান্য খেলা থেকে ক্রিকেটের একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, এটি খেলার জন্য অপেক্ষাকৃত ছোট দৈর্ঘ্যে ঘাসবিশিষ্ট মাঠের প্রয়োজন হত, কেন না, ১৭৬০-এর দশকের আগ পর্যন্তও ব্যাটসম্যানকে মাটিতে গড়িয়ে বল করা হত। একারণে যেসমস্ত জায়গায় বনাঞ্চল সাফ করা হয়েছিল, কিংবা ভেড়া চরানো হত, সেই সমস্ত জায়গাই ক্রিকেট খেলার জন্য উপযোগী ছিল।

ক্রিকেটের শুরুর দিকের বছরগুলোর উপর তথ্যের অভাব দেখে বোঝা যায়, এটি আসলে সম্ভবত ছোট বাচ্চাদের খেলা ছিল। ১৭’শ শতকে এসে শ্রমিকেরা এটি খেলা শুরু করে।

রাজা প্রথম চার্লসের সময় অভিজাত শ্রেণী খেলাটির প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করে। ক্রিকেট খেলার চেয়ে ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে জুয়া খেলার সুযোগই তাদের বেশি আকৃষ্ট করেছিল। ক্রমে ক্রিকেটে প্রচুর বিনিয়োগ হওয়া শুরু হয় এবং লন্ডন ও দক্ষিণ ইংল্যান্ডে এটি একটি জনপ্রিয় বিনোদনে পরিণত হয়। এসময় বড় বড় ক্লাব ও পেশাদার ক্রিকেট খেলোয়াড়ের আবির্ভাব ঘটে।

ক্রিকেটের উৎস সম্বন্ধে এছাড়াও আরো অনুমান করা হয়, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য যে এই খেলা ফ্রান্স অথবা ফ্লেন্ডার্সে শুরু হয়েছিলো। এই অনুমানের ক্ষেত্রে প্রথম ক্রিকেট খেলার তারিখ ১০ মার্চ, ১৩০০ সালে এবং এটা ধারণা করা হয় যে, পরবর্তীকালে রাজা দ্বিতীয় এডয়ার্ড ‘ক্রেগ (ইংরেজি creag) এবং অন্যান্য খেলা’য় খেলেছিলেন ওয়েস্টিনস্টার এবং নিউএন্ডেন নামক দুটি জায়গায়। এটাও ধারণা করা হয় যে, ‘ক্রেগ’ হল ক্রিকেটেরই একটি পুরাতন ইংরাজি ভাষার শব্দ। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে এর আগে এটি ছিল “ক্রেইক (ইংরেজি craic)”, যার মানে ‘সর্বজনীন মজা এবং খেলা’।

১৮ শতকের দিকে ধীরে ধীরে সাধারণ মানু্ষের কাছে খেলাটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ লর্ডরা নিয়মিতই নিজেদের মাঝে ক্রিকেট খেলতেন। আবার বিভিন্ন ক্লাবে ক্রিকেট খেলা নিয়মিত হতে থাকে।

১৭৯০ সালের দিকে ক্রিকেটের কিছু নিয়ম লিপিবদ্ধ করা হয়। এবং কিছু সরঞ্জামেরও নির্দেশনা দেয়া হয়।

অষ্টাদশ শতকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় প্রথম ক্রিকেট খেলার প্রচলন করে। ১৭৯২ সালে প্রথমবারের মতো ক্রিকেট খেলা আয়োজনের কথা জানা যায়। সম্ভবতঃ আরও একদশক পূর্বে খেলাটি অনুষ্ঠিত হতে পারে। ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ ভারতে বিসিসিআই রঞ্জি ট্রফি প্রতিযোগিতার প্রচলন ঘটায়। ১৯৩৮-৩৯ মৌসুমে বাংলা শিরোপা লাভ করে। ভারত বিভাজনের ফলে বাংলাও বিভক্ত হয়ে যায়। ১৯৫৪ সালের পূর্ব পর্যন্ত পূর্ব বাংলা আনুষ্ঠানিকভাবে কোন খেলায় অংশ নেয়নি।

তবে বাংলার অনেক জমিদার ক্রিকেট খেলা প্রচলনে অবদান রাখেন। প্রথম টেস্ট অনুষ্ঠিত হয় মূলত এমসিসি ক্লাবের উদ্যোগে, তখনকার সবচেয়ে বড় এই ক্লাবটি আজও ক্রিকেটের অন্যতম শীর্ষ একটি ক্লাব।

ক্রমে ক্রমে ক্রিকেটে দল বাড়তে থাকে। দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত দল এ খেলায় অংশগ্রহণ করে। ক্রিকেট ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলোকে যেভাবে ঐক্যবদ্ধ করে তা ছিল অভূতপূর্ব।

তবে ক্রিকেট শুরুর দিকে অনেক বেশী সময় নিয়ে হতো, তাই এ খেলাকে অনেকেই পছন্দ করতেন না।

হিটলার ক্রিকেট খেলা দেখতে এসে ৩য় দিনে বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, ‘অযথা সময় নষ্ট ও বিরক্তিকর, এসময়ে আমি দুটি দেশ জয় করতে পারতাম।’ তিনি জার্মানিতে ক্রিকেট নিষিদ্ধ করে দেন।

আমার খুব খারাপ লেগেছিল তখন, তবে সান্তনা খুঁজে পেয়েছি বোদ্ধাদের কথাতে, ‘সময়ের পরিক্রমায় ক্রিকেটের সময়কে যতই ছোট করা হোক, টেস্ট ক্রিকেটের রোমাঞ্চ আর কেউ দিতে পারবেনা।’

সত্যিই তো! প্রতি সেশনে রঙ বদলানো, ব্যাটসম্যানের চোখে চোখ রেখে বাউন্সার দেয়া, পিচে রক্ত ছোটানো, আবার পালটা জবাবে ব্যাটসম্যানের সাহসী হুকে ছক্কা! মুহুর্মুহু স্লেজিং, উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, পরক্ষণেই ঠান্ডা, দুই প্রতিপক্ষ হাসছেন কাঁধে হাত রেখে। এই থ্রিল আর কোথায় পাবেন?

দিনশেষে যে ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা।  খেলা শেষে করমর্দন, একে অন্যকে অভিনন্দন জানানো যেন তাই মনে করিয়ে দেয়।

ক্রিকেট ক্রমেই ছড়িয়ে যাচ্ছে, সবাই ক্রিকেটকে ভালবেসে যাচ্ছে। প্রায় ১১১টি দেশ এখন ক্রিকেট খেলে। আমার অভিভাবক আইসিসির পরিকল্পনা আমাকে আরো ছড়িয়ে দেয়ার, তাদের নিরলস পরিশ্রম আমাকে সজীব করে তোলে।

সবুজ মাঠ, ২২ গজের পিচ বুকে নিয়ে আমি নিজেকে ভালবেসে যাই অবিরাম।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।