ভীনদেশে জন্মালে কেমন হতেন সাকিব?

স্কুলজীবনে সেলিব্রেটিদের ছবি সমৃদ্ধ ক্যালেন্ডার কিনতে পাওয়া যেত। এই ধরুন নায়ক রিয়াজ, সালমান খান, পূর্নিমা, সাদ্দাম হোসেইন, ওসামা বিন লাদেন, জ্যাক ক্যালিস, শচীন টেন্ডুলকার, মোহাম্মদ আশরাফুল, আব্দুর রাজ্জাক, মাশরাফি বিন মুর্তজা, হাবিবুল বাশার, সাকিব আল হাসান প্রমুখ। অনেকবার এগুলো কিনেছি।

একবার সাকিব আল হাসানের একটি ছবি কিনেছিলাম। ছবিতে লেখা ছিল ‘আ গোল্ডেন বয়’। সাকিব তো সোনার ছেলেই। রেডিওতে খোদা বক্স মৃধা একবার সাকিবকে গোল্ডেন বয় বলেছিলেন। পরে চৌধুরী জাফরউল্লাহ শরাফতের কন্ঠে প্রায়শই শোনা যেত এই বাক্যটি। ওরা তো আর ভুল বলেনি। ২০০৯ সালে ত্রিদেশীয় সিরিজের মাধ্যমে সাকিব যখন আফ্রিদি, যুবরাজ, ভেট্টরি, ক্যালিসদের টপকে এক নম্বর অলরাউন্ডার হলো, তখন আর বোঝার বাকি রইল না। সে তো আসলেই সোনার ছেলে! গুরু মশাইয়েরা আসলেই ভুল বলেননা কখনো।

দিন যায় মাস যায়। সাকিব সোনার ছেলে থেকে হীরার ছেলেতে পরিনত হয়। কিন্তু কপাল খারাপ তাঁর! কারণ সে বাংলাদেশে জন্মেছে। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়ায় তার ভুল ওখানেই, কারন সে যথেষ্ট ম্যাচ পায়না। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারত যখন ম্যাচের পর ম্যাচ পায় আর বাংলাদেশ ম্যাচের অভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকে তখন অনেকেই ভাবে এখানে সাকিবের জন্ম নেওয়াই ভুল হয়েছে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকে তো আর অস্বীকার করা যায়না!

১৪ মাস পরে বাংলাদেশ টেস্ট ম্যাচ খেলতে নামছে। এই ১৪ মাসের ভিতরে দেখা গেছে ইংল্যান্ড ১৪ টা টেস্ট খেলে ফেলেছে কিংবা স্ট্রুয়াট ব্রড বল হাতে ১৪ টেস্টে ৬০ উইকেট এমনকি ডেল স্টেইন ৯ ম্যাচে ৫১ উইকেট নিয়েও ফেলেছে। ব্যাট হাতে থেমে নাই মাইকেল ক্লার্ক কিংবা অ্যালিস্টার কুকেরা, তারা করে ফেলেছে দেড় হাজার রান! আর সাকিব তো একটি টেস্ট ও খেলতে পারেনি ম্যাচ না থাকায়। কিভাবে খেলবে বলুন, সে তো বাংলাদেশি ক্রিকেটার, ম্যাচ পাবে কই?

হঠাৎ মনে প্রশ্ন জাগল, আচ্ছা সাকিব যদি অস্ট্রেলিয়ায় জন্মগ্রহণ করত তাহলে সে কি  হইত? এক মন বলল সে হয়ত অ্যালান ডেভিডসন বা টনি গ্রেগ হইত। আরেক মন বলছে, নাহ, সাকিব হয়তো কেইথ মিলার হইতো। আরেক মন বলছে, ধুরো, সাকিব হইত একজন স্টিভ ওয়াহ।

কিন্তু এটা তো শুধু কল্পনাই। তো আর ভেবে কিইবা লাভ। কিন্তু ভাবতে তো আর টাকা লাগেনা। তাহলে ভাবাই যাক। মন চলে যেতে লাগল কল্পনায়।

এবার কৌতুহলী মন জানতে চাইল সাকিব দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্মালে কার মত হতো। বিভিন্ন মন বিভিন্ন নাম প্রকাশ করল। কেউ বলল ব্রায়ান ম্যাকমিলান, কেউ বলল হ্যান্সী ক্রুনিয়ে, কেউ বলল ল্যান্স ক্লুজনার, কেউ বলল শন পোলক। কিন্তু কেন যেন বিশ্বাস করতে পারলাম না। এরা অলরাউন্ডার ছিল ঠিক আছে, তবে সব্যসাচী নয়।

সব্যসাচী তো তারাই যাদের দু হাত সমানে চলে, যাদের ব্যাট বল সমানে চলে। তখন আরেক মন বলে উঠল জ্যাক ক্যালিসের কথা। তখন বুঝ আসলো আসলে সেটাই। সাকিব ব্যাটেও যেমন বলেও তেমন। তাহলে সাকিব ওই জ্যাক ক্যালিসের মত হইত।

মনের ভিতরে এখন হরেক রকমের বাদ্যযন্ত্র বাজতে শুরু করেছে। প্রতিটি দলকে নিয়ে এখন সাকিব – সাকিব গেম খেলতে হবে। তাহলে এবার খেলা যাক নিউজিল্যান্ড কে নিয়ে। সাকিবের জন্ম যদি নিউজিল্যান্ডে হত? তাহলে সাকিব হয়ত ডেনিয়েল ভেট্টরি হইত নতুবা ক্রিজ কোয়ার্নস হইত। ধুরো না, সাকিব তাদের তুলনায় ভালো। সাকিব মোটেও কোয়ার্নস এর মত নয়। সাকিব দেশের জন্যই খেলে, আর কোয়ার্নস ফিক্সিংয়ে জড়িত ছিল। তাইলে? তাহলে সাকিব হইতেন সোজা পরিভাষায় রিচার্ড হেডলি।

আচ্ছা সাকিব যদি ইংল্যান্ডে জন্মাতো?

তাহলে সে হইত একজন উইলফ্রেড রোডস নতুবা ইয়ান বোথাম। আর যদি পাকিস্তানে জন্মাতো? তাহলে তিনি হইতেন ইমরান খান। আর ভারতে জন্মালে? তিনি হতেন কাপিল দেব। শ্রীলঙ্কায় জন্মালে? না, শ্রীলঙ্কায় সাকিবের সমতুল্য সব্যসাচী অলরাউন্ডার কাউকেই দেখছিনা। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজে জন্মালে? এটা কি আর বলা লাগে! স্যার গ্যারিফিল্ড সোবার্স হইতেন।

আপাতত কল্পনা শেষ। তবে এটাকে বাস্তবে বললে কেউ মনক্ষুন্ন হবেনা। আমি নিশ্চিত কেউ এটা নিয়ে কটুক্তি করবেনা, কেউ ধমক দিয়ে বলবেনা, ‘ব্যাস, অনেক বলেছো। আর না এবার থামো।’ আসলে এটা অস্বীকারের কিছুই নাই। সাকিব ওইসকল দেশে জন্মালে হয়তো ওইসকল কিংবদন্তীর সমানই হইত।

বিরাট কোহলি তার টেস্ট ক্যারিয়ারে যতদিন টেস্ট খেলেছে সেই সময়ে সাকিব টেস্ট খেলেছে ৩০ টি অথচ ভিরাট খেলেছে ৬৬টি ম্যাচ। কেন উইলিয়ামসন ততদিন খেলেছে ৫৮টি, স্টিভ স্মিথ খেলেছেন ৫৫টি। এই সময়ে অ্যালিস্টার কুক খেলেছেন ৮৪টি টেস্ট যেটা কিনা সাকিবের চেয়ে প্রায় তিন গুন। অথচ এই সময়ের ভিতরে সাকিব কখনো লম্বা সময়ের জন্য ইনজুরিতে পড়েননি। তার পরেও সাকিবের টেস্ট ম্যাচ সংখ্যা মাত্র ৩০ টি।

একজন সাকিব যে দলের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা আমরা উপলব্ধি করতে পারি যখন সাকিব বিহীন কোনো ম্যাচ খেলতে নামি। তখন বারবার স্মরণ করি সাকিবকে। একবার ইনজুরিতে পড়লে বারবার খোঁজখবর নেওয়া হয় তার। তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন, তার এখনকার অবস্থা কি, কখন তিনি সুস্থ হবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। সাকিব ছাড়া বাংলাদেশের ম্যাচ মানেই যেন লবনছাড়া তরকারির মত। কষ্ট করে খেতে পারলেও গলা দিয়ে গিলতে মন চায়না আর কি।

এই কদিন আগে ইনজুরিতে পড়লেন সাকিব। এই তিনি সেরে উঠছেন উঠছেন বলে সবার ভিতরে গুঞ্জন। সবাই ভাবছিল ত্রিদেশীয় সিরিজে তিনি ফিরবেন, সেটা হয়নি। টেস্ট সিরিজেও পাওয়া গেল না তাকে। ভক্তরা এবার অপেক্ষায় থাকলো নিদাহাস ট্রফিতে হয়তো তাকে পাওয়া যাবে। নামও ঘোষনা করা হলো সাকিবকে অধিনায়ক করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল সাকিবকে এবারো পাওয়া যাবে না। এখন ভক্তদের চোখ চড়কগাছ! সাকিব ছাড়া তারা আর কত ম্যাচ দেখবে। কিন্তু ইঞ্জুরীকে তো মেনে নিতেই হবে। ওখানে যে কারো হাত নাই।

বাংলাদেশ দল যেমন ম্যাচ না পেলে সমর্থকদের ভিতরে একটা আনমনা ভাব সৃষ্টি হয় তেমনি বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাকিব, তামিমরা না থাকলেও সেটা লবনছাড়া তরকারির মতই লাগে। ক্রিকেটটা আমাদের রক্তে মিশে গেছে। আর সাকিব তামিমরা সেই রক্তের ভেতর পাল তোলা নৌকার মত বিচরন করছে। আমরা হয়তো ভাবি আমাদের রিচার্ড হ্যাডলি নাই, আমাদের শন পোলক নাই, আমাদের গ্যারিফিল্ড সোবার্স নাই, আমাদের বোথাম নাই; তবে এটা স্বীকার করি যে সাকিব তাদের দেশে জন্মালে ওই সোবার্স, বোথাম, হ্যাডলি, ডেভিডসন ই হইতেন। এতে দ্বি-মত করার কে আছে?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।