কী হতো, যদি আইয়ুব বাচ্চু কখনই গান না গাইতেন?

আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া গান নিয়ে গত কদিন হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ শব্দ ব্যয় হয়েছে। তার গায়ক পরিচয়টা এত বেশি আধিপত্য বিস্তার করে থাকে, তিনি যে গিটারের ঈশ্বর ছিলেন, সে কথাটা অনেকে ভুলে যায়। অসাধারণ সেই কন্ঠস্বরটি না থাকলে অবশ্যই তার গিটারিস্ট পরিচয়টা প্রাধান্য পেতো।

তবে তাঁর গিটারিস্ট পরিচয়ের আড়ালে কিন্তু আরেকটি পরিচয় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে! একজন সুরকার এবং মিউজিক কম্পোজার আইয়ুব বাচ্চুর অবদান আমাদের সংগীতে কী বিপুল, আমরা তার কতটুকু জানি! অনেকের একক অ্যালবামে তিনি সুর এবং মিউজিকের কাজ করেছেন, সেই গানগুলি ভালবাসা পেয়েছে শ্রোতাদের, মুখে মুখে ফিরেছে, সেখানে আইয়ুব বাচ্চু কতটুকু ছিলেন? জানতে ইচ্ছে করছে?

  • অনাবিল আশ্বাসে হৃদয়ের বন্দরে

অসাধারণ মেলোডিয়াস গানটি যারা শুনেছেন তারা নিশ্চয়ই এতক্ষণে গুণগুণ করতে শুরু করে দিয়েছেন? তপন চৌধুরীর সেই সময়ের চিরসবুজ এই গানটি একবার শুনলে ভোলা যায় না। খোশনূর আলমগীরের লেখা এই গানটিতে সুর বসিয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। শুধু এক গানটি নয়, তপন চৌধুরীর প্রথম অ্যালবামের সবগুলি গানের সুর ও মিউজিক আইয়ুব বাচ্চুরই করা ছিলো। সেই এ্যালবামের আরো কিছু জনপ্রিয় গান ছিলো পলাশ ফুটেছে শিমুল ফুটেছে, আমি কি বেঁচে আছি, মনে কর তুমি আমি, ইত্যাদি। সোলসের সাথে সূতো কেটে যাচ্ছে, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন নতুনভাবে, এই তপন চৌধুরীর ক্যারিয়ারের ব্রেক থ্রু দেয়া প্রথম অ্যালবামটি সবুজ এবং সুন্দর করেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু।

  • আমি ভেবেছিলাম, সেই তাকানোতে কিছুটা অনুরাগ কিছু ভালোবাসা ছিলো

নাসিম আলি খান। ইনিও সোলসের। সোলস মানেই যেন তারার মেলা। অসাধারণ সব কন্ঠশিল্পীরা গেয়ে গেছেন। তপন চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ, পরবর্তীতে পার্থ বড়ুয়া, সবার কাছে কিছুটা ম্লান হয়ে ছিলেন নাসিম আলি খান। সুতরাং, তার একক এ্যালবাম খুব প্রত্যাশিতই ছিলো। প্রথম সেলফ টাইটেলড একক অ্যালবামে তার সঙ্গী হন আইয়ুব বাচ্চু। তারা দুজনে মিলে উপহার দেন এক কালজয়ী গান, ‘যতীন স্যারের ক্লাসে’। ‘অগোছালো আমাকে গুছিয়ে দিলে’ গানটিও সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে থাকা। সে কতদিন আগের কথা হবে? ত্রিশ বছর? ভাবতেই অবাক লাগে!

  • গান ছুঁয়ে কথা দিলাম, তুমি আমার আমি তোমার

আইয়ুব বাচ্চুর সাথে জুয়েলের জুটিটা দারুণ ছিলো। কোন জুয়েল, চিনেছেন তো? এখন যিনি হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল নামে পরিচিত। আমরা তাকে জুয়েল নামেই চিনতাম। তপন চৌধুরী বা নাসিম আলি খানের মত জুয়েলের তেমন কোনো পূর্ব পরিচয় ছিলো না। তিনি শুরুই করেছিলেন একক এ্যালবাম দিয়ে, কোনো ব্যান্ডের ব্যাকগ্রাউন্ড ছিলো না। জুয়েল প্রতি বছরই এ্যালবাম বের করতেন, এবং প্রতিটিরই সুর এবং সংগীতে ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। প্রথম এ্যালবাম কুয়াশা প্রহরে তেমন মনে রাখার মত গান পাই নি। তবে দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘এক বিকেলে’তে মন ভরিয়ে দেয়ার মত কিছু গান ছিলো। বিশেষ করে ‘সেদিনের এক বিকেলে, তোমার চোখের জল দেখেছি, সে কথা আমি কত রাত একা একা ভেবেছি, আর জানি না কেন এত কষ্ট পেয়েছো তুমি’ বিষণ্ণ বিকেলে যে কোন যুবকের মনে হাহাকার জাগাবে সবসময়। পুরোনো মদের মত এর স্বাদ বেড়েই চলে সময়ের সাথে। ‘এক বিকেলে’ গানটি এতটায় বিষাদ আগ্রাসী, যে আমরা ভুলে যাই ঐ এ্যালবামেরই গল্পকথার গান চিলেকোঠায় এক দুপুরে, অবশেষে লিখলাম তোমাকে।

এরপর দুজনে মিলে করেছেন ‘আমার আছে অন্ধকার’, ‘একটা মানুষ’ এবং ‘দেখা হবে না’। কোনো এ্যালবামই হয়তো হটকেকের মত বিক্রি হয় নি, কিন্তু সুরপিয়াসী, বিষাদবিলাসী শ্রোতাদের আকাঙ্খা মিটিয়েছে। বিশেষ করে ‘আমার আছে অন্ধকার’কে আমি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা একক অ্যালবাম বলবো, বলবোই। এই অ্যালবামের শুধু গান না, এর কভার, ডিজাইন, ফটোগ্রাফি, সব মিলিয়ে এক অন্যরকম জার্নি ছিলো। ‘ক্লান্ত আঙুলে সিগারেট ছুঁয়ে’, ‘চোখ জোড়া পড়ে থাকে গানের খাতা’, ‘চোখের জল ঢেলে এঁকেছি নদী, চলে যাওয়া পথ ধরে তুমি ফেরো যদি’, কোনটার চেয়ে কোনটাকে ভালো বলবো? কত রাত যে কেটে গেছে এই গানগুলি শুনে!

  • সুখী মানুষ পথ চলে দুখের ছায়ায় ছায়ায়

আইয়ুব বাচ্চু বাংলাদেশের সঙ্গীত আন্দোলনের অনেক পালাবদলের সাথে জড়িত। প্রথম ডাবল এ্যালবাম, প্রথম ১২ মিনিটের গান, প্রতি বছর একটা করে অ্যালবাম করা, লিরিকে তুমুল বদল, এর ধারাবাহিকতায় তিনি নিয়ে এলেন কানিজ সুবর্নাকে। বাংলাদেশের প্রথম নারী রকস্টার! তার প্রথম অ্যালবাম ‘ভালোবাসা মানে’র গানগুলি ছিলো একদম রক/পপ ব্লেন্ডের এক দারুণ প্যাকেজ! আমরা তো এই অ্যালবাম শুনে অবাক! এই মেয়ে করছে টা কী!

ডিসটর্শন আর রিফের সাথে চিৎকার করে গাইছে! আইয়ুব বাচ্চু অন্যান্যদের একক এ্যালবাম করার সময় নিজের নরম দিকটা প্রকাশ করেছেন, তবে তার পছন্দ যে রক, এটা তো আমরা জানিই! কানিজ সুবর্ণার এই এ্যালবামটিতে চুটিয়ে গিটার বাজিয়েছেন, আর নতুন আসা মেয়েটাকে সাহস যুগিয়েছেন সামনে যাবার। যাদের একদম নিখাঁদ রোমান্টিক গান পছন্দ তাদের জন্যে তো টাইটেল ট্র্যাক ‘ভালোবাসা মানে’ আছেই, পিওর এবি রক ফ্লেভার পাবেন ‘স্পর্শ’ আর ‘সুখী মানুষ’ গানে, আর ‘পরানে পরানে’র সাথে তো পরান মিলেই যাবে!

  • তুমি ফিরিয়ে দিলে আমায়, জানি না কোন অবহেলায়

ঝলক। না, ঝলক অন্যদের মত জ্বলে উঠতে পারেন নি। তবে আইয়ুব বাচ্চু তাকে বেশ সময় দিয়েছিলেন। একটা আস্ত অ্যালবাম তো করে দিয়েছিলেনই, মিক্সড অ্যালবামেও বেশ কিছু গান করেছিলেন তার জন্যে। ঝলককে আমার কখনই বিশেষ মনে হয় নি, তবে তার প্রথম এ্যালবাম ‘অবহেলা’য় বেশ কিছু মনে রাখার মত গান ছিলো। টাইটেল ট্র্যাক ‘অবহেলা’ তো একদম মন খারাপ করে দেয়! নীল কমলের দেশে সহ আরো কিছু গান ভালো লাগবে শুনতে। ঝলকের জীবনের অন্যতম সেরা কাজ ছিলো মিক্সড অ্যালবাম ‘তুমিহীনা সারাবেলা’তে ‘এই নদী জল ছুঁয়ে’ এবং ‘১৬ টি মোমবাতি’। ঝলক পরে অন্য একজনের সুর এবং সংগীতে কোনো একটা অ্যালবাম করেছে, এবং হারিয়ে গেছে। সে কেনই বা আসলো, বা কেনই বা চলে গেলো, তা বেশ রহস্যময় ব্যাপার, তবে আইয়ুব বাচ্চু তাকে মনে রাখার মত কিছু সময় উপহার দিয়েছেন, সন্দেহ নেই।

আইয়ুব বাচ্চু শিল্পীদের পূর্ণাঙ্গ একক অ্যালবাম ছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবেও কিছু গান সুর করেছেন। বিশেষে করে বন্ধু কুমার বিশ্বজিৎ এর অ্যালবামে তার সুরে একটি গান থাকতোই। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ‘মৌসুমী পাখিটা এসেছিলো’ আর ‘আঁতিপাঁতি করে খুঁজি মোমবাতি জ্বালিয়ে’র কথা।

খুলনা থেকে রংচটা জিনস পরে আসা ছন্নছাড়া তরুণ রূপম তো ‘মন জ্বলে’ গান দিয়েই হিট হয়ে গেলেন! সেটাও ছিলো আইয়ুব বাচ্চুর ‘মন জ্বলে’ মিক্সড অ্যালবামের গান। মিক্সড অ্যালবাম তিনি বেশ কিছু করেছেন নিজের সুর এবং মিউজিকে। এর আগে বলেছি তুমিহীনা সারাবেলার কথা, এছাড়াও ‘তারা ভরা রাতে’, ‘রাজকুমারী’তেও অসাধারণ কিছু গান পেয়েছি। তুমিহীনা সারাবেলার কথা আবারও বলতে হয়। এই অ্যালবামে প্রয়াত নীলয় দাসের গাওয়া ‘এ শহর ডুবে যায়’ অবশ্যই শুনবেন।

আইয়ুব বাচ্চু সুর ছাড়াও শুধু মিউজিকের কাজ করেছেন কিছু অ্যালবামে। সাহেদের প্রথম অ্যালবামের মিউজিক ছিলো তার করা। তার পরের অ্যালবামের কিছু গানও তিনি করেছিলেন। রেশাদের গ্রহান্তরী ভালোবাসার মিউজিক করেছিলেন তিন দিকপাল আইয়ুব বাচ্চু, রেশাদ এবং জেমস। তবে কে কোন গানের মিউজিক করেছিলেন তা উল্লেখ করা ছিলো না অবশ্য!

শেষ করবো সাহেদের রুক্সানা গানটি দিয়ে। এ গানটি আপনারা সকলেই শুনেছেন। এই গানের কথা এবং সুর সাহেদেরই। তবে গানটির যে দুটি সংস্করণ আছে, তা জানেন? বেশি প্রচলিত যেটি, সেটি করেছিলেন নকীব খান, আরেকটি আইয়ুব বাচ্চুর করা। প্রচণ্ড রকম ফাস্ট লিড সোলো, হামিং আর দুর্দান্ত ড্রামস পুরো গানের চেহারাটাকেই বদলে দিয়েছিলো। মনে হয়, একদম অন্য একটা গান! শুনে দেখবেন না কি?

দেখলেন তো, কেমন বদলে গেলো!

বদলে দেয়া, তার চেয়ে ভালো আর কে পারতেন!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।