হৃদয় দিয়ে চেষ্টা করি: মুশফিকুর রহিম

ইতিহাসে মুশফিকুর রহিম বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নয়নের অন্যতম স্থপতিদের একজন হয়ে থাকবেন। ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার নাম হবেন তিনি। এশিয়া কাপের আগে তিনি তার ক্যারিয়ারের নানা দিক নিয়ে বিশেষ এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ক্রিকেট বিষয়ক গণমাধ্যম ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে।

– গত পাঁচ বছর ধরে দেশের বাইরে আপনার টেস্ট ব্যাটিং গড় ৫০, কি করে সম্ভব হলো?

আমি মনে করিনা কেউ নির্দিষ্টভাবে দেশে বা দেশের বাইরে বেশি রান করতে চায়। আমি প্রতিটি সিরিজেই সামর্থ্য অনুযায়ী রান করতে চাই। এটা ঠিক দেশের বাইরে বড় স্কোর করাকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। একটা প্রচলিত ধারণা আছে বাংলাদেশে ক্রিকেটাররা শুধু দেশের মাটিতে ভাল করে। আমি আমার খেলার মধ্য দিয়ে ব্যাপারটাকে চাপা দিতে চেয়েছি, কঠিন কন্ডিশান ও বোলিং এটাকের বিরুদ্ধে।

তামিম, সাকিব ও আমি প্রায়ই ব্যাটিং গ্রুপ বলে ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করি, আমাদেরকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ট্যুরে আমি ভালো করতে পারিনি, কিন্তু পরবর্তী সুযোগে আশা করি ভালো করবো। নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও শ্রীলঙ্কায় আমি আমার সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে খেলার চেষ্টা করেছি।

– দেশের বাইরে করা তিনটি শতরান, ২০১৪ সালে কিংসটন এবং ওয়েলিংটন এবং ২০১৭ সালে হায়দ্রাবাদ – কোনটি আপনার প্রিয়?

ওয়েলিংটনের শতরানটি ছিল স্পেশাল। প্রথম ওডিআইর পর ইনজুরিতে ছিটকে পড়েছিলাম, আমার কিংবা দলের নিউজিল্যান্ডের রেকর্ড ভালো ছিল না। আল্লাহ’র রহমতে আমি ভালো ইনিংস খেললাম। তামিম ও মমিনুলকে বেশি ক্রেডিট দিতে হবে, কারণ তারা নতুন বল সামাল দিয়ে কঠিন পরিস্থিতি পার করে দিয়েছিল। আমার আর সাকিবের জন্য পরবর্তীতে কাজ সহজ হয়ে যায় কিছুটা।

হায়দ্রাবাদের সেঞ্চুরিকে বেশি দূরে রাখবো না। ভারত পৃথিবীর সেরা দলগুলোর একটি। তাদের দারুণ একটি বোলিং এটাক আছে। তাদের বিপরীতে শতরান করা স্বপ্নের মতো। তাছাড়া আমি ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্টে নেতৃত্বে ছিলাম। এই দুটো আমার কাছে স্পেশাল সেঞ্চুরি।

– আপনার ওয়ানডে পারফরম্যান্সে বিশাল একটি পরিবর্তন দেখা যায় ২০১৪ ও ২০১৫ সালে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আগের সাত বছরের তুলনায়। কিভাবে রান করা ও স্ট্রাইক রেটের এ পরিবর্তনটি এল?

এখনকার দিনে ৩০০ রান নিরাপদ নয়, বিশেষ করে ভালো উইকেটে। আমি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম বর্তমানের ফিল্ডিং সীমাবদ্ধতার সুয‌োগকে কাজে লাগিয়ে নিজের খেলায় আরো শট যুক্ত করা যায়। ১১ থেকে ৪০ ওভারে স্পিন বা পেসের বিপক্ষে আপনি মিড-অন বা মিড-অফ সার্কেলের ভেতর পাবেন। অফ-স্পিনার ও বাঁহাতি স্পিনারের বিপক্ষে বাউন্ডারির সুযোগ থাকছেই। আমি নিজের শট ইমপ্রুভ করতে চেয়েছি এই সময়টাতে। যদি আপনি স্বাস্থ্যকর স্ট্রাইকরেট বজায় রাখতে পারেন রান সহজে আসবে এবং বোলার চাপে পড়বে। আপনার ১০০+ স্ট্রাইকরেট থাকলে দলও উপকৃত হবে। অন্য ব্যাটসম্যান, যে কিনা রয়ে সয়ে খেলছে সে আরো সময় পাবে যাতে করে পরে হাত খুলে খেলতে পারে।

আমি আমার খেলায় এই ব্যাপারটি ডেভেলপ করতে চেয়েছি। সময় লেগেছে এতে। আমাকে বের করতে হয়েছে কখন আমি আক্রমণ করতে পারব। চান্দিকা হাতুরুসিংহেকে কৃতিত্ব দিতে চাই এক্ষেত্রে। তার সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলাম, তিনি আমাকে সমর্থন জুগিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন আমি যেন আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলি। প্রায়ই এমন সময় আসতো যখন শুরুতে উইকেট হারিয়ে ফেলতাম আমরা, আমাদের ধীরেসুস্থে খেলতে হতো। পরে হাত খুলতাম। কিন্তু তিনি আমাকে বলেছিলেন স্কোরবোর্ডের দিকে না তাকিয়ে আমার সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে। যদি উইকেট ভালো হয় তাহলে যেন স্ট্রোক খেলি সে অনুপ্রেরণা তিনি দিয়েছিলেন।

আল্লাহ’র রহমতে আমি ২০১৫ সালে এভাবে খেলতে সক্ষম হয়েছিলাম। বিষয়টি আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। বড় টুর্নামেন্টে কঠিন বোলিং শক্তির বিরুদ্ধে খেলার সাহস পেয়েছি সেখানে। এমনকি স্কটল্যান্ড ও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে হওয়া ম্যাচগুলোও সহজ ছিল না।

– আপনার দ্রুতগতির ৩০ রান ম্যাচ পাল্টে দিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে। শ্রীলঙ্কার সাথে গত বছর আপনি বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করা পর্যন্ত ব্যাট করেছিলেন। দুটো বিপরীত পরিস্থিতি খুব সফলভাবে আপনি মোকাবেলা করেছেন। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে চাপের মধ্যে ব্যাটিং করা মানসিকতা ও দক্ষতার উপর কতটা নির্ভর করে?

এটা দুটোর সমষ্টি। একজন স্ট্রোক প্লেয়ার হিসেবে আপনাকে পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে ব্যাটিং করতে হবে। এটা মানসিক শক্তি। কখনো ডাউন দ্য উইকেটে কিংবা স্পিনের বিপরীতে শট খেলতে হবে, কিন্তু নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে। অনুশীলনের উপরও ব্যাপারটা নির্ভর করে। এরফলে ব্যাটিং অনেক সহজ হয়ে যায়, মানসিক শক্তিও বাড়ে।

ফিটনেস এই অবস্থায় আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। যদি আপনি ৫০ সেকেন্ডে একবার দৌড় শেষ করতে পারেন ৬০ সেকেন্ডের পরিবর্তে তাহলে ফিটনেস লেভেলে অতিরিক্ত অনুপ্রেরণা যোগাবে সেটি। এরফলে আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যাবে যা স্কিল বাড়াতে কাজ করবে। আমি সবসময় সময়ের চেয়ে এগিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করি, আমি ভেবে নেই কি পরিস্থিতির মুখোমুখি আমাকে হতে হবে।

– কোনটি কঠিন – দ্রুত আক্রমণাত্মক ইনিংস নাকি নির্দিষ্ট সময়ে বড় শট খেলা?

দুটোই কঠিন পরিস্থিতি, বিশেষ করে বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের জন্য। আমরা নিয়মিত এই বিষয়গুলোর মুখোমুখি হই না। ভারতীয় ক্রিকেটাররা এমন অবস্থায় দশবার পড়লে নয়বার ম্যাচ বের করে নিতে পারবে। আমরা হয়তো ছয় মাসে একবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে থাকি, অনেকসময় বছরে একবার। ফলস্বরূপ এটা ট্রিকি হয়ে পড়ে। যখন আপনি এ পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন তখন আপনার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে।

– বাংলাদেশের হয়ে ১২ বছর খেলার পরেও একই ধরনের পরিশ্রম করার জন্য কোন অনুপ্রেরণা কাজ করে?

আমি মনে করিনা বাংলাদেশের জন্য আমার সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিতে পেরেছি। এটাই একমাত্র অনুপ্রেরণা। দেশের হয়ে ১২-১৩ বছর খেলতে পারাটাও একরকম বিলাসিতা। আমার ক্যারিয়ারের শেষে আমি বলতে চাই আমাকে দেওয়া সকল সুযোগের সদ্ব্যাবহার করতে পেরেছি। এটাই আমাকে আগ্রহী করে তোলে। আমি ছোট লক্ষ্য ঠিক করি, সিরিজ অনুযায়ী। হৃদয় দিয়ে চেষ্টা করি আমার ফিটনেস ঠিক রাখতে।

– বাংলাদেশের হয়ে খেলছেন, এই অনুভূতিটা কেমন?

দেশকে রিপ্রেজেন্ট করাই প্রথম ও শেষ কথা হওয়া উচিৎ। আমাদের পরিবার পরিজনের কাছে হতে মাসের পর মাস দূরে থাকার জন্য অনেক সেক্রিফাইস করি আমরা। দেশের জন্য কিছু করার মতো গর্বের কিছু নেই। যখন আপনি জানছেন ১৮-২০ কোটি মানুষ আপনার জন্য প্রার্থনা করছে, একজন রিকশাচালক হয়তো তার দিনের সব উপার্জন দিয়ে আমাদের খেলা দেখছে, এটা আমাকে তাড়িত করে। আপনার আর কোন অনুপ্রেরণার দরকার নেই। এরচেয়ে বড় গৌরবের কিছু নেই। আমার সাথে অনেক মেধাবী ক্রিকেটার শুরু করেছিলেন, কিন্তু আল্লাহ আমাকে নিয়মিত হবার সুযোগ দিয়েছেন।

– গত বছর আপনার নেতৃত্ব শেষ হয়। সেরা এবং বাজে মুহূর্ত কোনটি ছিল?

আমি সে ধরনের ব্যক্তি যে কিনা পেছনে থেকে কাজ করে যায় ঠিকমতো। ভালো করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেকোন খেলোয়াড় উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। আমার নেতৃত্বরও সে বিষয়টা ছিল। গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকা ট্যুর ছিল সবচেয়ে কঠিন আমার জন্য একজন খেলোয়াড় এবং ক্যাপ্টেন হিসেবে। আমরা দলগতভাবে সফল হইনি। আমাদের ভালো করা দরকার ছিল। কিন্তু ভালো দিনও কেটেছে। আমরা অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডকে হারিয়েছি, শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েছি তাদের আঙিনায়। নিউজিল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে ওয়ানডেও জিতেছিলাম আমরা। এই ব্যাপারগুলো আমাকে গর্বিত করে। ক্যাপ্টেন দলকে জিতাতে পারেন, দলকে জিততে হয়। আমি তাই তাদের ধন্যবাদ জানাই।

– দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সাকিব, তামিম, মাহমুদুল্লাহ এবং মাশরাফির সাথে খেলছেন, কেমন লাগছে?

গত চার-পাঁচ বছরে আমার ধারাবাহিকতার জন্য এই চার ক্রিকেটারকে কৃতিত্ব দিতে হবে। জীবন সহজ হয়ে যাবে যখন আপনি সাকিব, রিয়াদ ভাই কিংবা তামিমের সাথে ব্যাটিং করবেন।  ক্রিকেট একক খেলা না, পার্টনারশিপ গুরুত্বপূর্ণ, এবং আমাদের সকলের ম্যাচ-জয়ী অবদান আছে। আমরা পাঁচজন গত চার-পাঁচ বছর কঠিন পরিশ্রম করেছি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করার জন্য। এই জেনারেশনের ক্রিকেটারদের সাথে খেলতে পারা গৌরবের ব্যাপার। মাশরাফি ভাই অতুলনীয়, সাকিব, তামিম এবং রিয়াদ ভাই বিশ্বমানের ক্রিকেটার।

– তামিম একবার বলেছিলেন যে তার একটি মোটিভেশান হচ্ছে বিশ্বের শীর্ষ দশ ব্যাটসম্যানের একজন হওয়া, আগামী পাঁচ বছরের জন্য আপনার মোটিভেশান কি?

আমারও একই ধরনের লক্ষ্য রয়েছে, কিন্তু আমার চিন্তা হলো পূর্ববর্তী সিরিজের চেয়ে পরবর্তী সিরিজে নিজেকে উন্নত করা। আমার শৈশবের স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের জন্য ম্যাচ উইনার হওয়া, এখনও স্বপ্নটা লালন করি। হয়তো কিছু ম্যাচে আমি ব্যর্থ হয়েছি কিন্তু সুখের দিনও ছিল। আশা করি এমন সুখের দিন আরো পাব, অন্তত দশটা খেলার মধ্যে আট নয়টায় তো অবশ্যই।

– ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত সময়টা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

বড় আসরে ভালো করার জন্য একটি দলের মোমেন্টাম প্রয়োজন। খেললাম জয় করলাম এমন কিছু না এটা। আমরা যদি এশিয়া কাপে ভালো করতে পারি, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ডের সাথে সফল হই, একটি দল হিসেবে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে আমাদের। আমাদের মতো দলের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি এখন অতীত, আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ আসছে। যদি আগামী বিশ্বকাপ পর্যন্ত দলগত এ গতিটা ধরে রাখা যায় তাহলে আশা করা যায় স্মরণীয় বিশ্বকাপ উপহার দিতে পারব ব্যক্তিগত পারফর্ম্যান্সের পাশাপাশি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।