আহ, হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি!

হোটেল রুমানে যখন প্রবেশ করি, তখন কাবাব বিরিয়ানির মৌ মৌ মাদকতাময় গন্ধে আমার লুপ্ত হবার জোগাড়। রেস্টুরেন্টের নিচে বসবার তেমন কোন পছন্দমত যায়গা না পেয়ে উপরে উঠে গেলাম। যেতে যেতেই দেখলাম এক এক জনের খাবারের সে কী বাহারি আয়োজন নিয়ে উপভোগ করছে তাড়িয়ে তাড়িয়ে। বিশাল বিশাল বাটার নানের সাথে খাসির লেগ রোস্ট, মুরগীর আস্ত গ্রিল, সাথে নানা রকম আচার, চাটনি আর পেঁয়াজের পরিবেশনা টেবিল গুলোর একটা ভিন্ন জাদুকরী পরিবেশ তৈরি করেছিল।

আর বিরিয়ানি বা কাবাবের টেবিল গুলো তো যেন এক একটা রাজকীয় ঢঙে তার মুঘল আভিজাত্য জানান দিয়ে যাচ্ছে। উফ কী এক একটা বিশাল প্লেটের সাঁজ, সরু বাসমতী চালের মন মাতানো বিরিয়ানির উপরে নানা রকমের মাংসের ছড়াছড়ি। আর সেই সাথে নানা রকমের কাবাব ঝুলে আছে গ্রিলে, কোন কোনটা পুড়ে পুড়ে বাদামী রঙ ধারন করেছে, কোন কাবাব তো পুড়ে কালচে কিন্তু নিদারুণ আকর্ষণীয় হয়ে তার মহিমা, সুখ স্বাদ আর অমৃত অনুভূতি ছড়িয়ে দিচ্ছিল।

কাবাব আর বিরিয়ানি প্রিয় কেউ কতক্ষণ এসব দেখে নিজেকে স্থির রাখতে পারবে আমি জানিনা। আরও সেটা যদি হয় দূর দেশ থেকে গিয়ে বিরিয়ানির জন্য বিখ্যাত কোনো জায়গায়। আরও যদি তার পকেটে থাকে পর্যাপ্ত অর্থের মজুদ থাকে, তাহলে তো আর কথাই নেই!

ঝটপট দ্বিতীয় তলায় উঠে একটা ফাঁকা টেবিলে ব্যাগ রেখে ফ্রেস হয়ে নিলাম। বোতলে ভরে নিলাম ঠাণ্ডা এক বোতল পানি। এরপর টেবিলে গিয়ে একদম ঘরোয়া ভাবে পায়ের উপরে পা তুলে আসুন করে বসে পড়লাম কাবাব বিরিয়ানি উপভোগ করবো বলে। মেন্যু দেখে তো আমার ভিড়মি খাওয়ার জোগাড়, কোনটা নেব, কোনটা খাবো, কোনটা দেখবো আর কোনটার ঘ্রাণ নেব প্রান ভরে। উহ একটা অব্যাক্ত সুখের অদ্ভুত অনুভূতিতে আচ্ছন্ন তখন আমার সকল চেতনা, বোধ আর বাস্তবতা।

চারদিকে দেখে আমি ভীষণ সন্দিহান হয়ে পড়লাম। কারণ আমি ছাড়া একা কেউই খেতে আসেনি সেখানে। আর সবাই মোটামুটি একটা অর্ডার দিয়েই দুজনে মিলে আবার কেউ কেউ তিন বা চারজন মিলেই দুটো বিরিয়ানির অর্ডার করছে এবং সেটাই আরাম, আয়েশ আর পেট ভরে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে দেখতে লাগলাম। তার মানে দাঁড়ালো যে এখানে একটা বিরিয়ানির যে পরিমাণ সেটা একজনের পক্ষে স্বাভাবিক ভাবে খেয়ে শেষ করা কষ্টকর। দু’জনের বেশ আরাম করে একটি বিরিয়ানি খেতে পারে পরিমাণটা এমনই।

তাহলে এখন আমি কি করবো? একটা বিরিয়ানি তো আমি একা কিছুতেই শেষ করতে পারবোনা। তার উপর একটু আগে গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে আমের জুস, আনারস, তরমুজ, পেঁপে আর নাম না জানা দুই একটি ফল খেয়ে পেট অনেকটাই টইটুম্বুর। কিন্তু পেটে যায়গা নেই বলে আর যাই হোক হায়দ্রাবাদে এসে হায়দ্রাবাদের স্বনামে খ্যাত বিরিয়ানি উপভোগ না করার মত এতোটা পাষাণ আমি হতে পারবোনা, চাইনা, সেটা আমার পক্ষে কোনো ভাবেই সম্ভব না। তাই আরও কিছু সময় কাল ক্ষেপণ করে একটা বিরিয়ানির অর্ডার দিয়েই ফেললাম।

বিরিয়ানি অর্ডার দেয়ার পরেই টেবিলে চলে এলো, খালি প্লেট, পিঁয়াজ, রায়তা, চাটনি আর সবুজ একটা আচারের মত। উফফ! কি দরকার ছিল এতো কিছুর একই সাথে? কি আর করার, এসব দেখছি এরই মধ্যে ধোঁয়া ওঠা মাঝারি গামলায় করে চলে এলো মাদকতার গন্ধ ছড়ানো হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি। কিন্তু সেদিকে তাকিয়ে তো আমার মন খারাপ হয়ে গেল! মাংস কই? সবার বিরিয়ানি তো দেখলাম মাংসময় তবে কি আমার কম দামী বলে মাংসহীন? কিছুটা দমে গিয়েই চামচ দিয়ে একটু বিরিয়ানি তুলতে গিয়েই দেখি চামচ ভিতরে যাচ্ছেনা! সে কি কেন

একটু জোর খাটিয়ে চামচ ভিতরে দিয়ে উপরে তুলতেই দেখি আহা মাংস, চালের চেয়ে তার উপস্থিতিই বেশী। আর মূল বিরিয়ানির পাত্রে তাকিয়ে দেখি চালের নিচে শুধু মাংসের ছড়াছড়ি! আহা, আলু তো নয় যেন জমাট বাঁধা মাখনের টুকরো, আস্ত কিন্তু একটু কেটে মুখে দিলেই মাখনের মত গলে যাচ্ছিল জিভ আর লালার উষ্ণতায়!

আর মাংসর কথা আর কি বলবো, যেন ছোট ছোট এক একটা নরম কাবাবের মত মুখের ভিতরে গড়াগড়ি করতে করতে কখন যে শেষ হয়ে গেছে বুঝে ওঠা মুশকিল! আর সেই সাথে অন্যান্য চাটনির সাথে পেঁয়াজের সম্মিলনে একটা দুর্দান্ত আর অবর্ণনীয় অনুভূতির কিছু সময়।

এবার একটু আগের ঠিক উল্টো অনুভূতি হল, এতো এতো মাংস আমি খাবো কিভাবে, কিছুতেই সম্ভব নয় আমার পক্ষে এতো খাবার খাওয়া, তাতে বিরিয়ানি আমি যতই ভালোবাসিনা কেন। তবুও, এরপর ধীরে ধীরে আর ধীরে, তাড়িয়ে তাড়িয়ে আর তাড়িয়ে, একটু একটু করে অনেক অনেক সময় নিয়ে যতটা পারি বিরিয়ানি আর মাংসের সুখ উপভোগ করলাম।

একবার করলাম কী, এক টুকরো মাখনের মত আলু, একটু মোমের মত আস্ত কিন্তু উষ্ণতায় গলে যাওয়া মাংস আর কিছুটা পোলাও একই সাথে এক জায়গায় করে মুখে দিলাম! তারপর আমার মনের মধ্যে তখন সেই খাবারের সমন্বিত স্বাদ পেয়ে গান বেজে চলেছে – আমি নেই নেই নেইরে, যেন তোরই মাঝে হারিয়ে গেছি!

যখন আর একদমই পারছিনা, চোখ দুটো বন্ধ করে, পিঠটা পিছনের চেয়ারে হেলান দিয়ে একটু বিশ্রামে চলে গেলাম। আর যাই হোক এখন, এই মুহূর্তে উঠে যাওয়ার সাধ্য আমার নেই। শেষ পর্যন্ত যখন পুরো হোটেলের সবগুলো টেবিলের সবটুকু যায়গা দখল হয়ে গেছে, তখন অন্যদের বসতে দিতে উঠতেই হল।

ধীরে ধীরে যখন নিচে নেমে আসছিলাম তখন মনে মনে বলছিলাম, আহ কি খেলুম দাদা, হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি!

সত্যিই এর রঙ, রূপ, স্বাদ, গন্ধ, আভিজাত্য সবকিছু অতুলনীয়। এর স্বাদ আর উপভোগের ধরণ বলে বা লিখে বোঝানোর সাধ্য ক’জনের আছে আমার সন্দেহ। এই হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি উপভোগ করতে চাইলে, সঠিক স্বাদ চেখে দেখতে ইচ্ছে হলে, মন মাতানো গন্ধে পাগল পাগল অনুভূতি পেতে চাইলে আর খেয়ে শেষ করে অলস কিছু সময় উপভোগ করতে চাইলে চলে যেতে হবে হায়দ্রাবাদে।

উহু, একা নয় কিছুতেই, দল বেঁধে, বন্ধু বা পরিবার পরিজন নিয়ে উপভোগ করতে হবে। তবেই পাওয়া যাবে হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানির আসল স্বাদ। আর একদম শেষে, নিজের সাথেই নিজের স্বগতোক্তি –

আগার বিরিয়ানি নেহি খায়া,

তো হায়দ্রাবাদ কিউ আয়া?

আগার বিরিয়ানি নেহি খায়া,

তো হায়দ্রাবাদ মে ক্যায়া খায়া?

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।