‘অভিনয় ছাড়া আর কিছুই পারি না আমি’

চলচ্চিত্রে কিভাবে এলেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন – পরিচালক খোকনের সাথে। সাক্ষাৎকারে প্রশ্নকর্তা শুধরে দিলেন, না মানে এফডিসিতে কিভাবে? সোজা সাপটা তাঁর জবাব, বেবি ট্যাক্সিতে করে। এরকমই ছিলেন তিনি। বাংলা চলচ্চিত্রে খলনায়ককে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি, সিনেমায় নায়কের চেয়ে যে খলনায়কের প্রতি দর্শকের আকর্ষণ ছিল বেশী – তিনি হুমায়ুন ফরীদি।

শুধু বাংলা চলচ্চিত্রে খলনায়কই নয় মঞ্চ, টিভি, বাণিজ্যিক এবং বিকল্পধারার চলচ্চিত্রে সব ধরনের চরিত্রে তিনি ছিলেন ভার্সেটাইল অভিনেতা।

তিনি আর আমি আমরা একই পরিবারের একটি অংশ। আমাদের এই পরিবারটি হল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের পরিবার। এই পরিবারে আরও আছেন আরেক প্রখ্যাত অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম ভাই।

আজকে এই বিশেষ দিনে তার জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি বিশেষ করে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের না জানা কিছু কথা সবার সামনে তুলে ধরলাম যা আমি, আমরা জানি।

আল বিরুনী হলের ব্যালকনিতে ফরিদী

শিল্পী হুমায়ুন ফরিদীর জন্ম ২৯ মে, ১৯৫২, নারিন্দা। বাবার বদলির চাকরীর সুবাদে তাকে অসংখ্য জেলায় ঘুরতে হয়েছে। ছোটবেলায় ছন্নছাড়া স্বভাবের জন্য তাকে ‘পাগলা’, ‘সম্রাট’ ,‘গৌতম’-এমন নানা নামে ডাকা হত।

১৯৭০ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে ভর্তি হলেন। এলো একাত্তর, চলে গেলেন যুদ্ধে। নয় মাসের যুদ্ধ পরে লাল-সবুজের পতাকা হাতে ঢাকায় ফিরলেও ঢাকা ভার্সিটিতে ফেরেননি। টানা পাঁচ বছর বোহেমিয়ান জীবন কাটিয়ে শেষে অর্থনীতিতে অনার্স-মাস্টার্স করলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ছিলেন ফরীদি ভাইয়ের সহপাঠী এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ফরীদি ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার জীবন ছেড়ে আর আনু স্যার ঢাকা মেডিকেল ছেড়ে তখন সদ্য গড়ে ওঠা স্বল্প পরিচিত জাহাঙ্গীরনগরকেই বেছে নেন।

জাহাঙ্গীরনগরে সর্বডানে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আমার শিক্ষাগুরু প্রফেসর আনিসুর রহমান ওরফে আনু মুহাম্মাদ স্যার। সর্ব বামে ফরীদি। অর্থনীতি বিভাগের পঞ্চম ব্যাচের এই দুই বন্ধুর মাঝেরজন তাদেরই ছাত্রজীবনের আরেক বন্ধু মঞ্জু, তিনি অবশ্য অন্য বিভাগে ছিলেন।

আনু মোহাম্মদ স্যারের সাথে ছিল তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব। আনু স্যারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মতে তাদের দুইজনের বেশী সময় কাটত লেকের পাড়ে, আল বিরুনী হলের ক্যান্টিনে, তৎকালীন জুলফুর ক্যান্টিন কিংবা ডেইরী গেটের আলী ভাইয়ের দোকানে। তাঁর কাছ থেকে আরও জানতে পারি, কথাবার্তা চলাফেরায় প্রচলিত নিয়মনীতির বাইরে স্পষ্টভাষী ছিলেন ফরীদি ভাই।

ফরীদি ভাই থাকতেন আল বিরুনী এক্সটেনশনে। এই হলের নাম এ রকম, কী করে হয়? এই নিয়ে ছিল তার আপত্তি। তারা সবাই মিলে ঠিক করলেন হলের নতুন একটা পরিচয় দেওয়ার। নাম রাখা হয়েছিল ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ছাত্রাবাস’। হাতে লিখে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছিল। ঢাকা থেকে এই ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়ে নাম চালু করতে চেষ্টাও নাকি করা হয়েছিল।

একমাত্র কন্যা সারারাত ইসলাম দেবযানীর সাথে

আরেকবার ফরিদী ভাই আর তার বন্ধুরা মিলে নাকি তৎকালীন ভিসি স্যারের গরু জবাই দিয়ে খাওয়ার মত দুঃসাধ্য কাজ করেছিলেন। এই কাজের জন্য তাদের ছাত্রত্ব চলে যেতে পারত। কিন্তু ভিসি স্যারের রাগ পড়ে যায় পরবর্তীতে।

আনু স্যারের ভাষ্যমতে, ‘ওর কণ্ঠে আবৃত্তি শুনি, যাত্রার কিংবা নাটকের কিংবা চলচ্চিত্রের সংলাপ শুনি। গানও। রাতে-দিনে, লেকের পাড়ে, বসে, কিংবা হাঁটতে হাঁটতে। ওর জীবনকাহিনি বৈচিত্র্যময়; নাটকীয় এবং নাটককেন্দ্রিক। নাটক শিল্প নিয়ে ওর পড়াশোনা, চিন্তা, আগ্রহ ওকে প্রায় ধ্যানগ্রস্ত করে রাখত, কখনো কখনো অস্থির। সে সময় আমাদের অগ্রজ বন্ধুর মতো ছিলেন সেলিম আল দীন, মোহাম্মদ রফিক। আমাদের আড্ডায় প্রায় নিয়মিত উপস্থিতি ছিল তাঁদের। সেলিম ভাই তত দিনে নাটক রচনায় নতুন ধারা তৈরি করেছেন, রফিক ভাই কবিতায়।’

ছাত্র অবস্থায় প্রিয় এক বন্ধুর মৃত্যুতে তিনি বেশ কষ্ট পেয়েছিলেন। শুনেছি ব্যস্ততার মাঝেও ফরীদি ভাই নাকি ক্যাম্পাসে কদাচিৎ আসতেন। নাট্যকার সেলিম আল দিনের মৃত্যুর পর তিনি ক্যাম্পাসে এসে সেলিম ভাই এর কবরের দিকে অনেকক্ষণ নীরবে এক দৃষ্টিতে চেয়েছিলেন। খামখেয়ালী এই মানুষটা পড়ে আর ক্যাম্পাসে আসেননি হয়ত কোন কিছু কারণে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরিদী (পঞ্চম ব্যাচ) ও শহীদুজ্জামান সেলিম (নবম ব্যাচ)

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বিশিষ্ট নাট্যকার সেলিম আল দীনের সংস্পর্শে আসেন। ছাত্রাবস্থায়ই ১৯৭৬ সালে তিনি ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হন। জড়িয়ে যান মঞ্চের সাথে। সেলিম আল দীনের ‘সংবাদ কার্টুন’-এ একটি ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করে ফরিদী মঞ্চে উঠে আসেন। অবশ্য এর আগে ১৯৬৪ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে কিশোরগঞ্জে মহল্লার নাটক ‘এক কন্যার জনক’-এ অভিনয় করেন।

স্বাধীনতার পর রমনায় প্রথম স্ত্রী মিনু ওরফে নাজমুন আরা বেগমের সাথে বেলী ফুলের মালা বদল করে বিয়ে করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। মিনু ছিলেন সহপাঠীর বোন। হুমায়ুন ফরীদি এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘শুধু সহপাঠীর বোনই নন, তিনি প্রথমত প্রেমিকা, দ্বিতীয়ত ছিলেন স্ত্রী। মিনু আমার জীবনে না এলে হয়তো বোহেমিয়ান জীবন থেকে ফিরে আসা হতো না। হতে পারতাম না আজকের ফরীদি।’

নব্বুইয়ের গোড়া থেকেই হুমায়ুন ফরিদীর বড় পর্দার লাইফ শুরু হয়। বাণিজ্যিক আর বিকল্প ধারা মিলিয়ে প্রায় ২৫০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে প্রথম ছবি তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’।

ক্যাম্পাসের বন্ধুদের সাথে

এরপরে ৮০ এর দশকে তাঁর অভিনিত ‘দহন’ ছবিটিও ছিল অন্যমাত্রার এক মুভি। ‘বাঁচো এবং বাঁচতে দাও’ প্রায়ই এমন একটা ফিলোসফিক্যাল কথা বলতেন ফরিদী ভাই। তার নাকি দরাজ দিল ছিল। নাট্যাঙ্গনে নাকি একটি কথা প্রচলিত ছিল যে, যদি টাকা লাগে তবে হুমায়ূন ফরিদীর কাছ থেকে ধার নাও। কারণ ফেরত দিতে হবে না। কাউকে টাকা দিলে তা নাকি বেমালুম ভুলে যেতেন। তাই কোনদিন ফেরতও চাইতেন না।

একবার এমন হয়েছিল হুতাপাড়া থেকে সূবর্ণার জরুরী ফোন পেয়ে রাত ২ টার পর ঢাকায় রওনা হন। হঠাৎ মনে পড়ে প্রোডাকশন বয় ইসমাইলকে কোন বখশিশ দেয়া হয় নাই। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে বহুদূর এসে নিজে গাড়ি চালিয়ে আবার সেটে ফিরে গিয়ে ঐ রাতেই তাকে কিছু দিয়ে ঢাকায় ফেরেন। এমন বহু গল্প আছে যা তাঁর হৃদয়ের বিশালতা প্রমাণ করে।

৬০ তম জন্মদিনে শেক্সপীয়রের ‘কিং লিয়ার’-এ অভিনয়ের বাসনা ব্যক্ত করেছিলেন। হলো না। ৬০ পূর্ণ হবার আগেই বহু অজানা অপূর্ণ বাসনা নিয়ে চলে গেলেন এই জাত অভিনেতা। দেশের সিনেমা-নাটক নির্মাণ জগতের বোদ্ধারা কেউ কেউ দাবি করেন যে, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার আর নির্মাণের ক্যারিশমা দিয়ে যদি ফরিদীকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করা যেত তবে উপমহাদেশের শীর্ষ সারির একজন অভিনেতা হিসাবে তাঁর স্বীকৃতি মিলত। একান্ত ব্যক্তিজীবনে অসম্ভব অভিমানী এই শিল্পী জীবনকে পিষে-ঘষে-পুড়িয়ে জীবন ধরার চেষ্টা করে গেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করছেন।

জীবনভর শুধু অভিনয়ই করে গেছেন। নিজেই বলতেন ‘অভিনয় ছাড়া আর কিছুই পারি না আমি।’ ভীষণ কৌতুকপ্রিয় মানুষ ছিলেন। নাটকের সেটে নাকি সদা সবাইকে কৌতুকে মাতিয়ে রাখতেন। এত কৌতুক মনে রাখেন কীভাবে, প্রশ্নের উত্তরে একবার বলেছিলেন, জীবনটাই তো কৌতুক, আমরা কেউ থাকব না, থাকবে শুধু কৌতুক। নিজের জীবনের সাথে কৌতুক করতে করতে অস্তাচলে যাওয়া হুমায়ুন ফরিদীর অভাব কখনোই পূরণ হবার না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।