গুলতেকিন-শাওনের জন্য ভালবাসা ও একজন ‘সম্রাট’ হুমায়ূন

হুমায়ূন আহমেদ। নাইন টেনের বয়সে বই পড়া শেখানো ছাড়া আর কোন কারণেই খুব বিশেষ কিছু ইদানিং মনে হয়না আমার তাঁকে। বড় হতে হতে তুমুল জনপ্রিয় সাহিত্যিক পরিচয় ছাপিয়ে আমার কাছে তাঁর পুরুষ পরিচয়টাই মূখ্য হয়ে ওঠেছে। যে পুরুষ খুব সাধারন, গড়পরতা, আধিপত্যবাদী, অসংবেদনশীল, স্বার্থপর, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং খানিকটা পিডোফাইলও, যিনি প্রায়শই অল্প বয়ষ্ক মেয়ের জন্য কাতর থাকতেন।

একটা সময় হুমায়ূন আহমেদের হাত পা মেলে যেমন খুশি তেমন করে জীবনকে যাপন করার ক্ষমতা দেখে তাঁকে আমার রাজার মতো মনে হতো। এখন আর মনে হয়না। বরং নিজের খেয়াল খুশির জন্য বাইজি নাচানো এলেবেলে টাইপ নষ্ট রাজা মনে হয়।

আমি দেখতে পাই তাঁর এই রাজার মতো জীবন যাপনের পেছনে দু’জন নারীর আজীবন স্যাক্রিফাইস, দহন, সামাজিক নিপিড়ন, বঞ্চনা আর অপচয়। একজন গুলতেকিন, একজন শাওন। দু’জনেই নিজেদের জীবনের শুরুতেই হাত ধরেছিলেন হুমায়ুনের।

একজন গুলতেকিন খান, একজন হুমায়ূন নির্মাণের পেছনে কোন বটবৃক্ষ হয়ে ছিলো, গুলতেকিনের কোন কোন ত্যাগের বিনিময়ে হুমায়ূন আহমেদ হয়ে উঠতে পেরেছেন সেসব গল্প আমরা জানি হুমায়ুনের লেখার সূত্রেই। হুমায়ুনের পুরুষালী ইচ্ছা, পুত্র সন্তানের শখ মেটানোর জন্য পাঁচটা (একজন মৃত সন্তান সহ) সন্তান জন্ম দিয়েছেন গুলতেকিন, যাদের প্যারেন্টিং করেছেনও এক হাতেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবনের শুরুতে বিয়ে করেন গুলতেকিনকে।

সেই সুযোগে নিরবিচ্ছিন্ন মনোযোগে লেখালেখি আর শিল্প সাধনা করতে পেরেছেন হুমায়ূন। জয় করেছেন শিল্প সাহিত্যের সব শাখা। যুগ যুগ ধরেই পুরুষের শৌর্য বির্য আর জয়ের মহিমা লেখা হয়েছে নারীর বলিদানের কলমে।

যখন লেখক হুমায়ূন ধীরে ধীরে ‘সম্রাট’ হয়ে ওঠতে লাগলেন, তখনই গুহাচিত্র আঁকার আলো ধরার জন্য নতুন নারী দরকার হলো হুমায়ুনের। এবং গুলতেকিনের ঘাড়েই চারটা কিশোর সন্তানের ভার চাপিয়ে নিজে ভারমুক্ত হয়ে গুহাচিত্র আঁকতে গেলেন নতুন আলোকর সাথে নিয়ে। এর নাম পুরুষ।

অত:পর কিশোরী শাওন ধরলেন গুহাচিত্রকরের জন্য আলো। ৫৬ বছর বয়সি একজন পুরুষের গুহাচিত্র আঁকার শখের আলো ধরার জন্য সদ্য কৈশোর পেরুনো এই মেয়েটিকে কী পরিমাণ রক্তাক্ত হতে হয়েছে, কী পরিমাণ ছাড়তে হয়েছে, কী পরিমাণ ঘৃণার আগুনে পুড়তে হয়েছে, তার স্বাক্ষীও আমরাই।

শাওনকেও নিজেকে প্রমাণ করতে হয়েছে তিন (একজন মৃত) সন্তানের মা হয়ে, এবং মা হয়েই তাকে হয়তো নিজেকে প্রমাণ করে যেতে হবে জীবনতক।

হুমায়ুন যতোই পুরুষ হয়েছেন ততোই নারী হয়ে মাতৃত্বের খোলসে বন্দী হয়েছেন গুলতেকিন এবং শাওন। তাতে এই সমাজের করুণা, সমবেদনা আর সম্মান পেয়েছেন তাঁরা নিজেদেরকে অপচয়ের দামে।

এর নাম সমাজ। যে সমাজে মা মানেই মাটি। মা যদি রক্ত মাংসের মানবিক জৈবিক চাহিদা সম্পন্ন মানুষ হতে চায় তবে সেই মা ঘৃণীত। যদি সেদিন গুলতেকিনও বিয়ে করতেন তবে শাওনের সমান নিন্দাই কুড়োতে হতো তাঁকেও। অথচ কেউ কেশাগ্রও স্পর্ষ করতোনা হমায়ুনের।

পুরুষ যতো খুশি নারীসঙ্গ করুক, নারীকে থাকতে হবে একা। স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ হয়েছে? তুমি মা, একা থাকো। স্বামী মারা গেছে? তুমি মা, একা থাকো। স্বামী অন্য নারীকে বিয়ে করেছে ? তুমি মা, একা থাকো। বয়স যাই হোক, নারী যতোক্ষণ একা থাকবে, যতোক্ষণ সন্তান বুকে করে রাখবে, যতোক্ষণ নিজের কথা না ভাববে ততোক্ষণ এই সমাজ নারীর মহত্ব বর্ণনা করবে।নারী নিজের কথা ভাবলেই মোড়লরা তেড়ে আসবে।

সন্তানের দোহাই দেয়া হবে, সন্তান বড় হচ্ছে, তাদেরই প্রেম করার বয়স, আর এখন কিনা নিজেই সঙ্গী খুজবে নারী? তো সেই নারী নষ্টা! সন্তান রেখে বিয়ে করবেনা। তো কোন পুরুষের সাথে স্বাভাবিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক করবে? তাও হবেনা। চারিদিকে ছি ছিক্কার উঠবে।

তো, নারী কী করবে ? একা থাকবে। নিজেকে ক্ষয়ে দেবে। নিজেকে নি:শেষ করলেই তবে প্রমাণ হবে মা মহান। নিজেকে শুকিয়ে না ফেলতে পারলে তবে নারী কিসের মহান মায়ের জাত!

সেই নারী জীবনের অপচয়ের একই চক্রে বাঁধা পড়ে আছে সম্রাটের জীবন ভোগ করে যাওয়া হুমায়ুনের জীবনের দুই নারী।

সেই পনেরো বছর আগে নিজের আলো খুঁজে নিয়েছিলেন হুমায়ুন। তারপর থেকে সন্তানদের নিয়ে একলা গুলতেকিন। এর মধ্যে সন্তানরা বড় হয়েছে, সবার নিজেদের আলাদা জগৎ, আলাদা সংসার হয়েছে। গুলতেকিন একা থেকে একাতর হয়েছেন। একা চলার এই এতোগুলো মুহূর্ত, এতোগুলো দিন, এতোগুলো রাত – কেউ জানবেনা সেইসব বেদনা যাপনের খবর।

একই পথে হাঁটছেন শাওনও। সমাজের মাপমতো ভালো মা, ভালো নারী হবার জন্য একলাই হাঁটছেন দু সন্তানকে হাতে ধরে। এই একাকীত্বের শুরু হুমায়ুন মারা যাওয়ার আরো আগে থেকেই। যখন থেকে ক্যান্সারে আক্রান্ত স্বামীর সেবায় নিজেকে মন্দাকিনী সাজতে হয়েছিলো কোলে পিঠে দুই শিশু সন্তান নিয়ে, সেই থেকেই তাঁর দিনগুলো একার, রাতগুলো একার, লড়াইগুলো একার, চেপে যাওয়া দীর্ঘনিশ্বাসগুলোও একার।

একদিন তার সন্তানরাও বড় হবে, তাদেরও আলাদা সংসার, আলাদা জগৎ হবে। শাওনও একা থেকে একাতর হবে। কেউ জানবেনা তার এই একা চলার, কষ্ট ভোলার স্মৃতিপিষ্ট জীবনের খবর।

কিন্তু সমাজের মোড়লরা হারিকেন জ্বালিয়ে পাহারা দেবে শাওন কোন পুরুষ সঙ্গ করছে কিনা! পরখ করে দেখবে শাওন মৃত হুমায়ুনের প্রতি নিষ্ঠা পালনে কোন ব্যত্যয় করছে কিনা! শাওনের হাসির মাপ মনিটর করা হবে, চোখে মুখে কোন তৃপ্তি বা আনন্দের ছাপ আছে কিনা সেটা নিবিড় পরীক্ষণ হবে।

শাওনকে পিছল মাটিতে পা টিপে টিপে সন্তানদের যোগ্য মানুষ বানিয়ে প্রমাণ করতে হবে সে যথার্থ মা, হুমায়ুনের যোগ্য স্ত্রী। তবেই হুমায়ুনের সমাজে তার ‘কলঙ্ক’ কিছুটা লাঘব হবে।

আমি বরং কামনা করি গুলতেকিন এবং শাওন দুজনেই মানুষ হয়ে ওঠুক। মা, মাটি, মাতৃত্ব এইসব গোলকধাঁধা কাটিয়ে রক্ত মাংসের জৈবিক মানুষ হোক। তাঁরা মনে রাখুক, মা যশোদা হয়ে বিশ্বসংসারকে মাতৃস্নেহে পালতে গেলে শেষ বেলায় নির্বান্ধব একলা মরতে হয়।

গুলতেকিন এবার একা থেকে দোকা হয়েছেন। শাওনও একা থেকে দোকা হোক। পুরুষের জীবনের বাতিঘর হয়ে না থেকে তারা নিজের জীবনের চিত্রকর হোক এবার। সেই ক্ষমতা তাঁদের আছে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।