মন কেন এত কথা বলে!

বিশ্ব বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গগ। অদ্ভুত রহস্যময় জীবন ক্ষনজন্মা এই গুণী শিল্পীর। বলা হয়ে থাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিজের জীবনকে পুরপুরি ব্যর্থ বলে মনে করতেন এই মহান শিল্পী!

এমনকি তাঁর ওয়ান অব দ্য মাসটার পিসেস ‘দ্য স্ট্যারি নাইট’ আঁকার পর ওনার ধারনা ছিল কোন কিছুই হয়নি ওটা। অথচ পৃথিবীর মহামূল্যবান পেইন্টিংগুলোর মধ্যে তার সেই পেইন্টিংটি উল্লেখযোগ্য!

কথিত আছে তাঁর বন্ধু পল গগ্যা’র সাথে মনমালিন্যের ফলাফল হিসেবে তিনি তার নিজের বাম কান কেটে ফেলেন। আবার কেও বলেন, তিনি তাঁর কান কেটে কোন এক পতিতাকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন!

বিভিন্ন মেয়াদে মেনটাল অ্যাসাইলামে কাটানো নিভৃতচারী এই শিল্পী কল্পনাপ্রসুত ব্যর্থতার ভার সইতে না পেরে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে নিজের গায়ে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন। তবে, ভিনসেন্ট ভ্যান গগ বিষয়ক তথ্য দেয়া আমার উদ্দেশ্য না। তার সম্পর্কে পড়ে নাই, জানে না এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম।

ভ্যান গগের ‘দ্য স্ট্যারি নাইট’

আমার উদ্দেশ্য অন্য।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে চিত্রশিল্পী ভ্যান গগ ছিলেন স্কিটজোফ্রেনিয়ায় বা সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। আমার উদ্দেশ্য স্কিটজোফ্রেনিয়া বা সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে দু’টো কথা বলা।

আমাকে এক ভদ্রমহিলা অনেকদিন ধরে মেসেজ পাঠাচ্ছেন। নানাবিধ কারণে তার সাথে কথা বলা হয়ে ওঠেনি। কথা না বলার মুল কারণ উনি কেমন যেন ঘ্যানঘ্যানানি টাইপ, দুঃখ বিলাসী। আমার দুঃখবিলাসী মানুষ পছন্দ না, এদের সাথে কথা বললে আমি নিজে হতাশায় ভুগতে শুরু করি।

একদিন মনে হল, শুনি উনি কি বলতে চান। জানি উনার দুঃখ কমানোরর কোন মেডিসিন আমার কাছে নেই, তবে শেয়ার করলে যে মানুষের ভার হালকা হয় এই বিষয়টা আমি বুঝি।

সমস্যার কথা জানতে চাইলে তিনি যা বললেন তার সারমর্ম হচ্ছে, তাকে তার স্বামী সন্তান কেও ভালবাসেনা। তার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা সারাক্ষণ তাকে ছোট করে, ইগনোর করে, তাকে নিয়ে আড়ালে কথা বলে, ফিসফিস করে। এমনকি তিনি মনে করেন তার স্বামীর এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার আছে একাধিক। বাসায় যে বুয়া কাজ করে তার সাথেও তার স্বামীর সম্পর্ক আছে বলে তিনি মনে করেন। শেষ কথা হল, তার জীবন পুরোপুরি ব্যর্থ, উনি মরে যেতে চান!

আমি তার সাথে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কথা বললাম তার বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি বের করার উদ্দেশ্যে। দুঃখজনক ভাবে উনি সত্যতা প্রমাণের মত কোন যুক্তিই দিতে পারলেন না। কথা বার্তায় বেড়িয়ে এলো – এগুলো নিছক তাঁর অনুমান, স্রেফ তাঁর ইমাজিনেশন!

তার সামনে অন্য কেও কথা বলেই মনে হয়, তারা তাঁকে নিয়েই কথা বলছে। বুয়া তাঁর বেডরুমে কাজ করতে ঢুকলেই মনে হয় স্বামী এবং বুয়ার মধ্যে অনৈতিক কিছু ঘটছে! আমি তাকে আমার স্বল্প জ্ঞান দিয়ে কাউন্সেলিং করার যথেষ্ট চেষ্টা করলাম। তবে আমি জানি তাঁর প্রফেশনাল কাউন্সেলিং দরকার। উনি একটা অন্ধকার রাস্তায় হাঁটছেন, যেটা এই মুহূর্তে বন্ধ না করা গেলে উনি চির অন্ধকারে হারিয়ে যাবেন।

আমার মনে হয়েছে, ওনার কন্ডিশন সাধারণ কোনো সন্দেহ প্রবণতা না। এগুলো স্কিটজোফ্রেনিয়া বা সিজোফ্রেনিয়ার পূর্ব লক্ষণ। যে রোগে মানুষের তার চিন্তার উপর কোনো কন্ট্রোল থাকেনা, কথা এবং আচরনে অসঙ্গতি দেখা দেয়, মানুষ তার নিজের ইমাজিনেশনের জগতে বসবাস করতে শুরু করে,তার মনে হয় সবাই তার শত্রু, সবাই তার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে, এক্সট্রিম কেইসে তাদের নানা রকম হ্যালুসিনেশন হয়, ভুত প্রেত দেখেন, মনে হয় কেও তার সাথে কথা বলে, একসময় মনের রোগ শরীরকেও গ্রাস করতে শুরু করে।

এই অবস্থা থেকে রোগী স্বেচ্ছায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার চেষ্টা না করলে বা পরিবার তাকে সাপোর্ট, আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা না নিলে উনি নিজের এবং পরিবারের জন্য একসময় হুমকি হয়ে দাঁড়ান।

মানসিক রোগ নিয়ে আমাদের সমাজে ট্যাবু আছে। আমরা সহজে মানসিক রোগ ডিসকাস করতে চাইনা, কাউন্সিলরের কাছে যেতে চাইনা। ভয় হয়, গায়ে পাগলের সিল লেগে যাবে! উলটা যে মানুষটা এই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যায় তাকে আমরা বকা দিয়ে, গালিগালাজ করে, লোকলজ্জার ভয় দেখিয়ে লাইনে আনতে চাই, সে স্যুইসাইড করে মরে গেলে বলি, সে কাপুরুষ!

অথচ মানুষের ব্রেইন, মস্তিষ্ক বা মনই তার সব। ব্রেইন কাজ করা বন্ধ করে দিলে মানুষ খাবার কিভাবে খেতে হয় সেটাও ভুলে যায়। আমাদের শরীরের প্রত্যেকটা অঙ্গ ব্রেইন এর নির্দেশেই ম্যুভ করে, আমাদের প্রতিটা অনুভূতির উৎস আমাদের মস্তিষ্ক। তাই ব্রেইনের চিকিৎসা, যত্ন হওয়া, শরীরের অন্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের চেয়েও বেশী জরুরী।

আপনার পাশের মানুষটা যদি কখনও বলে আমার মরে যেতে ইচ্ছা করে, তাহলে হেসে উড়িয়ে দেবেন না। মানুষ এখন যখন তখন মরে যায় এবং এই মরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা ইম্ব্যালেন্সড মানসিক অবস্থার ফলাফল। কাছের মানুষ হলে সেই ব্যালেন্স ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আপনার। মাঝ সাগরে ডুবতে দেখা কোন মানুষের হাত যদি আপনি ছেড়ে দেন, কাপুরুষ সে না, কাপুরুষ আপনি!

একজন বিখ্যাত মানুষ দিয়ে শুরু করেছিলাম, আরেকজন বিখ্যাত মানুষ দিয়েই শেষ করি!

বিখ্যাত গণিতবিদ প্রফেসর জন ন্যাশ তাঁর বর্ণাঢ্য পেশাগত জীবনের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে দীর্ঘ একটা সময় সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মেন্টাল অ্যাসাইলামে পার করেন। প্রথমবার আক্রান্ত হবার পর তার প্রথম স্ত্রী এবং দ্বিতীয়বার তার দ্বিতীয় স্ত্রী তাকে ডিভোর্স দেন। প্রফেশনাল লাইফ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় তাকে।

‘আ বিউটিফুল মাইন্ড’ ছবির একটি দৃশ্য

প্রফেসর সাহেব নিজেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন এবং দীর্ঘদিনের সুচিকিতসায় তার রোগমুক্তি হয়। তিনি আবার শিক্ষকতায় এবং গবেষণায় ফিরে আসেন। শুধু ফিরেই আসেন না, ১৯৯৪ সালে গেইম থিওরির উপর গবেষণার জন্য উনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান।

তিনি সুস্থ হবার পর তার দ্বিতীয় স্ত্রী এলিসাও ফিরে আসেন এবং নতুন করে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কি অদ্ভুত! ২০০১ সালে জন ন্যাশ সাহেবের জীবনকে কেন্দ্র করেই তৈরি করা হয় বিখ্যাত সিনেমা ‘আ বিউটিফুল মাইন্ড’!

এখন কথা হচ্ছে, তাঁদের কথা আলাদা, বড় বড় জিনিয়াসরা বড় বড় রোগে আক্রান্ত হয়ে আবার ভাল হয়ে নোবেল পান, তাঁদের জীবন নিয়ে সিনেমা হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের মত রাম শ্যাম যদু মধুর জীবনে সমস্যা অতি ক্ষুদ্র, দাম্পত্য জীবনে সমস্যা, বাচ্চারা কথা শোনেনা, আমাকে কেও ভালবাসেনা টাইপ।

আমাদের নোবেল পাওয়ার দরকার নাই আবার পাগলা গারদেও থাকার দরকার নাই। তাই সমস্যা ক্ষুদ্র থাকতেই তাকে শিং মাছের মত ছাই দিয়ে ধরতে হবে এবং সমস্যার মুণ্ডুপাত করতে হবে! মনে রাখতে হবে – রোগ বালাই তো আছে দুনিয়ায় ভালো থাকার আছে যে উপায়!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।