হাম আপকে হ্যায় কওন: বলিউডে নতুন যুগের সূচনা

বলা হয়ে থাকে ‘হাম আপকে হ্যায় কওন’ সিনেমার মধ্যে দিয়ে বলিউড প্রবেশ করেছিল আধুনিক ফিল্ম বিজনেসের যুগে। মাধুরী দীক্ষিত এবং সালমান খান জুটির এই সিনেমা বক্স অফিসে ৯০ দশকের সবচেয়ে বেশি আয় করা সিনেমা।

ভারতের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক সিনেমার লিস্টেও এই সিনেমার নাম রয়েছে। জনপ্রিয় এবং সফল বলিউড ক্ল্যাসিকের ২৫ বছর পূর্তি হয়ে গেছে। ১৯৯৪ সালের পাঁচ আগস্ট মুক্তি পেয়েছিল সুরজ বারজাতিয়া পরিচালিত পারিবারিক এক মিষ্টি প্রেমের গল্প নিয়ে নির্মিত ‘হাম আপকে হ্যায় কওন’।

১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নদীয়া কে পার’ সিনেমার আধুনিক সংস্করণ হচ্ছে ‘হাম আপকে হ্যায় কওন’। এটিও মুক্তি পেয়েছিল একই প্রোডাকশন হাউজ রাজশ্রীর ব্যানারে। প্রথমটি তেমন সাড়া না ফেললেও মাধুরী-সালমান ম্যাজিকে ‘হাম আপকে হ্যায় কওন’ বক্স অফিস থেকে শুরু করে সাধারন দর্শক তথা সমালোচকদের মন জয় করেছিল।

একটি বিয়েকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের সাধারন এক গল্প নিয়ে তৈরী এই প্রেমকাহিনী দর্শকরা লুফে নিয়েছিল অনায়াসে। সিনেমায় মোট ১৪ টি গান ছিল। এর মধ্যে ১১ টিতেই কণ্ঠ দিয়েছিলেন ভারত রত্ন খেতাব পাওয়া লতা মঙ্গেশকর।

প্রতিটা গানই তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল সেসময়। বিশেষ করে ‘দিদি তেরা দেবর দিওয়ানা’ গানটি এককথায় ইতিহাস সৃস্টি করেছিল। এছাড়া ধিক তানা, লো চলি মে, ইয়ে মসাম কা জাদু, দুলহে কি শালি, মুঝিছে জুদা হো কার, মায়েনি মায়েন সহ সবকটি গানই জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছেছিল। আজো এসব গানের আবেদন একটুকুও কমেনি। আর ভারতে সেসময় কোন বাড়িতে বিয়ে আর ‘দিদি তেরা দেবর দিওয়ানা’ গানটি বাজে নাই এমনটা কল্পনা করা যেতনা।

একটি সাক্ষাৎকারে পরিচালক সুরজ বরজাতিয়া জানিয়েছিলেন, তারা নিজেরাও বুঝতে পারেননি যে, সিনেমাটা এরকম ইতিহাস সৃস্টি করবে। প্রেম-নিশা চরিত্রটির রসায়নে পুরো ভারতবর্ষ এরকম মজবে তা তাদের কল্পনাতেও ছিলনা। তবে সিনেমার বিপনন এবং প্রচারনায় সেই ২৫ বছর আগেই ভিন্নধর্মী নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল রাজশ্রী।

প্রোডাকশন হাউজ। যার ফল মিলেছিল হাতেনাতে। ব্যাপক সাফল্যের কারনে সিনেমাটি তেলেগু এবং তামিল ভাষায় ডাবিং করে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। সেরা ফিল্ম, সেরা পরিচালক, এবং সেরা অভিনেত্রী সহ পাঁচটি ফিল্মফেয়ার পুরষ্কার জয়ের পাশাপাশি সেবছর জাতীয় পুরস্কারে সেরা বিনোদন মূলক সিনেমা হিসেবেও পুরস্কার জিতে নিয়েছিল ‘হাম আপকে হ্যায় কওন’।

নিশা চরিত্রে মাধুরী প্রমান করেছিলেন একজন অভিনেত্রীর যেসব গুন থাকা দরকার তিনি তারচেয়ে বেশি কিছু। তাঁর অভিনয়, হাসি, নাচ, চেহারা, ড্রেস বা চুলের কাট সব মিলিয়ে তার তুলনা শুধু তিনিই। ২০১৮ বা ২০১৯ সালে এসে অনেক অভিনেত্রী এখন অভিনেতাদের চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পেয়ে থাকলেও একটা সময় এসব ছিল অকল্পনীয়।

তবে, বলিউডে কথিত আছে এই সিনেমার জন্য নায়িকা মাধুরী দীক্ষিত সেই ১৯৯৪ সালে নায়ক সালমান খানের চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী মকবুল ফিদা হোসেন এই সিনেমায় শুধু মাধুরীকে দেখার জন্য ৩০ বারের বেশি সিনেমাটি দেখেছিলেন। একেছিলেন প্রিয় নায়িকার অসংখ্য চিত্র। সেই সময় ভারতের মেয়েরা মাধুরীর সেই বেগুনী শাড়ির জন্য মুখিয়ে ছিলেন।

ব্যবসায়ীরাও সেই সুযোগ মিস করেননি। বাজারে সেই রকম শাড়ি আসার সাথে সাথেই শেষ হয়ে যাবার রেকর্ডও রয়েছে। এছাড়া বিউটি পার্লারে ‘মাধুরী কাট’ ছিল নিয়মিত ব্যাপার। মাধুরীর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মাইলফলক এই সিনেমা।

 

সালমান খানের অভিনয় জীবনের অন্যতম সেরা চরিত্র হিসেবে প্রেম অন্যসব চরিত্র থেকে এগিয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে। রাজশ্রী প্রোডাকশন হাউজের ব্যানারে ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ সিনেমার পরে ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’। দুটি সিনেমাতেই তার চরিত্রের নাম প্রেম। বিত্তবান ঘরের হাসিখুশি এক তরুনের চরিত্রে তাঁর অভিনয় ম্যাজিক জয় করেছিল সবার মন। পর্দায় প্রেম আর নিশার রসায়নে বুদ হয়ে গিয়েছিল পুরো ভারতবর্ষ। ১৯৯ মিনিটের এই সিনেমা ৪২.৫ মিলিয়ন রুপিতে নির্মিত এই সিনেমা আয় করেছিল ২ বিলিয়ন রুপি।

এছাড়াও মনীষ বেহেল, রেনুকা সাহানে, অলোক নাথ, অনুপম খের, রিমা লাগু, বিন্দু সহ প্রতিটা অভিনেতা- অভিনেত্রী নতুন করে অভাবনীয় জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন এই সিনেমার মধ্যে দিয়ে। এই সিনেমার পরে তাদেরকে এরকম চরিত্রে অভিনয়ের অফার করা হতো। এরই কারণে বিরক্ত হয়ে ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী রেনুকা সাহানে বলিউডে নিয়মিত হননি।

তবে সুরজ বারজাতিয়া চেয়েছিলেন এই সিনেমা দর্শকদের পারিবারিক মূল্যবোধ এবং হাসি, আনন্দ, বিরহ, নাচ, গান আর অল্প একটু কান্না কিন্তু শেষে মিলনাত্নক এক পরিনতি এরকম এক জগতে তিন ঘন্টার জন্য নিয়ে যাক। বাস্তবেও তাই ঘটেছিল, দর্শকেরা এই সিনেমা দেখে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়েছিলেন ঠোঁটে হাসি আর চোখে পানি নিয়ে। বানিজ্যিক সিনেমার ইতিহাসে ‘হাম আপকে হ্যায় কওন’ বলিউডে যে নতুন যুগের সূচনা করেছিল তা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্বর্নাক্ষরে লেখা থাকবে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।