দর্শক রুচির আধুনিকায়নের রূপকার

ভারতীয় উপমহাদেশের খ্যাতিমান বাঙালি নির্মাতা হিসেবে তার নাম থাকবে উপরের সারিতে। বক্স অফিস সফলতা থেকে শুরু করে সাধারন দর্শক তথা  সমালোচকদের কাছ থেকেও প্রশংসা এবং ভালোবাসা সবই পেয়েছেন এই খ্যাতিমান নির্মাতা। নির্মানের মুন্সিয়ানা, গল্প বলার ধরণ, বাস্তব জীবনের সেলুলয়েড উপস্থাপন দিয়ে অর্থ, যশ, খ্যাতিতে তার সময়ে অন্য অনেক নির্মাতাকেই ছাড়িয়ে গেছেন তিনি।

এই খ্যাতিমান নির্মাতা হলেন হৃষিকেশ মুখার্জি। ভারতীয় সিনেমার ‘স্টার মেকার’ খ্যাত এই নির্মাতা একেধারেই ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করেছেন, সম্পাদনার দায়িত্ব চালিয়েছেন, কাহিনী এবং সংলাপ লিখেছেন, সংগীত পরিচালনা করেছেন এমনকি প্রযোজক হিসেবে সফলতা পেয়েছেন।

হৃষিকেশ মুখার্জি নির্মিত সবক’টি চলচ্চিত্রই সবই সব ধরনের দর্শককেই বিনোদিত করেছিল। সত্তর এবং আশি দশকে হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে প্রতিভাবান অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীদের তিনিই প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এক সময় বলা হতো হিন্দি সিনেমার প্রতিভাবানদের চিনে নেয়ার মতো জহুরি ছিলেন সেই সময় একজনই তিনি হৃষিকেশ বাবু। অবাক করার মতো বিষয় হলো আপাদমস্তক একজন বাঙালী হলেও বাংলা ভাষায় কোন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি তইনি।

৮৪ বছরের জীবনে সবসময়ই নিবেদিত ছিলেন রুচিবোধ ও শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণে যা আমাদের জীবনের কথা বলবে। বলিউডের সর্বকালের সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে ধর্মেন্দ্র, রাজেশ খান্না, অমিতাভ বচ্চন, অমল পালেকর ও জয়াভাদুড়ির মতো প্রতিভাবানদের তিনিই চলচ্চিত্র জগতে আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন।

সিনেমাপাগল এই হৃষিকেশ মুখার্জি জন্মেছিলেন  ১৯২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কলকাতায়। ছোটবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি টান ছিলো তার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে বিএ পাস করেন তিনি। এরপর কলকাতাতেই একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন।

যদিও পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন বিজ্ঞান ও অঙ্ক বিষয়ের শিক্ষকতায় তার মন ভরছিল না। সবসময়ই সেলুলয়েডের পর্দায় সৃজনশীলতা উপস্থাপন তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। সিনেমার ঝলমলে রুপালি জগতে  যাওয়া এবং নিজেকে প্রমান করার জন্য সুযোগ খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন তিনি।

হঠাৎ করেই বহু কাঙ্খিত সেই সুযোগ পেয়েও যান একদিন। কলকাতার নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে যোগ দেন ক্যামেরাম্যান হিসেবে। এভাবেই তিনি প্রবেশ করলেন চলচ্চিত্র নামক স্বপ্নের জগতে। ক্যামেরার কাজ করতে করতেই সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ  হয়ে যায় সেই সময়ের খ্যাতিমান চিত্র সম্পাদক সুবোধ মিত্রর সাথে। তাঁর কাছ থেকেই চলচ্চিত্র সম্পাদনার কাজ শিখতে শুরু করেন।

এরপরে তিনি বিখ্যাত পরিচালক বিমল রায়ের কালজয়ী দুটি সিনেমা ‘দো-বিঘা জামিন’ ও ‘দেবদাস’ এর সম্পাদনার কাজ করার সুযোগ পান। এবং দুটি সিনেমাতেই তার কাজ প্রশংসা কুড়ায়। এভাবেই চলচ্চিত্র জগতে তাঁর পায়ের তলে মাটি ক্রমশ শক্তপোক্ত হতে থাকে।

হৃষিকেশ প্রথম একক উদ্যোগে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ১৯৫৭ সালে যখন বয়স তার ৩৫ বছর। ‘মুসাফির’ নামক সিনেমাটি তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে একটি জায়গা করে দেয়। ১৯৫৯ সালে ‘আনাড়ি’ সিনেমাটি তাকে পরিচালক হিসেবে খ্যাতি এনে দেয়।  ১৯৬০ সালে তিনি নির্মাণ করেন ক্ল্যাসিক সিনেমা ‘অনুরাধা’। বলরাজ গাহনী ও লীলা লাইডু অভিনীত সিনেমাটি সেই সময় দর্শকদের মনে ভিন্ন ধরনের স্বাদ এনে দিয়েছিল।

হিন্দি সিনেমায় এমন কাহিনীর ভিন্নতা দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। তখনকার সময়ে ব্যতিক্রম কাহিনীর সিনেমাটি বোদ্ধা মহলে জনপ্রিয়তা পেলেও বক্স অফিস হিট করতে পারেনি। তবে লোকসান বা ফ্লপ হয়নি। এই সিনেমাটির জন্য হৃষিকেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে। সম্মান শুধু স্বদেশেই নয় আন্তর্জাতিকভাবেও পেয়েছেন। ‘অনুরাধা’ সিনেমাটি ১৯৬০ সালে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব বিশেষ ক্যাটাগরির চলচ্চিত্র হিসেবে সম্মান অর্জন করে।

হৃষিকেশ পরিচালিত তৃতীয় সিনেমাটিই তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। ‘আশীর্বাদ’ নামক অসাধারণ সিনেমাটি ‘সুপার-ডুপার হিট’ হয়। জাতিভেদ প্রথা ও জমিদারির উপর কুঠারাঘাত হানেন তিনি এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। দলিতদের জীবন উঠে আসে সিনেমায় অন্য মোড়কে। পাশাপাশি এক পিতার হৃদয়ের যন্ত্রণাকে তিনি অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে তুলে ধরেন সাদা-কালো পর্দায়। এই সিনেমায় অশোক কুমারের ‘লিপ’-এ ‘রেলগাড়ি ছুক্ ছুক্ ছুক’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

এখনো বেশ জনপ্রিয় এই গানটি। গানটির রেকর্ডও প্রচুর বিক্রি হয়। এরপরে ব্যতিক্রমী আরেকটি সিনেমা নির্মাণ করেন তিনি। ক্লাসিক ধাঁচের সিনেমার নাম ‘সত্যকাম’। ১৯৬৯ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি ছিল সমকালীন চলচ্চিত্র ধারা থেকে পুরোপুরি পৃথক একটি গল্পকে কেন্দ্র করে। মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন ধর্মেন্দ্র্র, শর্মিলা ঠাকুর ও সঞ্জীব কুমার।

সাহিত্যিক-সাংবাদিক তরুণ কুমার ভাদুড়ির কন্যা জয়া ভাদুড়ি মূলত হৃষিকেশের হাত ধরেই চলচ্চিত্র জগতে প্রতিষ্ঠা পান। তার বিখ্যাত হয়ে ওঠার পেছনে হৃষিকেশের যথেষ্ঠ অবদান ছিল। জয়া ভাদুড়ি( তখনও বচ্চন হননি তিনি) প্রথম হিন্দী সিনেমাতে সুযোগ পান ১৯৭১ সালে ‘গুড্ডি’ নামের একটি সিনেমার মাধ্যমে। সিনেমাটির কাহিনীতেও ছিল নতুনত্ব।

চলচ্চিত্র জগতের প্রতি ছেলেমেয়েদের অবাস্তব ধারণা ও স্বপ্নের জগতের নায়ক-নায়িকাদের প্রতি তাদের আকর্ষণকে নৈপুণ্যের সঙ্গে সেলুলয়েডে তুলে ধরেছেন হৃষিকেশ ‘গুড্ডি’ সিনেমাতে। সিনেমাটি ধর্মেন্দ্র নামকরা এক নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ছোট্ট জয়া সিনেমা দেখতে দেখতে নায়ক ধর্মেন্দ্রের প্রেমে পড়ে যান। পরে নানাভাবে জয়ার এ মোহ কাটানো হয়।

অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন জয়া। শক্তিশালী অভিনেতা উৎপল দত্তের কমিক অভিনয় সিনেমাটিতে অন্য মাত্রা যোগ করেছিল। বস্তুত এই সিনেমার পর থেকেই জয়া ভাদুড়ি নজরে পড়েন হৃষিকেশসহ অন্য পরিচালকদেরও। জয়াকে নিজকন্যার মতোই স্নেহ করতেন হৃষিকেশ। জয়াকে নিয়ে এরপর তিনি বাবুর্চি (রাজেশ খান্না), অভিমান (অমিতাভ), মিলি (অমিতাভ) ও চুপকে চুপকে এর মতো কালজয়ী সিনেমা নির্মাণ করেন তিনি। অবাক করার মতো বিষয় হলো সবক’টি সিনেমাই ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। সেসব ছবির গান এখনও লোকমুখে ফেরে।

বলিউডে অমিতাভ বচ্চনের গুরু ছিলেন হৃষিকেশ। স্বয়ং অমিতাভই অনেকবার বলেছেন, হৃষিকেশকে তিনি গডফাদার মানতেন। ‘আনন্দ’ থেকে শুরু করে ‘চুপকে চুপকে’ – এই নির্মাতার মোট নয়টি ছবিতে কাজ করেন বিগ ‘বি’।

হৃষিকেশ-অমিতাভ জুটির একের পর এক হিট ছবি এক সময়ে বলিউডে সাড়া ফেলেছিল। ‘মিলি’, ‘জুরমানা’, ‘নমক হারাম’-এর মতো ছবিতে একেবারে আটপৌরে ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল বিগ-বি’কে। অনবদ্য গল্প, চিত্রনাট্য আর পরিচালকের ছোয়ায় এক অন্য অমিতাভ বচ্চনকে পেয়েছিলেন দর্শকরা।

গ্ল্যামারগার্ল তকমা পাশে সরিয়ে একজন গুনী অভিনেত্রী হিসেবে রেখাকে বলিউডে অনেকেই স্বীকৃতি দিতে অপারগতা জানাতেন সেই সময়। ১৯৮০ সালে রেখাকে নিয়ে হৃষিকেশ মুখার্জি নির্মান করেন আরেকটি কালজয়ী সিনেমা ‘খুবসুরাত’। পারিবারিক এক মিষ্টি প্রেমের গল্পে রেখাই মূল ভূমিকায়। অশোক কুমার, রাকেশ রোশানদের পাশ কাটিয়ে রেখা পুরো আলো টেনে নিলেন নিজের দিকে। সাধারণ দর্শক এবং কট্টর সমালোচকরাও এবার মানতে বাধ্য হলেন রেখা অসাধারণ অভিনেত্রী। হৃষিকেশের হাত ধরেই বলিউড পেলো এক নতুন অভিনেত্রী রেখাকে। এর পরে ‘নমক হারাম’ ‘ঝুটি’ এর মতো সিনেমায় রেখাকে হাজির করেছেন ভিন্নভাবে।

বলিউডের প্রথম সুপারষ্টার খ্যাত রাজেশ খান্নার অভিনয় জীবনের একটা বড় অংশ হৃষিকেশ। ‘আনন্দ’, ‘বাবুর্চি’, বা ‘নমক হারাম’ এর মতো মাইলফলক সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি হৃষিকেশের সাথে জুটি বেধেই। ‘বাবুমশাই, জিন্দেগি বড়ি হোনি চাহিয়ে, লম্বি নাহি।’ এই বিখ্যাত লাইনটি হৃষিকেশের অমর সৃষ্টি ‘আনন্দ’ সিনেমাতে রাজেশ খান্নার একটি ডায়লগ। এই ‘বাবুমশাই’ ডাকটি এতোই জনপ্রিয়তা পায় এখনো রাজেশ খান্নার কথা মনে হলেই সাথে এই ডাকটা চলে আসে।

এছাড়া অভিনেতা হিসেবে অমল পালেকরকে বলিউডে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন হৃষিকেশ। ক্ল্যাসিক ‘গোলমাল’ বা কমেডি ‘নরম গরম’ অথবা ‘ঝুটি’ এর মতো সামাজিক ড্রামা সব সিনেমাতেই অনবদ্য ছিলেন অমল পালেকর। এবং এর ক্রেডিট তিনি দিয়েছেন তার মেন্টর এবং গুরু হৃষিকেশ মুখার্জিকেই। তার পরিচালিত সর্বশেষ সিনেমা অনিল কাপুর এবং জুহি চাওলাকে নিয়ে মিষ্টি প্রেমের ‘ঝুট বলে কাউয়া কাটে’। বক্স অফিসে হিট না হলেও একশ্রেণির দর্শকদের কাছে গ্রহনযোগ্যতা পায়।

৮৪ বছর বয়সে ২০০৬ সালের ২৭ আগস্ট শেষ নিংশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ভারত সরকার তাঁকে চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯৯ সালে ‘দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার’ এবং ২০০১ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’ প্রদাণ করেন। হৃষিকেশ মুখার্জি আমাদের জীবনের চেনা গল্প সহজ সরল ভাষায় বলে গেছেন সবসময়। একজন অসম্ভব প্রতিভাবান পরিচালক, যিনি সিনেমার ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে সেলুলয়েডে বন্দি করেছেন নিপুণ দক্ষতায়, যা দর্শকদের হৃদয়ে আলাদা একটা জায়গায় রয়ে যাবে অনন্তকাল।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।