দেবতাতুল্য এক পরাক্রমশালী সেনানায়কের ট্র্যাজেডি

২০১৫ থেকে ২০১৮  – এই সময়ে যে মানুষটা ছিল দেবতাতুল্য, ২০১৯ থেকে সেই মানুষটাই কেন হয়ে গেলেন সকলের চক্ষুশূল? কেন ‘মাশরাফি বিন মুর্তজা’ নামের ধন্য ধন্য রব তুলতো যে সমর্থক জনতা এতোদিন, তারাই তিনি কবে অবসর নেবেন সেজন্য অত্যন্ত বিরক্তি সহকারে দিন গোনা শুরু করলো!

রাজনীতিতে আসা? হতে পারে! ক্রিকেটের রাজাসনের মাশরাফিকে রাজনীতির নর্দমায় নামতে দেখাটা অনেকের সহ্য হয়নি। তবে আমার যেটা মনে হয়, প্রথমত: জনগণের কাছে একজন সংসদ সদস্যকে মাঠে খেলতে দেখার চেয়েও বিরক্তিকর ছিল একজন পারফরম্যান্সহীন খেলোয়াড়কে মাঠে খেলতে দেখা!

সাকিব, মুশফিকরা যেখানে বিশ্বকাপের জন্য নিজেদের সর্বোচ্চ ঢেলে দিয়েছিলেন, সাকিব যে বিশ্বকাপে প্রতিষ্ঠা করেছেন ফিটনেস, স্পোর্টসম্যানশিপ আর পারফর্মেন্সের অনন্য দৃষ্টান্ত, তার বিপরীতে একজন আনফিট, খানিকটা মুটিয়ে যাওয়া, কোনো কোনো ম্যাচে ১০ ওভারের কোটা পূর্ণ না করতে পারা মাশরাফি স্রেফ ‘অধিনায়ক’ পদের বলে একাদশে খেলছেন, অনেকেই নিতে পারেনি।

নেওয়াটা স্বাভাবিকও না! কেউ বলতে পারবে বিশ্বকাপের জন্য কি প্রস্তুতিটা নিয়েছিলেন মাশরাফি?

আর দ্বিতীয়ত: সঠিক সময়ে থামতে না জানা!

বাংলাদেশ ক্রিকেটকে তিনি উপহার দিয়েছেন প্রায় সোনায় মোড়ানো ৪ টা বছর! এরপর তার নিজের বয়স হয়েছে, পারফর্মেন্স, ফিটনেসে ভাটা পড়েছে, মাঠের বাইরেও দায়িত্ব বেড়েছে – এরপরও তিনি নিজেকে টেনে নিয়ে গেছেন।

বিশ্বকাপের পরেই অধিনায়কত্ব থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেওয়াটাই কি তাঁর জন্য সবচেয়ে সম্মানের হতো না? এতে করে তার ব্যর্থতা এবং তদ্ভূত বিশ্বকাপের ব্যর্থতাতেও কি সামান্য প্রলেপ লাগতো না? সেটা হল না, হতাশ, রাগান্বিত, অলরেডি বিশ্বকাপের ব্যর্থতার জন্য তাকে দায়ী করা জনতার রাগ আরো বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক!

সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকারকেও তার ক্যারিয়ারের শেষ তিন বছর অহেতুক টেনে লম্বা করার জন্য ভারতবাসীর অনেক সমালোচনা হজম করেছেন। বিপরীত চিত্রও আছে। কুমার সাঙ্গাকারা বা অ্যালিস্টেয়ার কুক কেন আরো দুই বছর খেললেন না তা নিয়ে হতাশা আজো অনেকে প্রকাশ করেন। একজন চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটারের এই বোধটা থাকা উচিত যে কখন তার থামতে হবে!

যাক, দেরীতে হলেও মাশরাফি সেটা বুঝেছেন। অধিনায়কত্ব থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নিয়েছেন। বলা যায় বাংলাদেশ ক্রিকেটে ‘মাশরাফি যুগ’-এর একপ্রকার অবসানই ঘটলো।

যে যুগের শুরুটা হতে পারতো সেই ২০০৯ সালেই!

বেরসিক ইনজুরি সেবার কেড়ে নিয়েছিল সে সম্ভাবনা। এরপর ২০১৪ সালের সেই ‘অন্ধকারের সময়ে’ আলোকবর্তিকা আবির্ভূত হয়ে যিনি উপহার দিয়েছিলেনন বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সময়টা! ২০১৫ বিশ্বকাপ, ভারত-পাকিস্তান-দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ, ২০১৬ এশিয়া কাপ, ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, ২০১৮ এশিয়া কাপ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ – বড়বড় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এতো নিয়মিত আগ্রাসী ক্রিকেট খেলে মাশরাফির দল।

আর নেতৃত্ব! সে তো আরেক ইতিহাস! ক্ষুরধার মস্তিষ্ক, বলিষ্ঠ নেতা, স্নেহবান বড়ভাই, হুটহাট ডিসিশনকে কাজে লাগিয়ে ফেলা এক বাজিকর, জুনিয়রদের কাছে আদর্শিক রোল মডেল, দলের বৃহৎ স্বার্থে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ স্যাক্রিফাইস করা নায়ক তিনি। মাঠ ও মাঠের বাহিরে এতো বহুমুখী ভূমিকা কয়জন অধিনায়ক পালন করেন!

লড়াই ছিল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, তার চেয়েও বেশি লড়াই ছিল নিজের বিরুদ্ধে! প্রতিদিন পঙ্গু হয়ে যাবার ঝুঁকি নিয়ে খেলতে নামা, ম্যাচের দিন সকালে সিরিঞ্জ দিয়ে হাঁটু থেকে পানি বের করা, প্রতিটা বল করার আগে হাঁটুর স্ট্র্যাপ ঠিক করা এরপরেও মাঠে নিজেকে ১০০% উজাড় করে দেওয়া, বাঘের মতো প্রতিটা বল ঠ্যাকাতে ঝাঁপিয়ে পড়া – তাঁর এসব কীর্তিতে অবাক হত, অনুরণিত হত, অনুপ্রাণিত হত তার দলের সদস্যরা, গোটা দেশ, গোটা ক্রিকেট বিশ্ব! মাশরাফি! যেন পৌরাণিক কাহিনীর পাতা থেকে উঠে আসা কোনো পরাক্রমশালী সেনানায়ক! তবে ইতিহাস বলে, অধিকাংশ পরাক্রমশালী সেনানায়কের শেষটা হয়েছিল খুবই দুঃসহ!

দুর্ভাগ্যজনকভাবে মাশরাফিও এর ব্যাতিক্রম হননি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।