সিনেমার আড়ালে ইমেজ শুদ্ধিকরণ?

ভয়াবহ রকমের ব্যবসাসফল তো বটেই, গত কয়েক বছরে বলিউডে আর কোনো সিনেমা নিয়ে সম্ভবত এতটা আলোচনা হয়নি। দর্শক, সমালোচক, পরিদর্শক, সবাইকে সমানভাবে মুগ্ধ করেছে ‘সাঞ্জু’। রণবীর কাপুর, বিধু বিনোদ চোপড়া কিংবা রাজ কুমার হিরানির ক্যারিয়ারে নি:সন্দেহে বড় একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে এই সিনেমা।

এতক্ষণ যা বলা হল, তার সবটাই বাজারি কথা, লোক ভোলানো কথা। বাস্তবতা হল, সিনেমাটিকে ঘিরে অনেকরকম কিছুর গন্ধ আসছে। সিনেমা পাড়া ও ভারতীয় গণমাধ্যম ঘাটলেই কানে আসছে নানারকম ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।

বলাবলি হচ্ছে, সিনেমাটা নির্মানই করা হয়েছে একটা প্রোপাগান্ডার অংশ হিসেবে। এই প্রোপাগান্ডার উদ্দেশ্য হল সঞ্জয় দত্তর ব্যক্তিগত ইমেজের মান উন্নয়ন করা। কিন্তু, রাজ কুমার হিরানি কেন সঞ্জয়ের ইমেজ বিশুদ্ধ করার কাজে আত্মনিয়োগ করবেন?

এই প্রশ্নের প্রথম উত্তর হল, সঞ্জয়ের কাছে তাঁর ঋণের শেষ নেই। ‘সাঞ্জু’র আগে এক ‘থ্রি ইডিয়টস’ বাদে হিরানি যতগুলো সিনেমা করেছেন, তার সবগুলোতেই ছিলেন সঞ্জয়। ফলে, হিরানির সাফল্যের পেছনে বড় হাত আছে সঞ্জয়েরও। হিরানি একবার বলেছিলেন, ‘সঞ্জয়ের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। আমি পাঁচটা সিনেমা করেছি। এর মধ্যে তিনটাতেই সঞ্জয় ছিলেন। আরেকটা তো ওকে নিয়েই সিনেমা।’

আর দ্বিতীয় উত্তর হল, শিগগিরই মুন্না ভাই সিরিজের দ্বিতীয় কিস্তির কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন। এর আগে সঞ্জয় দত্তর ইমেজটা দর্শকের চোখে ভাল করতে পারলে জনপ্রিয়তা বাড়বে। ফলে, সিনেমাটির ব্যবসা সাফল্য বাড়বে।

‘সাঞ্জু’ সিনেমাটির সাথে সঞ্জয় দত্তর ক্যারিয়ারের আগামী দিনগুলোও জড়িয়ে আছে। তাই তো সিনেমাটি হলে আসার পরদিনই মুক্তি পায় ‘সাহেব বিবি  ওউর গ্যাঙস্টার ৩’ সিনেমার ট্রেইলার। বলাই বাহুল্য যে, এই সিনেমাটিতে শীর্ষ চরিত্রে আছেন খোদ সঞ্জয় দত্ত।

ফলে, বোঝাই যাচ্ছে, সাঞ্জু হচ্ছে একটা বিশাল বিপণন পরিকল্পনা। এখন যেমন এই সিনেমা ব্যবসা করছে, পরবর্তীতে এই সিনেমার সুবাদে সঞ্জয় দত্তের ব্যবসাসফল হওয়ার ‍সুযোগ বাড়বে, সঞ্জয় দত্তকে নিয়ে রাজকুমার হিরানির সফল হওয়ার সুযোগ আরো বাড়বে।

ক্যারিয়ার জুড়েই সঞ্জয় দত্তকে ঘিরে বিতর্কের কোনো কমতি ছিল না। তাই, একদম নিরীহ স্টারকিড, সাদামাটা, সুন্দর হৃদয়ের বখে যাওয়া ছেলে, যে কি না সব সময়ই পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছেন – এমন একটি চরিত্রে সঞ্জয় দত্তকে উপস্থাপনের জন্য যথেষ্ট ঘাম ঝরাতে হয়েছে রাজকুমার হিরানি ও সহ-লেখক অভিজিত যোশিকে।

সঞ্জয়ের ব্যাপারে যাদের জানাশোনা ভাল আছে তাঁদের কয়েকটা জায়গায় খটকা লাগতে পারে। সিনেমার শুরুতে এক বায়োগ্রাফার সঞ্জয় দত্তকে মহাত্মা গান্ধীর সাথে তুলনা করায় তিনি বেশ ক্ষেপে গিয়েছিলেন। অথচ, তিনিই একবার একটা অনুষ্ঠানে এসে বলেছিলেন, ‘আমি সিনেমা ইন্ডাস্টির ডন কি না জানি না, তবে অবশ্যই আমি এখানকার গান্ধীজি। কারণ আমি সবার সাথে মিলেমিশে চলতে পছন্দ করি।’

সিনেমায় দেখানো হয়, একে ফিফটি সিক্স রাইফেল কেবলই পরিবারের নিরাপত্তার খাতিরে রেখেছিলেন সঞ্জয়। অথচ, এক অনুষ্ঠানে এসে সঞ্জয় দত্ত নিজে বলেছিলেন, শিকার করার শখ ছিল বলেই তিনি বন্দুক রেখেছিলেন, বলেছিলেন, ‘আমার হৃদয় বলেছিল বন্দুক না রাখতে, মন বলেছিল এটা তো দারুণ জিনিস। তাই রেখেছিলাম।’

বিশেষ করে ১৯৯৩ সালের মুম্বাই বোম ব্লাস্টের ব্যাপারে ডিটেইলিংয়ের কোনো ধারই ধারেননি নির্মাতা। এই বোম ব্লাস্টে যে মুম্বাই আন্ডাওয়ার্ল্ডের বেতাজ বাদশাহ দাউদ ইব্রাহিমের হাত ছিল, তাঁর উল্লেখ সিনেমার কোথাও নেই। এমনকি যখন জামিনে ছিলেন, তখন ফোনে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন ছোটা শাকিলের সাথে সঞ্জয় দত্ত’র ফোনালাপও পাওয়া যায় ইন্টারনেটে সার্চ দিলে। সেটা শুনলেই বোঝা যায়, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে কতটা দহরম-মহরম ছিল সঞ্জয় দত্তর।

সাঞ্জু: এক মানুষ, অনেক স্বত্ত্বা? নাকি এক মানুষ, অনেক মিথ্যা?

-এফএমএফ অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।