একটি চকলেট বার ও এক অনন্য অাবিষ্কার

১৯৪৫ সাল। পার্সি স্পেন্সার নামের একজন ভদ্রলোক ল্যাবে বসে কাজ করছিলেন ম্যাগনেট্রন নিয়ে। এই ডিভাইসটি হাই-ফ্রিকোয়েন্সির মাইক্রোওয়েভ উৎপন্ন করে। ভদ্রলোকের কোন প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী ছিলনা, তবে তিনি বিজ্ঞানী হিসেবে নাম করেছিলেন। সেদিন তিনি চকলেট বার নিয়ে এসেছিলেন পকেটে পুরে। কাজের ফাঁকে খাবেন বলে।

কাজ করতে করতে টের পেলেন তার প্যান্টের পকেট গরম হয়ে উঠছে। তিনি খানিকবাদে টের পেলেন চকলেট বার গলে টলে একাকার করে ফেলেছে তার প্যান্ট। এমনকিছু আমাদের সাথে হলে আমরা নিশ্চয়ই রাগে গজগজ করতে করতে প্যান্ট পরিষ্কারে লেগে পড়তাম।

পার্সি স্পেন্সার সে ধাঁচের মানুষ ছিলেন না। তিনি অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী ছিলেন। তিনি ভাবতে শুরু করলেন কেন চকলেট গলে পড়লো? এমন কিছু কি আছে যা চকলেট গলিয়ে ফেলল? তিনি সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কিছু পপকর্ণ নিয়ে এলেন, রেখে দিলেন ম্যাগনেট্রনের সামনে। তাকে তাক লাগিয়ে ফটফট করে ফুটতে শুরু করলো পপকর্ণ।

জন্ম হলো নতুন এক যন্ত্রের, তার নাম মাইক্রোওয়েভ ওভেন। স্পেন্সারের জন্ম ১৮৯৪ সালের নয় জুলাই ব্রিটিশ এই ভদ্রলোকের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা যে প্রায় ছিলই না, সেটা তো আগেই বলা হয়েছে। অথচ, তিনি ছিলেন নিজের সময়ের সেরা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের একজন।

পরদিন আগ্রহী পার্সি স্পেন্সার একটি ডিম নিয়ে এলেন। অবিশ্বাসী সহকর্মীর সামনে ডিমটি ম্যাগনেট্রনের সামনে রাখতেই তা ফেটে সহকর্মীর মুখে ছিটকে পড়লো। পার্সি স্পেন্সারের আর কোন সন্দেহ রইলো না, তিনি নিশ্চিত হলেন হাই-ফ্রিকোয়েন্সির মাইক্রোওয়েভ দিয়ে খাবার গরম করা সম্ভব এবং তা অতি অল্প সময়ে।

রেথন কোম্পানিতে পার্সি কাজ করতেন। তারা দেরি না করে দ্রুত এই আবিষ্কারের পেটেন্ট করিয়ে নিল, নাম দিল ‘রাডা রেঞ্জ (Rada Range)’। দু’বছর পর কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে নিয়ে এল প্রথম মাইক্রোওয়েভ ওভেন, যার ভর ছিল সাড়ে সাতশ পাউন্ড, উচ্চতা ছিল আস্ত একজন মানুষের মত (৬ ফুট)। দামটাও তখনকার জন্য অনেক ছিল, পাঁচ হাজার ডলার। বর্তমান বাজারে তা প্রায় পঞ্চাশ হাজার ডলারের মতো।

সে যুগের ওভেন চালু করলে প্রায় কুড়ি মিনিট লাগতো কর্মক্ষম করতে, তারপর খুব দ্রুত রান্না করা যেত। আলু সেদ্ধ হয়ে যেত মাত্র তিরিশ সেকেন্ডে। বর্তমানের অনেক ওভেনের চেয়েও কর্মদক্ষতা বেশি ছিল সে যুগের মাইক্রোওয়েভ ওভেনের। তবে কোম্পানির অদূরদর্শিতার জন্য নতুন এ প্রযুক্তি মানুষ গ্রহণ করেনি। মাত্রাতিরিক্ত ক্রয়মূল্য, নতুন প্রযুক্তির প্রতি দ্বিধায় আর এগুনো হয়নি মাইক্রোওয়েভ ওভেনের।

ষাটের দশকের শুরুতে শার্প বৃহৎ পরিসরে মাইক্রোওয়েভ ওভেন বাজারজাত করে। পরবর্তীতে রেথন একটি হোম এপ্লায়েন্স কোম্পানিকে কিনে নিয়ে বাসায় ব্যবহারের উপযুক্ত মাইক্রোওয়েভ ওভেন বাজারে নিয়ে আসে। আস্তে আস্তে মানুষ গ্রহণ করে নিতে শুরু করে দ্রুত রান্না করার এ পণ্য। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ বাড়িতেই মাইক্রোওয়েভ ওভেন ব্যবহৃত হচ্ছে।

পার্সি স্পেন্সার যদি সেদিন চকলেট নিয়ে না আসতেন, আর সেটি মাইক্রোওয়েভ সোর্স ম্যাগনেট্রনের সামনে না রাখা হতো তাহলে আজ হয়তোবা আমরা এত দ্রুত এত রকমারি খাবার রান্না করতে পারতাম না। তাই ছোটখাট বিষয়কেও এড়িয়ে যেতে নেই, বলা তো যায় না কখন কি আবিষ্কার হয়ে পড়ে ছোট্ট কৌতূহল হতে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।