শ্যাম্পুর বোতলের কারিশমা ও একটি ‘মেধাহীন জাতি’

ভদ্রলোক এতো চমৎকার একটা আবিষ্কার করে বসে আছে; অথচ আমরা জানলাম কই থেকে?

প্রথমে এসছে আমেরিকার সংবাদ মাধ্যম সিএনএনে! এরপর ইংল্যান্ডের সংবাদ মাধ্যম বিবিসিতে!

আমরা দেশে-বিদেশে বসে টেলিভিশনে দেখছি – বাংলাদেশি এক ভদ্রলোক কি সব জটিল মেডিকেল টাইপ বিষয় নিয়ে কথা বলছে!

কিছু বুঝতে না পারলেও এতটুকু ঠিকই বুঝতে পারছি – তিনি বিশাল একটা কিছু করে ফেলেছেন!

যা বুঝেছি, ছোট করে বললে – নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের শ্বাস নেয়া বা দেয়ার জন্য যেই যন্ত্র’টা দিয়ে এতদিন কাজ করতে হচ্ছিলো, সেটা ছিল অনেক দামী একটা যন্ত্র!

বাংলাদেশি টাকায় ১৫ লাখ টাকার মতো লেগে যেতে পারে কিংবা খুব কম হলেও সাত থেকে আট লাখ টাকার মতো হবে!

তো, এই ভদ্রলোক মানে ড. মোহাম্মদ জোবায়ের চিস্তি গবেষণা করে শ্যাম্পুর বোতল দিয়ে একই মেশিন আবিষ্কার করে বসে আছেন! যার খরচ হয়ত বাংলাদেশি টাকায় হবে ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মতো।

এটাকে হয়ত একদম নতুন কোন আবিষ্কার বলা যাবে না। কারণ এমন যন্ত্র আগেও ছিল। তবে তিনি এর এক নতুন সংস্করণ আবিষ্কার করেছেন- যার খরচ একদম কম।

প্রতি বছর পৃথিবী জুড়ে লক্ষ লক্ষ শিশু মারা যায় এই রোগে। তার এই আবিস্কারে হয়ত এমন অনেক শিশুর জীবন বেঁচে যাবে।

ইথিয়পীয়া এবং নেপালের মতো দেশ গুলো এর মাঝেই তাঁর উদ্ভাবিত টেকনোলজি ব্যাবহার করতে চেয়েছে; কাজও শুরু করে দিয়েছে। ভবিষ্যতে হয়ত পৃথিবীর অন্যান্য দেশ গুলোও এই টেকনোলজি ব্যাবহার করবে!

তো, এই সব ব্যাপার গুলো আমরা জানতে পারলাম হঠাৎ করেই যখন আমেরিকার সংবাদ মাধ্যম সিএনএন ব্যাপারটা প্রচার করল।

সিএনএন যখন উনার সাক্ষাৎকার নিয়েছে, তখন আমাদের গণমাধ্যমের মনে হয়েছে – উনি তো বিশাল কিছু করে ফেলেছেন! উনার ব্যাপারটা তো প্রচার করতে হয়! কিংবা এর আগে মিডিয়ায় আসলেও সেটা হয়ত সেভাবে প্রচার করা হয়নি। কারণ আমরা সাধারণ মানুষ সেটা তখন সেভাবে জানতে পারিনি!

এর আগ পর্যন্ত অবশ্য আমাদের সাংবাদিক কিংবা গণমাধ্যম কারও এই নিয়ে কোন আগ্রহ ছিল না!

তারা হয়ত ভেবে বসে ছিলেন- এ আর এমন কি! শ্যাম্পু দিয়ে একটা বোতল টাইপ যন্ত্র আবিষ্কার করেছে। একে এতো পাত্তা দেয়ার কি আছে!

আমাদের সাংবাদিকদের ভালো কোন বিষয় চোখে পড়ে না। শুধু সাংবাদিক না, পুরো সংবাদ মাধ্যম কিংবা আমরা বাংলাদেশিরাই এমন!

আমাদের চোখে না পড়লেও পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমের কিন্তু ঠিকই চোখে পড়েছে! তারা কিন্তু এই মেধাটিকে তুলে এনেছে!

কারণ তারা জানে – এই আবিষ্কার লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচাবে! কে জানে, এমন আবিস্কারের জন্য এই ভদ্রলোক হয়ত একদিন নোবেলও পেয়ে যেতে পারেন।

তিনি যদি নোবেলও পেয়ে যান, দেখবেন বাংলাদেশের এক দল মানুষ তখন বলবে- আরে এই ব্যাপারটা তো আমরাই প্রথম ভেবেছিলাম। ও শুধু আগে আগে করে এখন ক্রেডিট নিচ্ছে!

অন্য আরেকদল হয়ত- তার নানান সব ক্ষুত এবং সমালোচনা খুঁজে বের করার চেষ্টাও করবে!

কিছুদিন পর হয়ত ফেসবুকে তার ছবি ভাইরাল হবে কোন এক মেয়ে সঙ্গে মদ খাচ্ছে টাইপ! কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় পড়া অবস্থায় কোন মেয়ের সঙ্গে কি করে বেড়িয়েছে- এমন খবরও বের হয়ে যেতে পারে!

আপনাদের জানিয়ে রাখি – সেই খবর অবশ্য আমাদের সাংবাদিকরা সঙ্গে সঙ্গে লুফে নিবে এবং প্রকাশ ও প্রচার করে বেড়াবে!

অথচ এই ভদ্রলোক যে এতো বড় একটা আবিস্কারে করে বসে আছে- সেই খবর কিন্তু তারা প্রচার করেনি প্রথমে! কিংবা করলেও সেই অর্থে আমরা জনাতে পারিনি!

যেই না পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যম গুলো প্রচার করল- তখন আমাদের মনে হয়েছে – এতো বিশাল মেধা!

আমরা কখনোই মেধার মূল্যায়ন করতে শিখিনি!

নিজেকে জাহির করার জন্য না, স্রেফ বুঝানোর জন্য লিখতে হচ্ছে!

আমি তখন সুইডেনে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে পড়াচ্ছিলাম, আমার বাসা থেকে বেশ দূরে হয়; তাই জয়েন করলাম বাসার একদম পাশের ইউনিভার্সিটি ঢাকার আহসানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে! সেখানে পড়ানো অবস্থাতেই বুয়েটে লেকচারার পদে আবেদন করেছি। গেলাম ইন্টার্ভিউ দিতে।

ইন্টার্ভিউ বোর্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন এক্সটারনাল এসছেন। যেহেতু বুয়েটে সমাজ বিজ্ঞান বলে আলাদা কোন বিভাগ নেই, স্বাভাবিক ভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষক ইন্টার্ভিউ নিতে আসতেই পারেন।

তো সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমাকে প্রথমেই প্রশ্ন করে বসলেন, আপনি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন’নি; এখানে আবেদন করেছেন কেন? আপনি আপনার নিজের বিশ্ববিদ্যালয় সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করুন!

শুনে তো আমার চোখ কপালে উঠার জোগার! মাত্রই বিদেশ থেকে পড়াশুনা শেষ করে গিয়েছি। বেশ ভালো একটা চাকরীও করছি। তাই বুয়েটের চাকরীটা আমার খুব একটা দরকার ছিল না! তাই আমি উল্টো তাদের প্রশ্ন করলাম, কোথাও কি লেখা ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়লে আবেদন করা যাবে না? তাহলে আপনারা সার্কুলারে লিখে দিতেন! আমি আর আবেদন করতাম না!

আমার এই কথা শুনে এরপর এরা আমাকে আর কোন প্রশ্ন করেনি!

এই হচ্ছে আমাদের মেধা যাচাইয়ের নমুনা!

বিদেশে অবশ্য কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে বসেনি- বাংলাদেশ! এটা আবার কোন দেশ! এই দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার পড়াশোনা হয় নাকি! এরা মেধাটাই যাচাই করে!

ও, আরও ব্যাপার আছে! শুনেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি এখন আবেদন করতে চারটা ফার্স্ট ক্লাস লাগে! অর্থাৎ আপনার এসএসসি, এইএচসি, অনার্স, মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস থাকতেই হবে স্রেফ আবেদন করার জন্য।

আচ্ছা, যেই ছেলেটা ধরেন কোন কারনে এসএসসি কিংবা এইএচসিতে ফার্স্ট ক্লাস বা এই পরিমাণ নাম্বার পায়নি- সে কি তাহলে এই জীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারবে না?

আচ্ছা ধরুন, যেই ভদ্রলোক এমন একটা আবিষ্কার করে বসে আছেন; তার যদি অনার্স কিংবা মাস্টার্সে কিংবা এসএসসি’তে একটা সেকেন্ড ক্লাস থেকে থাকে (বলছি না আছে, জাস্ট বুঝানোর জন্য); তাহলে সে কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পারবে না? সে কি তার জ্ঞান টুকু বিতরন করতে পারবে না?

নাকি সেই জ্ঞান বিতরন করার জন্য শিক্ষকদের বাজার করে, রাজনীতি করে কিংবা শিক্ষকদের তেল দিয়ে ফার্স্ট ক্লাস পেতেই হবে?

এ কেমন মেধা যাচাই পদ্ধতি!

শুনেছি, আজকাল নাকি ব্যাংক গুলোও চারটা ফার্স্ট ক্লাস চায়!

আমরা আসলে দেশে বাস করা ছেলে-পেলে গুলোকে কি বার্তা দিচ্ছি?

আমরা বার্তা দিচ্ছি- তুমি যদি কোন ভাবে এসএসসি বা এমন কোন পরীক্ষায় ফেল করে বসো কিংবা কম নাম্বার পেয়ে বসো; তোমার জীবন এখানেই শেষ! এরপর হাজার বার ভালো করলেও কোন ফায়দা নেই! আবেদন’ই করতে পারবে না!

তো ছেলে-পেলেরা হতাশ হয়ে অন্য সব খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়বে না তো কি করবে?

আপনারা সমাজ ব্যবস্থাটাকে স্রেফ আপনাদের মতো করেই চালাচ্ছেন! না আছে মেধার মূল্যায়ন, না আছে মেধাবী যাচাইয়ের কোন সঠিক পদ্ধতি।

যেই ভদ্রলোক এমন একটা আবিষ্কার করেছেন; তিনি হয়ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পারবেন না (জাস্ট উদাহরণ); তবে আপনাদের জানিয়ে রাখি, আমেরিকার হার্ভার্ড কিংবা ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু তাকে ঠিকই তাকে লুফে নিবে। তারা অবশ্য তার এসএসসি, এইচএসসি কিংবা অনার্সের রেজাল্ট দেখতে যাবে না!

এভাবেই একটা দেশ এবং সমাজ মেধাহীন জাতিতে পরিণত হয়।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।