অফট্র্যাক সিনেমা যেভাবে ট্র্যাশ হয়: সীমানার এপার-ওপার

কিছুদিন আগে নায়ক আলমগীরকে নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। মূলত পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলমগীর একটা কেস স্টাডি হিসেবে এসেছিলো। তাঁকে যেহেতু সিনেমাসূত্রেই চিনি আমি-আমরা, অনিবার্যভাবেই বাংলা সিনেমার প্রসঙ্গ চলে এসেছিলো। একাল-সেকাল মিলিয়ে ৮৯% এর বেশি বাংলা সিনেমাকে যেহেতু নির্দ্বিধায় ট্র্যাশ বলা যায় প্রেডিক্টেবল এবং গৎবাঁধা স্টোরিলাইনের কারণে (ব্যক্তিগত অভিমত), তখন থেকেই মাথায় ঘুরছিলো অফট্র্যাক প্লটের কোনো একটা বাংলা সিনেমাকে কেইস ধরে স্টোরিলাইন এবং ট্র্যাশজনিত হিসেব-নিকেষ সেরে নিতে হবে। ইউটিউবে ‘একটি সিনেমার গল্প’ নামের বাংলাদেশী সিনেমাটা দেখার পরই ২-৩ দিন আগের সেই ভাবনাটাকে তুলনামূলক ফ্রেম দিয়ে বিচার করার সিদ্ধান্ত নিই।

‘একটি সিনেমার গল্প’ নামের সিনেমাটা দেখার একটাই কারণ ছিলো আমার; সম্ভবত পৃথিবীর কোনো মানুষই এই কারণে সিনেমাটা দেখেনি বা দেখবে না। গত বছর ৭ জন তরুণকে একটা এসাইনমেন্ট দিয়েছিলাম, বাংলা সিনেমার সবচাইতে লম্বা নায়ক কে সেই প্রশ্নের মেথডলজিকাল রিসার্চ করতে। ফেসবুক-অফলাইন মিলিয়ে তারা ৩৩০০ জন মানুষকে করেছিলো প্রশ্নটি। ৭৯% এর বেশি মানুষ আলমগীরের নাম বলেছিলো, দ্বিতীয় স্থানে ছিলো আরিফিন শুভ এর নাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম, আলমগীর যেহেতু বাংলা সিনেমার কিংবদন্তী এবং শুভ মাত্র ক্যারিয়ার শুরু করেছে, উত্তরদাতাদের বড়ো অংশই হয়তো শুভর নাম শোনেনি, কিংবা সেভাবে খেয়াল করেনি, নইলে শুভ আলমগীরের চাইতে লম্বা হওয়ার কথা।

যেহেতু এই সিনেমায় দুজনই অভিনয় করছে, তাদের পাশাপাশি দাঁড়ানোর কোনো দৃশ্য থাকবেই, এবং তখনই বোঝা যাবে আমার অনুমান নির্ভুল কিনা। শুধুমাত্র এই উদ্ভট ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশ্যে সিনেমাটা দেখতে বসা। সত্যিই আলমগীরের চাইতে শুভ এক-দেড় ইঞ্চি বেশি লম্বা, অথচ তাকে দেখে কখনোই দোতলা বাসের ইমেজ মাথায় আসেনি!

ইউটিউবে পাওয়া ‘একটি সিনেমার গল্প’ এর ব্যাপ্তি ২ঘণ্টা ৪৪ মিনিট। মূল সিনেমার ব্যাপ্তি এর চাইতে বেশি হলেও হতে পারে। সিনেমাটা দেখে শেষ করেছি। প্রথম ৫-১০ মিনিটের মধ্যেই আমার কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাওয়ায় সিনেমার বাকিটুকু না দেখলেও চলতো, দেখেছি এই নিবন্ধটি লিখবো বলেই।

কলকাতা বাংলার কিছু কিছু অফট্র্যাক সিনেমা বেশ ভালো লেগেছে। জাতিস্মর সিনেমাটা মনে পড়ে গেলো। একে সিনেমা, নাকি গীতিচিত্র বলা উচিত হবে, পণ্ডিতবর্গ ভালো বলতে পারবেন। চতুষ্কোণ, প্রাক্তন, ভূতের ভবিষ্যৎ, ব্যোমকেশ প্রভৃতি সিনেমাগুলোও অফট্র্যাকের, কিন্তু স্টোরিলাইন ইন্টারেস্টিং। তবে কলকাতার অফট্র্যাক সিনেমা মানেই ইন্টারেস্টিং স্টোরিলাইনের নিশ্চয়তা নয়।

আমার ধারণা, এদের ৬৭%ই আদতে কিছুটা ডিসর্টাবড শহুরে জীবন, পারিবারিক কলহ, ধার করা কর্পোরেট কালচার এবং নিয়ন্ত্রণহীন যৌনতাকে ভিত্তি করে নির্মিত হয়। সেগুলো দর্শক হিসেবে না টানলেও স্টোরিটেলিং এবং মেকিং গুণে দেখে ফেলা যায়। রিসাইকল বিন একটু ভারি হলোই নাহয়।

‘একটি সিনেমার গল্প’ কেইস হিসেবে একটা পারফেক্ট সিলেকশন। কলকাতার অফট্র্যাক সিনেমার একটা বেশ উল্লেখযোগ্য অংশ নির্মিত সিনেমার মানুষদের জীবনযাপন নিয়েই। ফলে কেউ যদি বাংলাদেশী সিনেমার স্টোরিলাইন এবং প্রেজেন্টেশন বুঝতে আগ্রহী হয়, এই সিনেমাটার মাধ্যমে সেই সুযোগ তৈরি হয়।

‘একটি সিনেমার গল্প’ এর মূল থিম অসমবয়সী প্রেম। জুনিয়র নায়ক তার চাইতে বয়সে বড়ো এবং ভিন্নধর্মাবলম্বী নায়িকার প্রেমে পাগল, নায়িকা আবার তার চাইতে বয়সে অনেকটা বড়ো বিবাহিত এবং কন্যাসন্তানের পিতা পরিচালকের প্রেমে অন্ধ। পরিচালকও তাকে ভালোবাসে, কিন্তু সংসারের প্রতি কমিটমেন্টের কারণে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ নেই। গল্পটা শুনতে সরল মনে হলেও এর ক্যানভাস অত্যন্ত ব্যাপক এবং অভ্যন্তরীণ স্খলন আর ক্ষরণ নিয়ে প্রচুর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের সুযোগ ছিলো, এবং রয়েছে।

কিন্তু বাংলা সিনেমার পরিচালক এবং স্ক্রিপ্ট রাইটাররা সম্ভবত ধরেই নেন, গার্মেন্টস শ্রমিকেরা সিনেমা দেখবে, অথবা দেশে বিটিভি ছাড়া কোনো চ্যানেল চলে না, যে কারণে সাইকোলজিকাল থ্রিলার তৈরির ঐকান্তিক প্রত্যাশাকে তারা ধামাচাপা দেয় ‘বেশি হাইথট হলে অধিকাংশ দর্শকের মাথার উপর দিয়ে যাবে’- এই প্রবোধ শুনিয়ে। সেই প্রবোধ আসলে কাকে শোনায় সেটাই প্রশ্ন।

নাকি, সাইকোলজিকাল থ্রিলার বানানোর মেধা ও বিচক্ষণতার স্পষ্ট ঘাটতিকেই কারণ মেনে নিতে হবে। খোঁড়াকে খোঁড়া, কানাকে কানা বলতে নেই; এমন আপ্তবাক্য শুনেই বড়ো হয়েছি। ‘তার চাইতে মাথার উপর দিয়ে যাবে’ মেনে নেয়া ভালো। জাতিস্মর বা প্রাক্তন সিনেমা দুটো দেখেছেন যারা, কতজনের মাথার উপর দিয়ে গেছে এ সংক্রান্ত একটা মেথডলজিকাল রিসার্স অত্যাবশক হয়ে উঠেছে।

সাইকোলজিকাল থ্রিলার হওয়ার সম্ভাবনা অঙ্কুরেই শেষ হয়ে গেছে আর্টিস্ট কাস্টিংয়ে। আরিফিন শুভ-ঋতুপর্ণার সাথে আলমগীরের রসায়ন কীভাবে জমে আসলে? অভিনেতার কোনো বয়স নেই; সে যে কোনো বয়সের, যে কোনো পেশার, যে কোনো চরিত্রের। কিন্তু অমিতাভ বচ্চন এখন যদি রানী মুখার্জী আর শহীদ কাপুরের সাথে কোনো একটা সিনেমায় অভিনয় করে যেখানে রানী মুখার্জী তার প্রতি প্রবলভাবে আসক্ত এবং তাদের বয়সের পার্থক্য খুব বেশি নয়- এরকম চরিত্রায়ণ দর্শক হিসেবে মানা কষ্টকর।

যতোই জানি অভিনয়, তবু অমিতাভ বচ্চন রানী মুখার্জীর চাইতে ৮-১০ বছরের বড়ো, এটা বিশ্বাসযোগ্য লাগে না, অস্বস্তি কাজ করে। এই সিনেমায় আলমগীরের চরিত্রটা হয়েছে সেরকম। গোফ লাগিয়ে, ফ্যাশনেবল পোশাক পরে নিজেকে যে বয়সের চরিত্র দিয়েছে, এটা কোনোভাবেই মানানসই হয়নি। বরং আলমগীরকে তার বয়সের উপযোগী চরিত্র দিয়েই স্টোরিলাইন আগানো যেতো তরতরিয়ে। প্রেম বয়স মানে না, ধর্ম মানে না, সংসার মানে না- এইসব চর্চিত কথা-বার্তাই যেহেতু দেখানো হচ্ছে সেখানে বয়সে অনেক বড়ো পরিচালকের প্রতিভার প্রেমে পড়া খুবই ন্যাচারাল হতো হয়তোবা।

নামকরা অভিনেতা মানে পরিচালক হিসেবেও দুর্দান্ত, এই বাক্যটা যে উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে একটা মিথ, এতো বছরে নিঃসন্দেহে এটা প্রমাণিত। গৌতম ঘোষ, অঞ্জন দত্ত, কৌশিক গাঙ্গুলী এরা মূলত পরিচালক যারা মাঝেমধ্যে অভিনয় করে। এখনো পর্যন্ত মাথার রাডারে একমাত্র অপর্ণা সেনকেই খুঁজে পাই যে অভিনেত্রী এবং পরিচালক দুই ক্ষেত্রেই সমান মুন্সিয়ানা দেখাতে পেরেছে।

নায়ক শব্দটা বললেই আমার মাথায় আলমগীরের ইমেজ আসে, কিন্তু পরিচালক বললে সহস্রজনের মধ্যেও এমএ আলমগীর নামের কাউকে খুঁজে পাই না। চেষ্টা করলে আলমগীর কবির, আলমগীর কুমকুম, এমনকি ফকির আলমগীর কিংবা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেও পাওয়া যেতে পারে। অবশ্য একই মানুষ একই সময়ে ঢাকা এবং ঠাকুরগাঁওয়ে বিচরণ করবে, এই প্রত্যাশাতেই তো ত্রুটি।

পরিচালক সংক্রান্ত ফ্যাচর ফ্যাচর পাড়ার কারণ আছে। উল্লিখিত সিনেমার স্টোরিলাইন যে কতোটা সীমিত আর সংকীর্ণ পরিসরে আবর্তিত হয়েছে এটা বোঝার জন্য ধরা যাক, ‘একটি সিনেমার গল্প’ নামক সিনেমাটা কলকাতায় নির্মিত হয়েছে, যার পরিচালক সৃজিত অথবা শিবুপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

এবার সম্ভাব্য কাস্টিং। পরিচালকের চরিত্রে চিরঞ্জিত। তবে বস্তির মেয়ে রাধা, তোমার রক্তে আমার সোহাগ জাতীয় সিনেমার চিরঞ্জিত নয়; চতুষ্কোণ অথবা বাড়িওয়ালি সিনেমার চিরঞ্জিত। পরিচালকের স্ত্রী চরিত্রটি অত্যন্ত গুরুত্ব পাবে । সে সংসার নিয়ে ব্যস্ত, তার একজন বান্ধবী থাকবে যে সিগারেট খায়, ডিভোর্সড এবং ক্রমাগত বান্ধবীকে তার পরিচালক স্বামীর নামে বিষোদগার করবে। তার মা থাকবে, ভাই থাকবে; ভাইয়ের সাথে মায়ের সম্পর্ক খারাপ, মেয়ে মায়ের সাথে ফোনে কথা বলে।

পরিচালকের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করবে রূপা গাঙ্গুলী। পরিচালকের মেয়েকে স্কুলপড়ুয়ার চাইতে টিনএজার হিসেবে দেখানো হবে। সে বন্ধুদের সাথে সময় কাটায়, বাবার মতো সিনেমা বানাতে চায়, সারক্ষণ মাথায় গল্পের প্লট ঘোরে; মা-বাবার মধ্যকার শীতল সম্পর্কটা বুঝতে পারলেও সে বাবারই পক্ষ নেয়; ট্যালেন্টেড মানুষদের ধরাবাঁধা জীবনে আটকানো উচিত নয়, শুধুমাত্র স্ত্রী-কন্যা নিয়ে মশগুল থাকবে, এরকম প্রত্যাশা থাকলে তার মায়ের উচিতই হয়নি তার বাবার মতো মানুষকে বিয়ে করা। সে স্ত্রী হয়েছে, জীবনসঙ্গী হতে পারেনি; এই জাতীয় কথা বলে মাকে বুঝিয়ে দেবে তুমি মিডিওকর।

অন্যদিকে সে তার ক্লাসের এক ছেলেকে নিয়মিত চিঠি লিখে, মাঝেমাঝে ডেট করে। সে ছেলেটাকে ভালোবাসে তাও নয়, তার সিনেমার নায়কের বৈশিষ্ট্য কেমন হওয়া উচিত সেটা বুঝতেই তার সাথে মিশছে; এগুলো নিয়ে বাবার সাথে কথা বলে, তার শুটিংস্পটে চলে যায় মাঝেমাঝে। ‘চিরদিনই তুমি আমার-২’ সিনেমায় নায়িকা যে বাড়িতে কাজ করতো, সেই বাসার মেয়ে চরিত্রে যে অভিনয় করেছিলো এ সিনেমাতেও সে পরিচালকের মেয়ের চরিত্র পাবে।

নায়িকা হিসেবে ঋতুপর্ণাই থাকবে, কিন্তু ইসলাম ধর্মাবলম্বী। আরও ১ জন নায়িকা থাকবে যে ঋতুপর্ণার প্রতিদ্বন্দ্বী, চিরঞ্জিত আর তাকে ঘিরে স্ক্যান্ডাল, রিউমার ছড়ানোর চেষ্টা করে। চিরঞ্জিত মেধাবী পরিচালক, তার সিনেমা বাইরের দেশে অ্যাওয়ার্ড পায়, কিন্তু খুব বেশি ব্যবসাসফল হয় না। আরও ২-৩ জন পরিচালক থাকবে যারা তেলেগু-তামিল রিমেক বানিয়ে বাম্পার হিট উপহার দেয়।

সেও হিট সিনেমা উপহার দিতে চায়, কিন্তু যিনি হাতে ধরে তাকে কাজ শিখিয়েছেন সেই প্রয়াত পরিচালক, মানে তার গুরু, তার সামনে বিবেক হিসেবে আবির্ভূত হয়; তাকে হিট আর ক্লাসিকের মধ্যকার পার্থক্যগুলো মনে করিয়ে দেয়। হিট সিনেমার নায়কেরা তার সাথে কাজ করতে চায় অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার আশায়, কিন্তু তাদের অ্যাক্টিং নিয়ে পজিটিভ মনোভাব না থাকায় তাকে/তাদের সুযোগ দেয় না।

আরিফিন শুভ এর চরিত্রে থাকবে ইন্দ্রনীল। বেশ কয়েকটা ফ্লপ সিনেমা করে ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকলেও চিরঞ্জিতের মনে হয়েছে তার অভিনয় দক্ষতা ঠিকমতো কাজে লাগানো হচ্ছে না। ইন্দ্রনীল এককালে ঋতুপর্ণার ফ্যান ছিলো, অভিনয়ে আসার পেছনেও ঋতুপর্ণার প্রভাব রয়েছে।

এই পর্যায়ে এসে থামি। কল্পিত স্টোরিলাইনটা একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে মূল চরিত্রগুলো ক্রমাগত গভীরে ঢুকছে; সাপোর্টিং চরিত্রগুলোও বিকশিত। পার্থক্যটা এভাবেই ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তম পর্যায়ে চলে যায়। বাংলা সিনেমার স্টোরিলাইনে ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট হয় না; ক্যারেক্টারগুলো অনেকটাই কাঠের পুতুল। তাদের না থাকে ব্যাকগ্রাউন্ড হিস্টরি, না থাকে প্রোপার প্রোগ্রেস প্লেসমেন্ট। আমাদের স্টোরিলাইনে সংলাপ থাকে, দৃশ্য থাকে, গানের সাথে নাচানাচি থাকে, কিন্তু ক্যারেক্টার থাকে না, তাদের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সাইকেলের চাকার ঘূর্ণনের সাথে সাথেই এক রেখায় চলে আসে।

একটি সিনেমার গল্পতে আবার ফিরি। আরিফিন শুভ এর কাজ কী? ঋতুপর্ণাকে ঘিরে অবসেসনে ভোগা। ঋতুপর্ণার কাজ কী? পরিচালক আলমগীরের মৌন প্রত্যাখ্যানে ইগাহত হয়ে ক্ষুব্ধ আচরণ করা, এবং কীভাবে আলমগীরের সান্নিধ্য লাভ করবে তার জন্য ব্যাকুল থাকা। আলমগীরের কাজ কী? শুটিংস্পটে যাওয়া আর ঋতুপর্ণা-চম্পার মধ্যে ব্যালান্স রক্ষা করা। সিনেমার প্রথম দৃশ্য থেকেই ঋতুপর্ণা তার প্রতি দুর্বল; কিন্তু সে কেন এতো আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব সেরকম কোনো হিরোইজম বা প্রতিভার প্রদর্শনী নেই কোথায়। সে মৌলিক গল্পের সিনেমা বানায়, অথচ প্রযোজক তার পিছনে ঘুরছে!

আরিফিন শুভ এককালে র‌্যাম্প মডেল ছিলো শুনেছি। পেশী দেখলে বোঝা যায় নিয়মিত জিম করে; স্বাস্থ্যসচেতনতা অতি অবশ্যই একজন নায়কের অন্যতম পালনীয় বিষয়। কিন্তু মূল কাজ যে এক্টিং, সেখানে এখনো অনেক দূরের পথ পাড়ি দিতে হবে। ডায়ালোগ ডেলিভারি, এক্সপ্রেসন, হাঁটা-চলা সবকিছুর মধ্যেই আনাড়িপনা লক্ষ্য করা যায়। ঢাকা অ্যাটাক সিনেমায় শতাব্দী ওয়াদুদ আর ভিলেনকে বাদ দিলে তার আলাদা কোনো উপস্থিতি কি বোঝা গেছে? ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, আমার বরং আশফাক চরিত্রের এবি সুমনকেই বেশি ম্যানলি এবং চরিত্রের উপযোগী মনে হয়েছে।

অফট্র্যাক সিনেমার গানগুলো বাড়তি মাত্রা যোগ করে। প্রাক্তন সিনেমা হিট হওয়ার পেছনে ‘তুমি যাকে ভালোবাসো’ গানের বড়ো অবদান রয়েছে। কিংবা জাতিস্মরের গানের চিত্রায়ণগুলো স্মরণ করা যেতে পারে। সেদিক থেকে, একটি সিনেমার গল্পতে গানের উপস্থাপনগুলো হাসির উদ্রেক ঘটিয়েছে। বাপ্পা মজুমদার আর অদিতি মহসিনের কণ্ঠে ‘আমারো পরাণ যাহা চায়’ গানটা শুনতে যত সুন্দর লাগে, সর্বশেষ কবে এমন বেখাপ্পা চিত্রায়ণ দেখেছি কোনো গানের, মনে করতে পারছি না।

ট্রেন্ড মেনে অফট্র্যাক সিনেমাতেও একটা আইটেম সং থাকতো স্টোরিলাইন অনুসারেই। এই সিনেমায় ‘দুবাই যাবো’ গানটা হয়তোবা সেই চেষ্টাই ছিলো, কিন্তু এটা হয়ে গেছে কমেডি; বরং নকল সুরের গান শোনার জন্য শ্রুতিকটু।

সাধারণত সিনেমাকেন্দ্রিক অফট্র্যাক সিনেমাগুলোতে এক্সিট হয় শকিং ধরনের, কিন্তু সেটা মোটেও মেলোড্রামাটিক কিছু হবে না। বলিউডের হেরোইন সিনেমাটা মনে পড়ছে। কারিনা কাপুর নিজের ক্যারিয়ার বাঁচাতে কতো কিছু করে, আর্টফিল্ম করে, শেষ পর্যন্ত অর্জুন রামপালের সাথে যৌনদৃশ্য ভাইরাল করে দেয়, সিনেমাও হিট হয়। কিন্তু প্রবীণ এক অভিনেত্রীর মৃত্যু জীবন-ক্যারিয়ার-গ্ল্যামার সম্বন্ধে তার ধারণাই বদলে দেয়। চেনা জগত ছেড়ে বহু দূরের এক দেশে চলে যায় সে যেখানে কেউ তাকে চেনে না। তবু ঘটনাক্রমে এক পথচারী তাকে চিনতে পারে, কিন্তু সে নিজের পরিচয় অস্বীকার করে।

কলকাতাতেও ‘নায়িকা সংবাদ’ নামে একই ধাঁচের একটা সিনেমা হয়েছিলো। ইন্দ্রনীল, মুমতাজ, অরুনিমা ঘোষ অভিনীত সেই সিনেমায় নায়িকাজীবনের অনেক তিক্ত সত্যের সন্ধান পাওয়া যায়।

কিন্তু একটি সিনেমার গল্পতে হঠাৎ করেই দিব্যি সুস্থ্য নায়িকা ফোর্থ স্টেজ ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত। তার মানে সিনেমার শেষে নায়িকার মৃত্যু নিশ্চিত। ১৯৭০ সালের সিনেমাতেও ট্রাজেডি বোঝানোর একমাত্র সমাধান ছিলো নায়ক-নায়িকার মৃত্যু। ফলে ২ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট ব্যাপ্তির সিনেমায় গল্প বড়োজোর ৫ মিনিটের; সেটাই টানতে টানতে এতো বড়ো দৈর্ঘ্যের আকার দেয়া হয়েছে।

কেন আমাদের অফট্র্যাক গল্পগুলো ট্র্যাশ হয়ে যায়? কেন একঘেয়েমিতা চলে আসে?

ঘুরেফিরে উত্তর সেই একটাই পাই- প্রজ্ঞাহীনতা এবং চিন্তাবাক্সের আকার খুবই ক্ষুদ্র হওয়া। আমরা এলাকার মধ্যে সেরা হলেই খুশিতে ডগমগ হয়ে যাই, গ্লোবাল কনটেক্সট এ চিন্তা করার সাহসই আসে না, সামর্থ্য তো বহু পরের আলোচ্য। আমাদের স্টোরিলাইনগুলোতে মানুষের চেহারা থাকে, কোনো বৈশিষ্ট্য থাকে না। বৈশিষ্ট্যহীন চেহারা তো ছায়াশরীর মাত্র।

ক্যারেক্টার ডেভেলপ করতে অন্তত ১৯টা প্রশ্ন করা উচিত। তার পরিবেশ, প্রতিবেশ প্রভৃতি নিয়ে বিশ্লেষণ করা উচিত। সেসব না করে কেবলমাত্র একটা গল্প মাথায় এলো আর গল্পের প্রয়োজনে কয়েকটা নাম বসিয়ে দিলাম, ২-৩টা গান রাখলাম, আর অতঃপর তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো- এই রেসিপি বস্তাবন্দী অবস্থায় পঁচে গিয়ে দুর্গন্ধের সৃষ্টি করেছে বহুদিন আগেই। কিন্তু আমাদের ইন্দ্রিয় ক্ষমতা এতোটাই ভোঁতা হয়ে পড়েছে যে, গন্ধসমুদ্রে স্নান করেও গন্ধ টের পাই না।

ট্র্যাশ ক্রাশ থেকে মুক্ত ফ্রেশ স্টোরিলাইনের সিনেমা কোনো একদিন হবেই।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।