হিট বাবার ফ্লপ ছেলে

‘বাপ কা বেটা, সিপাহী কা ঘোড়া’ – কথাটা বেশ শোনা যায়। অনেকেই নিজেদের কাজ দিয়ে বাবার সুনামকে ছাড়িয়ে যান। যদিও, এর ব্যতিক্রমও হয় বিস্তর। বাবা এতটাই সফল যে সেই প্রত্যাশার চাপে ভেঙে পড়েন ছেলেরা। বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এমন অনেকগুলো নজীর দেখা যায়।

  • দেব আনন্দ ও সুনীল আনন্দ

বলিউডের চিরসবুজ নায়ক তিনি। দেব আনন্দের ব্যাপারে নতুন করে কিছু বলার নেই। অথচ, তাঁর মত কিংবদন্তীতুল্য অভিনেতার সন্তান হয়েও চূড়ান্ত ফ্লপ ছিলেন সুনীল আনন্দ। দেব আনন্দ তাকে লঞ্চ করেছিলেন ‘আনান্দ অওর আনান্দ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। বাবা কোটি তরুণীর হৃদয়ে জায়গা করতে পারলেও ব্যর্থ হয়েছিলেন সুনীল। ১৯৮৪ সালে রূপালি পর্দায় অভিষেকের পর কিছু ফ্লপ ছবিতে দেখা গিয়েছিল তাকে। অতঃপর, তিনি অভিনয় ছেড়ে দেন। বর্তমানে তিনি যুক্ত আছেন তাঁর বাবার প্রোডাকশন কোম্পানি ‘নবকেতন ফিল্মস’-এর সাথে।

  • অমিতাভ বচ্চন ও অভিষেক বচ্চন

বলিউডের ইতিহাসেরই অন্যতম সফল ও সেরা অভিনেতা হলেন অমিতাভ বচ্চন। সেই হিসেবে অভিষেককে ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই আকাশ সমান প্রত্যাশার চাপ নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। শুরুতে এক গাদা ফ্লপ দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। যদিও, এরপর ‘ধুম’ সিরিজ, ‘বান্টি ওউর বাবলি’ কিংবা ‘গুরু’ দিয়ে বেশ ভাল ভাবেই থিতু হয়েছিলেন ফিল্মি দুনিয়াতে। এরপরই ছন্দপতন, টানা বাজে স্ক্রিপ্টের ছবি করে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন অভিষেক।

  • জিতেন্দ্র ও তুষার কাপুর

জিতেন্দ্র ছিলেন সুপারস্টার। কিন্তু, রূপালি পর্দায় ব্যর্থ তুষার। তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সেরা পারফর্মেন্স ‘গোলমাল’ ফ্রাঞ্চাইজিতে তার বোবার অভিনয়। এর বাইরে তুষারকে আজকাল আর অন্য কোনো চরিত্রে দেখাই যায় না। গোলমাল ছাড়া তুষারের মনে রাখার মত ছবি হল ‘মুঝে কুছ ক্যাহনা হ্যায়’ ও ‘ক্যায় কুল হ্যায় হাম’।

  • রাজ কাপুর ও রাজীব কাপুর

রূপালি পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন কাপুর পরিবারের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার রাজ কাপুর। তিনি ক্যারিয়ারে তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ১১ টি ফিল্ম ফেয়ার জয় করেন। তবে, তাঁর ছোট ছেলে রাজীব বাবার মত হতে পারেননি তিনি। ১৩ টা চলচ্চিত্রের ছোট্ট ক্যারিয়ারের উল্লেখ করার মত একমাত্র চলচ্চিত্র হল ‘রাম তেরি গঙ্গা ম্যায়লি’। ফিল্মটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮৫ সালে। সেটাও আবার বাবার পরিচালনাতেই। যদিও, রাজ কাপুরের বড় দুই ছেলে রণধীর কাপুর ও ঋষি কাপুর, কিংব নাতী-নাতনী কারিশমা, কারিনা কাপুর  ও রণবীর কাপুররা কাপুর পরিবারের পতাকা বলিউডের ময়দানে নিয়মিত উড়িয়ে চলেছেন।

  • আমজাদ খান ও শাদাব খান

‘শোলে’ সিনেমার গাব্বার সিং চরিত্রটি করেই কিংবদন্তি বনে গিয়েছিলেন আমজাদ খান। এর বাইরেও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ছোট-বড় অনেক চরিত্রই করেছিলেন এই গুণী অভিনেতা। তাঁর ছেলে হল শাদাব খান। বলিউডে তাঁর অভিষেক হয় ‘রাজা কি আয়েগি বারাত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে, সেটাও আবার রানী মুখার্জীর বিপরীতে। রানীরও প্রথম হিন্দি সিনেমা ছিল এটি। রানী পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেও পারেননি শাদাব। আড়ালেই হারিয়ে যান তিনি।

  • মিঠুন চক্রবর্তী ও মিমোহ চক্রবর্তী

মহাক্ষয় চক্রবর্তী ফিল্মি দুনিয়ায় আসেন মিমো চক্রবর্তী নামে। তিনি ছিলেন ‘ডিস্কো ড্যান্সার’ মিঠুন চক্রবর্তীর ছেলে। তাঁর ছিল না তার বাবার মত নাচের দক্ষতা, ছিল না অভিনয় গুণ। বলিউডে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেননি তিনি। ২০০৮ সালে ‘জিমি’র মাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তার। ২০১৩ সালে ‘এনিমি’ চলচ্চিত্রে মিমোর সাথে রূপালি পর্দায় দেখা গিয়েছিল মিঠুন চক্রবর্তীকে। কোনোটাই ব্যবসা সাফল্য পায়নি। অথচ, মিঠুন আশি-নব্বই দশকে তো বটেই এই যুগেই চরিত্রাভিনেতা হিসেবে বেশ সুনাম কুড়িয়ে যাচ্ছেন।

  • ফিরোজ খান ও ফারদিন খান

ফারদিনের বাবা ফিরোজ খান ছিলেন একজন স্টাইলিশ অভিনেতা। অন স্ক্রিন ও অফ স্ক্রিনে তিনে ছিলেন একজন দুর্দান্ত ব্যক্তিত্ব। তাঁর ছেলে ফারদিন খানের বলিউডে অভিষেক হয় ৯০ দশকের শেষদিকে ‘প্রেম অঙ্গন’-এর মাধ্যমে। এই চলচ্চিত্রের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান ‘সেরা নবাগত অভিনেতা’ ক্যাটাগরিতে। এরপর ‘দেব’-এর মত চলচ্চিত্র উপহার দিলেও একের পর এক ফ্লপ তাঁর চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের বারোটা বাজিয়ে দেয়। এখন আর পর্দায় আসেন না তিনি। এর ওপর এক গাদা মেদ জমিয়ে শরীরেরও যাচ্ছতাই অবস্থা ফারদিনের।

  • শশী কাপুর ও করণ কাপুর

কাপুর পরিবারের অন্যতম সেরা অভিনেতা শশী কাপুরের ছেলে করণ কাপুর। বোম্বে ডাইং-এর মত নামকরা কোম্পানির পোস্টার বয় ছিলেন করণ। তার প্রথম চলচ্চিত্র ছিল ‘সালতানাত’। চলচ্চিত্রটি তার ক্যারিয়ারের জন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেনি। চলচ্চিত্রাঙ্গন ছেড়ে দেবার আগে কিছু ছবিতে অভিনয় করে নিজের ভাগ্য বদলানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। হলিউড ঘরানার নায়কদের মত দেখতে ছিলেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি তাতে। বরং, সিনেমার বাইরে ফটোগ্রাফিতে তিনি বেশ সফল।

  • শেখর সুমান ও অধ্যয়ন সুমান

তাঁর বাবা শেখর সুমান, একজন জনপ্রিয় টিভি অভিনেতা। তাঁকে দেখা গিয়েছে ‘দেখ ভাই দেখ’, ‘রিপোর্টার’, ‘আন্দাজ’, ‘ছোটে বাবু’, ‘মুভারস অ্যান্ড শেকারস’ এর মত জনপ্রিয় টিভি শোতে। তার ছেলে অধ্যয়নের অভিষেক হয় ‘হাল-এ-দিল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তিনি মনোনীত হয়েছিলেন ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের সেরা নবাগত অভিনেতা ক্যাটাগরিতে। এরপর তাকে দেখা গিয়েছে ‘রাজ দ্য মিস্ট্রি কন্টিনিউস’, ‘জাশন’, ‘হিম্মতওয়ালা’র মত চলচ্চিত্রে। অধ্যয়ন নিজের জায়গা বলিউডে পাকাপোক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। উপরন্তু,তার ব্যর্থ ক্যারিয়ার থেকে তিনি কঙ্গনা রনৌতের সাথে প্রেমের সম্পর্কের জন্য বেশি বিখ্যাত ছিলেন!

  • মনোজ কুমার ও কুনাল গোস্বামী

মনোজ কুমার স্বনামধন্য অভিনেতা ও নির্মাতা ছিলেন। ভারত কুমার নামে পরিচিত এই কিংবদন্তি ‘পদ্মশ্রী’ ও দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার পেয়েছিলেন। যদিও, ছেলে কুনাল গোস্বামী বাবার মত অভিনয়ে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারেননি। তাঁকে ‘ঘুঙরু’, ‘কালাকার’, ‘পাপ কি কামি’র মত বি গ্রেড চলচ্চিত্রে দেখা গিয়েছিল। তবে, তাঁকে মনে রাখা হবে ‘নীলে নীলে আম্বার পার’ গানটির জন্য। ‘কালাকার’ ফিল্মের এই গানটি তার সাথে ছিলেন প্রয়াত শ্রীদেবী।

  • সঞ্জয় খান ও জায়েদ খান

‘ম্যায় হু না’ সিনেমায় শাহরুখ খানের সাথে অভিষেক। মনে করা হচ্ছিল সঞ্জয় খানের ‘সুপুত্র’ বাকি ক্যারিয়ারটা আরামসে কাটিয়ে দেবেন। হল উল্টোটা। ফাইট ক্লাব, ব্লু, যুবরাজ, ক্যাশ, স্পিড, দাস, মিশন ইস্তাম্বুলের মত বিগ বাজেটের সিনেমাগুলো বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়লো। হারিয়ে গেলেন জায়েদ। এরপর তিনি ‘হাসিল’ নামের একটি টেলিভিশন সিরিয়ালে সাফল্যের খোঁজ করেন, বরাবরের মত ব্যর্থ হন। অথচ, বাবা সঞ্জয় খান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া অভিনেতা। টিপু সুলতান সিরিজে তিনি নাম ভূমিকায় অভিনয় করেও ব্যাপক খ্যাতি পান।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।